কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে হচ্ছেটা কী?

টুডে সংবাদ ডেস্ক : সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরতরা শাসকদল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের মারধর ও হামলার শিকার হচ্ছে৷ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন নিখোঁজ বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে৷ খবর ডয়চে ভেলে।

শিক্ষার্থী দেরকোটা সংস্কার আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ এপ্রিল সংসদে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সরকারি চাকরিতে কোনো ধরনের কোটাই আর থাকবে না৷ সব ধরনের কোটা তুলে দেয়া হবে৷ আর এ নিয়ে কাজ করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশনাও দেয়া হয়৷ কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি৷ সোমবার দুপুরে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানান, ‘‘সহসাই কোটা সংস্কার হচ্ছে না৷ আরো সময় লাগবে৷” তিনি আরো বলেন, ‘‘কমিটি এখনও কাজ শুরু করেনি৷ কোটা সংস্কারের বিষয়টি আপনারা যতটা সহজ মনে করেন কাজটা তত সহজ নয়৷ এটি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন কাজ৷ এখন নীচু লেভেলে কাজ চলছে৷ ওপর লেভেল পর্যন্ত আসতে তো কিছুটা সময় লাগবে৷ এটি সময়সাপেক্ষ বিষয়৷”

কিন্তু বিকেলে সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোটা সংস্কারে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে৷ কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

এর আগে কোটা সংস্কার আন্দোনকারীরা শনিবার হামলার শিকার হন৷ রবি ও সোমবারও তাঁদের ওপর হামলা হয়৷ আটক করা হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা রাশেদকে৷ আর হামলায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন আরেক নেতা নুরুল৷ কোটা সংস্কার আন্দোলনের আহ্ববায়ক হাসান আল মামুন ডয়চে ভেলের কাছে অভিযোগ করেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার তিন মাসেওকোটা সংস্কারের কোনো প্রজ্ঞাপন হয়নি৷ তাই শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির সামনে আমরা প্রজ্ঞাপনের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন ডাকি৷ সেখানেই আমাদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ৷ এরপর আন্দোলনকারীদের খুঁজে খুঁজে মারধর করা হয়৷এর প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীদের ওপরও হামলা হয়৷ হামলায় আমি ও নুরুলসহ কয়েকজন আহত হই৷ রাশেদকে গ্রেপ্তার করা হয়৷”

তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘সোমবারও শহীদ মিনারে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ৷ রাশেদসহ আমাদের চারজন শিক্ষার্থী নিখোঁজ আছে৷ তারা কোথায় আমরা জানি না৷ আবারো হামলার আশঙ্কায় আছি৷ হুমকি দেয়া হচ্ছে৷ ঢাকায় আমরা বাইরে বের হতে পারছি না৷”

তিনি বলেন, ‘‘প্রধামন্ত্রী কোটা সংস্কারের যে ঘোষণা দিয়েছেন তা তিন মাসেও বাস্তবায়ন হয়নি৷ আমরা তো মাঠে থাকতে চাই না৷ আমাদেরও তো পড়শুনা আছে৷ মন্ত্রিপরিষদ সচিব সোমবার সকালে বলেন, সহসা কোটা সংস্কার হবে না৷ আর বিকেলে সরকার সংস্কারের জন্য কামিটি গঠন করে ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার কথা বলে৷ এই কমিটি যদি আগে গঠন করা হতো. যদি ঠিক সময়ে প্রতিবেদন দেয়া হতো, তাহলে এই নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না৷ আমরা চাই, কোটা সংস্কারে আর দেরি করা হবে না৷ আটকদের ছেড়ে দিতে হবে, আহতদের সরকারি খরচে চিকিৎসা দিতে হবে এবং হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের আইনের আওতায় আনতে হবে৷”

এই হামলার জন্য সরাসরি যাদের দায়ী করা হয়েছে, তাদের মধ্যে একজন হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন রহমান৷ হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা হামলা করিনি, আমরা তাদের প্রতিহত করেছি৷ আমরাও কোটা সংস্কারের পক্ষে৷ প্রধানমন্ত্রী সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন৷ কিন্তু জামায়াত-শিবির, ছাত্রদলের কিছু লোক এই ইস্যু ব্যবহার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল৷ আমরা তাদের তা করতে দেইনি৷ আমরা ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা রক্ষা করছি৷”

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘হামলার ব্যাপারে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি৷ দু-একজন ছাত্র ব্যাক্তিগত পর্যায়ে কথা বলেছেন৷ আমরা তা সেভাবেই দেখছি৷ আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো বাইরের ইস্যু নিয়ে বিশৃঙ্খলা করতে দেবো না৷”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষার দয়িত্ব ছাত্রলীগের কিনা– এ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘‘কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইজারা দেয়া হয়নি৷ এখানে প্রশাসন আছে, নিয়ম আছে৷ ছাত্র-শিক্ষক সবাই মিলে আমরা এখানকার শান্তি- শৃঙ্খলা রক্ষা করি৷”

এদিকে যাকে নিখোঁজ বলা হচ্ছিল, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সেই ফারুক হাসানকে মঙ্গলবারই শাহবাগ থানা পুলিশ গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে৷ ঢাকা মেট্রেপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা হয়েছে৷” তার সঙ্গে তরিকুল ইসলাম এবং জসিমউদ্দিন নামে আরো দু’জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷

ফারুককে রবিবার ছাত্রলীগ নেতা আল আমিন রহমান শহীদ মিনার এলাকা থেকে তুলে নিয়ে থানায় দিয়ে আসে৷

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের জন্য ধারাবাহিক আন্দোলন শুরু হয়৷ সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা ৩০, জেলা ১০, নারী ১০ এবং উপজাতি কোটা ৫ শতাংশ৷ এই ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে এক শতাংশ পদে প্রতিবন্ধী নিয়োগের বিধান রয়েছে৷ তবে সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত, আধা-স্বায়ত্বশাসিত, বিভিন্ন করপোরেশন ও দফতরে সরাসরি নিয়োগে জেলার জনসংখ্যার ভিত্তিতে জেলাওয়ারি কোটা পুনঃনির্ধারণ করা হয়৷ সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর জেলাওয়ারি কোটা নির্ধারণ করা হয়েছিল৷

১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে কমিটি গঠনের কথা বললেও বাস্তবে কমিটি গঠন হলো সোমবার, অর্থাৎ সেই ঘোষণার তিন মাস পর৷

টুডে সংবাদ/ইমানর/উদয়া
প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন,লাইক দিন এবং শেয়ার করুন।