পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করে মুক্ত করে দেবে ভারত তা ভাবতেই পারেনি!

ড. সুফি সাগর সামস্ : বাংলাদেশের ভূখন্ডের কারণে ভৌগোলিকভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম প্রভৃতি রাজ্যগুলোর মধ্যে স্বাভাবিক চলাচলে স্থায়ীভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়ে আছে। ওই রাজ্যসমূহের মধ্যে পণ্য-পরিবহন এবং যাতায়াতে বাংলাদেশ একটি বিশাল বাধা। বাংলাদেশের ভূখন্ডের জন্য ভারত বিশেষ ওই সমস্যায় আবর্তিত হয়ে আছে। একারণে একাত্তর সনে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁরা প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের সাথে সাত দফা ভিত্তিক একটি চুক্তি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মিত্রবাহিনী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিল। সাত দফা ভিত্তিক চুক্তির মর্ম অনুধাবন করলে প্রতীয়মান হয় যে, পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নয়, স্বাধীনতার নামে ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশকে তাদের এ্যানেক্স করতে। যাতে তাদের ওই রাজ্যসমূহের ওই সমস্যা থেকে তারা পরিত্রাণলাভ করতে পারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কারণে তাদের ওই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যে কারণে এখনো তারা বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর পাওয়ার জন্য অভীন্ন নদীর উজানে বাদ নির্মাণ, পানির ন্যায্য হিস্যা না দেওয়া, সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিকদের হত্যা ইত্যাদি করে বাংলাদেশের ওপর অব্যাহতভাবে চাপ সৃষ্টি করে আসছে।

ভারতের স্মরণে রাখা দরকার যে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তাদের অন্যান্য রাজ্যগুলোর মধ্যে যে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য বাংলাদেশ কিংবা বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা দায়ী নয়। বাংলাদেশের এখানে কোনো ভূমিকা ছিল না। ভারতের কংগ্রেস ১৯৪৬ সালের কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। এ কারণে পরিকল্পনা প্রস্তাবটি মুসলিম লীগের পক্ষে গিয়েছিল। ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে বাংলা বিভক্ত এবং ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। কংগ্রেসের ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক ভূরাজনীতির ভিত্তিতে বাংলা ভাগের ওই প্রস্তাবের প্রতি কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর সমর্থন ছিল। অবিভক্ত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর তাতে সমর্থন ছিল না। বাঙালিরা নিজেদের মতো করে নিজেদের ভূখন্ড স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাওয়ার পক্ষে ছিলেন। হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সভ্যতা, সামাজিক অবস্থান সম্পূর্ণই বাঙালি জাতির নিজস্ব।

চল্লিশের দশকে ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনা প্রবল ছিল। এ কারণে তখন মুসলিম লীগ দাবি করেছিল যে, হিন্দু এবং মুসলমান দুটি পৃথক জাতি। সুতরাং ভারতীয় মুসলমানদের পৃথক আবাস ভূমি প্রয়োজন। এ প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্রের দাবি তুলে ধরা হয়। মুসলিম লীগের ওই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৭ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত হয় নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলন। ওই সম্মেলনে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক বেঙ্গল ও আসামকে নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রস্তাব দাবি আকারে উত্থাপন করেছিলেন। ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে তা ‘লাহোর প্রস্তাব’ নামে পরিচিত। লাহোর প্রস্তাবে মুসলমানদের জন্য একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। কিন্তু মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মনোভাবের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তারা আড়াই হাজার মাইল দূরবর্তী পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলকে নিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল।

মুসলিম লীগের সভাপতি মুহম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাস ভূমির দাবি করেন। তিনি ভারতের অন্যান্য জাতিস্বত্ত্বাকে অস্বীকার করে ‘হিন্দু ও মুসলমান’ এই দ্বি-জাতি তত্ত্ব উত্থাপন করেন। হিন্দু-মুসলমান দুটি পৃথক জাতি। তিনি বলেন, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে কেবল ধর্মীয় পার্থক্যই বিদ্যমান নয়, অধিকন্তু তাদের ভিন্ন ভিন্ন সমাজ ব্যবস্থাও বিদ্যমান রয়েছে। হিন্দু ও মুসলমান দুটি ভিন্ন সভ্যতার অন্তর্গত জনগোষ্ঠী। হিন্দু এবং মুসলিম জাতির জীবনধারা ও জীবন দর্শন ভিন্ন। তারা ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করে থাকেন। হিন্দু ও মুসলমান ধর্মীয় কৃষ্টিগত কারণে ভিন্ন ভিন্ন জাতি হওয়ায় উভয়কে নিয়ে একটি ভারতীয় জাতি গঠনের ধারণা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধারণাই এখন ভারতের মূল সমস্যা। এই দুটি জাতিকে পৃথক পৃথক জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া না হলে অখন্ড ভারতের ধ্বংস সূচিত হবে। হিন্দু জাতিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আর মুসলমানদের সংখ্যালঘু হিসেবে গণ্য করে এই দুটি জাতিকে একটি একক রাষ্ট্রে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা সুফলদায়ক হবে না। বরং এতে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ সৃষ্টি হবে এবং রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যাবে। মুসলমানরা কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নয়। বরং যে কোনো সংজ্ঞা অনুসারে একটি জাতি; আর এ জন্য অবশ্যই তাদের নিজস্ব আবাস ভূমি থাকতে হবে। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতের হিন্দু ও মুসলমানদের পৃথক পৃথক জাতি ও পৃথক পৃথক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব তুলে ধরেন; আর এই প্রস্তাব কংগ্রেস সমর্থন করেছিল। সুতরাং এ বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে ভারতের বৈরী মনোভাব পোষণ করা কোনভাবেই যুক্তিসংগত নয়।

বঙ্গবন্ধুর সাথে মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর আন্তরিক সম্পর্কের কারণেই মহান ভারত ১৯৭১ সালে পশ্চিম-পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। এটা বাঙালি জাতির বিশ্বাস। আমারও বিশ্বাস ছিল বিগত ৪৪ বছর। কিন্তু ঘটনার গভীরে যখন প্রবেশ করেছি তখন নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করেছি যে, যদি দু’জনের সুসম্পর্কের জন্য ভারত বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করে থাকে তাহলে শর্তচুক্তি করে হাত-পা বেঁধে নিয়েছিল কেন? সম্পর্ক যদি এত মধুরই হতো তাহলে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের সময় ভারতে গেলেন না কেন? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। যুদ্ধের পূর্বে দুই দেশের মধ্যে একটি কিংবা একাধিক চুক্তি হতেই পারে। কিন্তু তা হতে পারত দুই পক্ষের স্বার্থ সম্বলিত। সেটা কোনভাবেই সাত দফা ভিত্তিক চুক্তির মতো একক স্বার্থ-সম্বলিত নয়। সাত দফা ভিত্তিক চুক্তি বলে ভারত স্থায়ীভাবে বাংলাদেশের সামরিক ও পররাষ্ট্র বিষয়ের কর্তৃত্ব পেয়েছিল। আর সাময়িকভাবে পেয়েছিল প্রশাসনিক কর্তৃত্ব। চুক্তিটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, মূলতঃ আন্তরিক সম্পর্ক নয়, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভারতের এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পণ্য-পরিবহণে তাদের রয়েছে বিশাল সমস্যা। এ ছাড়া ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গ্রুপ বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে তাদের অনেক সমস্যা করে আসছে। উলফার সশস্ত্র সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নমুখী তৎপরতা চালিয়ে আসছে। এ ছাড়া বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা তাদের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের স্বাধীনতার বিষয়ে প্রভাবিত করতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ ভারতের বিশেষভাবে প্রয়োজন। এ কারণেই ভারত সাত দফা ভিত্তিক চুক্তি করে বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। যাতে বাংলাদেশ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু চুক্তি বাতিল করে এমন একটা কান্ড করে বসবেন এবং পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করে মুক্ত করে দেবে ভারত তা ভাবতেই পারেনি।

লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ মানবতাবাদী দল (বিএইচপি)।

e-mail : humannationlism@gmail.com

facebook : @bhpforpeople, cell : 01771-027094