বন্যায় ভাসছে মৌলভীবাজার,সরকারি কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে

নিজস্ব প্রতিবেদক,মৌলভীবাজার : অতি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে গত ২৭ রমজান (১৩ জুন) থেকে মৌলভীবাজার জেলার মনু ও ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙ্গে সৃষ্টি হয় আকস্মিক বন্যার। নিমিশেই প্লাবিত হয়ে যায় কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলার ১৩২টি গ্রামে। এতে পানি বন্দি হয়ে পড়েন প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে যায় এসব উপজেলায়। এর কিছু দিন পর আরেকটি স্থানে মুন নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয় জেলা শহর। সেখানেও পানি বন্দি হয়ে পড়েন প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ। তাৎক্ষণিক সরকারি ছুটি বাতিল করা হয় জেলার দায়িত্বশীল কর্তকর্তাদের।

বন্যা পরিস্থিতি ভয়ানক আকার ধারণ করায় মোতায়েন করা হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ঈদের দিন দুপুর থেকে কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলায় পানি বন্দি মানুষদের উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন সেনারা। মাত্র কয়েক ঘন্টায় কিছুই অবশেষ রেখে যায়নি সর্বনাশা বন্যার পানি। পানির স্রোতে ভেসে গেছে ঘরের আসবাব পত্র ও গৃহপালিত পশু। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির কান্নার মাঝে ভুক্তভোগী বানভাসী সাংবাদিকদের সামনে হাউ-মাউ করে কাঁদছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের তিনটি স্থান এবং কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের সাতটি স্থানে ভেঙ্গে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

এসব বন্যাদুর্গত এলাকায় প্রশ্নবৃদ্ধ কাজ করেন জেলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। একের পর এক ত্রান মন্ত্রীর প্রশ্নে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন সিভিল সার্জন, জেলা কৃষি অফিসার, শিক্ষা অফিসার ও চার খাদ্য গুদামের কর্তকর্তারা। এমনকি ডিসির দেয়া বিভিন্ন তথ্যের সাথে গড়মিল রয়েছে এসব সরকারি অফিসারদের।

অন্যদিকে নদীর বাধ ভেঙ্গে প্লাবিত হওয়ার দুই দিন আগেও (যখন কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও রাজনগর প্লাবিত ছিল) বন্যার ব্যাপারে জেলার খাদ্য কর্তকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক। কিন্তু কে শোনে কার কথা। জেলা খাদ্য কর্মকর্তাদের ঘুম ভাঙ্গল চারটি গুদামের আড়াই কোটি টাকার চাল ও গম জলে ভেজার পর। অথচ জেলা শহরে পানি প্রবেশের ৪ দিন আগে থেকেই সর্তক সারা শহরে মানুষ ছিল সতর্ক। পানির আক্রমন থেকে বাঁচতে জেলা শহরের ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছিলেন ।

তবে জেলা খাদ্য গুদামের ইনচার্জ মো. সাখাওয়াত হোসেন ও জেলা খাদ্য কর্মকর্তার মনোজ কান্তি দাস চৌধুরী তুয়াক্কাই করলেন না জেলা প্রশাসকের নির্দেশনার। এদিকে বন্যাদুর্গত এলাকায় মেডিকেল টিম কাজ করার কথা থাকলেও অসিস্ত পাওয়া যায়নি কোথাও। যদিও জেলা সিভিল সার্জন জানিয়েছেন বন্যাদুর্গত এলাকার জন্য ৭৪টি টিম গঠন করা হয়েছে। এনিয়ে ত্রান মন্ত্রীর উপস্থিতিতে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় চরম সমালোচনার মূখে পড়েন জেলা সিভিল সার্জন।

কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের আজিজুর রহমান বুলু জানান, ‘বন্যাদুর্গত এলাকায় কাজ করছি কিন্তু গত ৬ দিনে কোথাও কোনো মেডিকেল টিম দেখিনি।’ রাজনগর উপজেলার আশ্রাকাপন গ্রামের বন্যাকবলিত গ্রামের ছাইদুল ইসলাম জানান, ‘মেডিকেল টিমের কথা শুনেছি তবে বাস্তবে দেখিনি।’

শরীফপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জুনাব আলী বলেন-‘এতদিন থেকে আমার ইউনিয়নের মানুষ পানি বন্দি। কিন্তু মেডিকেল টিমের খবর নাই।’ সরকার চাহিদার তুলনায় দিগুণ সেবা দিতে রাজি থাকলেও কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। কাগজে কলমে তারা বন্যাদুর্গতদের নিয়ে কাজ করার হিসেব দিলেও বাস্তবে তার চিত্র উল্টো।

এদিকে চাহিদার তুলনায় মানুষ ত্রাণ কম পাচ্ছে অথচ সরকারি কর্মকর্তাদের অবহেলায় নষ্ট হয়েছে ত্রাণ। মৌলভীবাজার পৌরশহরে শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করায় খাদ্য গুদামের ৫৫০ টন চাল-গম পানিতে ভিজে গেছে খাদ্য কর্মকর্তাদের উদাসীনতায়।

অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে দেখা যায় বন্যায় এলকার সম্পর্কে কোন দখল নেই তাদের। তাদের দেওয়া তথ্যের সাথে পার্থক্য রয়েছে জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্য।

জেলা প্রশাসকের হিসেব মতে, জেলায় আউশ ধান নষ্ট হয়েছে ২ হাজার ৯৬০ হেক্টর কিন্তু জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শাহাজান জানিয়েছেন এক হাজার ৫০০ হেক্টর। জেলা কর্মকর্তা হয়েও উনার কাছে ফসলের হিসেব নেই।

জেলার বিভিন্ন স্কুলে ৬০টির মত আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে কিন্তু জেলা শিক্ষা অফিসার একটি স্কুলও সরেজমিনে দেখেননি। বন্যাকবলিত মানুষ কয়টা স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে তা নিয়ে তাঁর কাছে কোনো হিসেব নেই। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান- ‘১০০ টি আশ্রয় কেন্দ্র আছে।’ কয়েকটি কেন্দ্রের নাম জানতে চাইলে কিছুই বলতে পারেননি তিনি।

সরকারি হিসেবে মোলভীবাজার জেলায় প্রায় দুই লাখ লোক পানিবন্দি অথচ সিভিল সার্জন ডা. মো. আবু জাহের জানিয়েছেন, তারা ১০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিলি করেছেন। মজুদ আছে আরও ছয় হাজার

দুই লাখ লোকের পানির চাহিদায় যা খুব সামান্য। অথচ আগে থেকেই বারবার সতর্ক করা হলেও সরকারের কাছে কোনো চাহিদাপত্র তারা পাঠাননি। যে ১০ হাজার বিলি করেছেন তারও কোনো দেখা নেই।

সরজমিনে জেলার কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলা ঘুরে অন্তত ২০ জন বন্যা কবলিত মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা কেউই পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পাননি। রাজগর উপজেলার মনসুরনগর ইউনিয়নের প্রেমনগর গ্রামের দুলুু মিয়া ও মুহিত মিয়া জানান, তারা বাধ্য হয়ে জীবন বাঁচাতে বন্যার পানি খাচ্ছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের উদাসীসনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। সদর উপজেলার মিরপুর

গ্রামের বদরুল ইসলাম বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের এমন আচরণ বন্যা প্লাবিত এলাকার মানুষের সঙ্গে উপহাস। যা ক্ষমার অযোগ্য। সরকারি কর্মকর্তাদের এমন অবহেলার কথা স্বীকার করেছেন খোদ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। সোমবার মৌলভীবাজারে তিনি জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সভায় একে একে দায়িত্বশীল বন্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কর্তকর্তাদের কাছে তথ্য জানতে চাইলে, কাজের বিবরণ শুনে উষ্মা প্রকাশ করেন।

টুডে সংবাদ/ইমানুর রহমান