যেভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ক্ষেত্র সৃষ্টি করা হয়!

ড. সুফি সাগর সামস্ : ১৯৭২ থেকে পঁচাত্তর সাল পর্যন্ত বছরগুলোতে যুদ্ধধ্বিস্ত প্রিয় মাতৃভূমিকে আরও ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত করার জন্য অস্ত্রের ঝংকার তুলেছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও চরমপন্থি স্বশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। চরমপন্থি ও যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার বাহিনী সম্মিলিতভাবে অস্ত্রের ঝংকার তুলেছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার বাহিনী যুদ্ধের সময় বাঙালি নিধনে মত্ত ছিল। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ ফেরত একদল উগ্রপন্থি। তারা নানা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দেশজুড়ে চালিয়েছিল মহাতান্ডব। তাদের অপ-কর্মকান্ডে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ভঙ্গুর প্রশাসন গড়ে তোলা কিংবা সচল রাখা বঙ্গবন্ধুর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত সেতু, কালভার্ট, কল-কারখানা মেরামত কাজ তখন যা করা হতো রাষ্ট্রবিরোধী স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধ্াপরাধী-রাজাকার চরমপন্থিরা তখন তা ভেঙ্গে ফেলত এবং উড়িয়ে গুড়িয়ে ও পুড়িয়ে দিত। অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপক ছড়াছড়ি ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ছিল নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। অরাজক পরিস্থিতির ব্যাপকতা ছিল মাত্রাহীন। এই চরমপন্থীদের বিরাট অংশই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতায় অবিশ্বাসী। তারা রাশিয়া (সোভিয়েত ইউনিয়ন), পাকিস্তান ও চীনের অনুসারী এবং সাহায্যপ্রাপ্ত ছিল। এই উগ্রপন্থীদের সামরিক বাহিনীর গেরিলা প্রশিক্ষণ ছিল। ক্ষমতার দম্ভে তারা নিজেদের মধ্যেও সহিংস ঘটনা ঘটাত।

এই দেশদ্রোহীরা স্বাধীনতার পরপরই সন্ত্রাসী তৎপরতা, গুপ্তহত্যা ও সহিংস অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রকলাপ শুরু করে। গুপ্ত ঘাতকের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। পাশাপশি গুপ্ত ও প্রকাশ্য হত্যার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। থানা ও ফাঁড়িতে হামলা করে অস্ত্রসহ মালামাল লুট শুধু নয়, পুলিশও হত্যা করে এই গুপ্তঘাতকের দল। শহর, বন্দর, গ্রাম, গঞ্জ, পাড়া-মহল্লা ইত্যাদি হয়ে ওঠে নিরাপত্তাহীন ও ভীতিকর স্থান। সরকার দলীয় অনেক সংসদ সদস্যও গুপ্তঘাতকদের ভয়ে এলাকায় যেতে পারত না। কয়েকজন সংসদ সদস্যকে হত্যা করে তারা প্রকাশ্য দিবালোকে। এমনকি ঈদের জামাতেও। কল-কারখানা লুট, বোমা হামলা চালানো, পাট ও খাদ্য গুদামে আগুন লাগানো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটায় চরমপন্থিরা।

শ্রেণিসংগ্রামের নামে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে খতমের রাজনীতি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি করে এই চরমপন্থীরা। উত্তরবঙ্গের বহু গ্রামের মানুষ ঘড়বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। বহু নিরিহ সাধারণ মানুষকে ‘শ্রেণিশত্রুর’ অভিধায় জবাই করে হত্যা করা হয়। উত্তরবঙ্গে এক স্কুল শিক্ষককে ভোতা দা দিয়ে জবাই করা হয়। এ সময় এই শিক্ষক ভোতা দা দিয়ে জবাই করার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে হত্যাকারীদের হাতজোর করে অনুনয়-বিনয় করে বলেছিলেন, ‘আমাকে গুলি করে হত্যা কর’। স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদররা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী থাকায় তারা এই উগ্রপন্থীদের সাথে মিশে যায় এবং ক্রমান্বয়ে ধর্মের জিগির তুলতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর সরকার উৎখাতই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী চীনের অনুসারী দলগুলো তাদের দলের নামের আগে স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশ সংযুক্ত করেনি। পূর্ব-পাকিস্তান, পূর্ব-বাংলা নামই তারা ১৯৭৮ সন পর্যন্ত ব্যবহার করেছে এবং তাদের দলের চেয়ারম্যান ছিলেন চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং। তারা বাংলাদেশে চীনের উপনিবেশ গড়তে চেয়েছিল। তখন চীন-পাকিস্তান এক ও অভিন্ন আত্মার মতো ছিল। এ কারণে ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য। চীন ১৯৭৫ এর আগে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিও দেয়নি। এমনকি জাতিসংঘে সদস্যপদ লাভেরও বিরোধিতা করেছিল। যুদ্ধের সময়ও পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। পাকিস্তানকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল।

এই চরমপন্থিদের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্লোগানধারীরা জাসদ এর প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল আবু তাহের ও হাসানুল হক ইনু গণবাহিনী নামে সশস্ত্রবাহিনী গড়ে তুলেছিল। তাদের কাছেও প্রচুর অস্ত্র ছিল। এসব গ্রুপের পাশে নকশাল, সর্বহারা পার্টিসহ আরও নানা বাহিনী ছিল। তারা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি থেকে সন্ত্রাসী তৎপরতা, গুপ্তহত্যা ও সহিংস অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ শুরু করেছিল। ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ চরমপন্থিদের হাতে নিহত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩ শতাধিক। ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সংসদ নির্বাচনের পর গুপ্তহত্যা ও গুপ্তঘাতকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই বছরের জুন মাস পর্যন্ত চরমপন্থিদের হাতে নিহত আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মী এবং মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায় গুপ্তঘাতক ও অন্যান্য সহিংস অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপে। ফলে ১৯৭৩ সালের মে মাস পর্যন্ত ১৭ মাসে গুপ্তহত্যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৪ হাজার ৯২৫টি। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ফাঁড়িতে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছিল ৬০টি। দেশব্যাপী সংশয়, আতঙ্ক ও ত্রাসের রাজত্ব তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়। এ পরিস্থিতিকে নিজেদের সহিংসতার রাজনীতির সাফল্য বলে মনে করে চরমপন্থি দলগুলো।

এমতাবস্থায় তারা তাদের সশস্ত্র সহিংস তৎপরতা ব্যাপকভাবে বাড়াতে থাকে। আদর্শগত কারণে নয়, বরং নেহায়েত অস্ত্র সংগ্রহ করে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য বহু রাজাকার, আলবদর, আলশামস, কোলাবরেটর চরমপন্থি ও সন্ত্রাসী দলগুলোতে যোগদান করে অস্ত্রসহ। দেশজুড়ে সন্ত্রাস, হামলা, হত্যাকান্ড অব্যাহত রাখে। এসব রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা থানা ও ফাঁড়ি লুট করে অস্ত্র সংগ্রহ করত। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র সমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু রাজাকার, মাওবাদী, গণবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র জমা দেয়নি বরং আরও অস্ত্র সংগ্রহ করে তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে ধ্বংসের চুড়ায় নিয়ে যায়। জনজীবনকে বিষিয়ে তুলেছিল তারা অস্ত্রের ঝংকারে। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরও জনজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার সবরকম পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই চরমপন্থিরা। তখন তাদের সঙ্গে কিছু শিক্ষিত ব্যক্তিও যোগ দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর দেশ গড়ার আহ্বান সত্ত্বেও তারা স্বাভাবিক জনজীবনকে দুর্বিষহ করে অস্ত্রের ঝংকারে।

এভাবে সশস্ত্র রাজনীতির নামে মানুষ হত্যার প্রক্রিয়া শুরু করা হলে বঙ্গবন্ধু তা কঠোর হাতে দমনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী নামানো হয়। অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের ফলে ১৯৭৫ সালের দিকে তারা ক্রমে স্তিমিত হয়ে আসছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এরা দোর্দন্ড প্রতাপে প্রকাশ্যে চলে আসে। অনেকে জেনারেল জিয়াউর রহমানের দলে যোগদান করেন। ১৯৭২ থেকে চুয়াত্তর সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে যে অরাজকতার সৃষ্টি করে মাওবাদী, চরমপন্থি, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী এবং রাজাকার আলবদর বাহিনী, তার ফিরিস্তি কিংবা শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়নি। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের সংবাদপত্র এবং বিভিন্ন লেখকের প্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে সংকলিত করে প্রাথমিক যে খতিয়ান মেলে তাই তুলে ধরা হলো। এর বাইরেও অনেক ঘটনা আছে।

সংকলক : ড. সুফি সাগর সামস্, মহাসচিব, বাংলাদেশ মানবতাবাদী দল-বিএইচপি
ফোন : ০১৭৭১-০২৭-০৯৪, facebook : @bhpforpeople

G-mail : humannationlism@gmail.coom