দুর্নীতি, জনগণের মাল, দরিয়ায় ঢাল!

আসিফ নজরুল : আমার বাবা ছিলেন বাংলাদেশ বেতারের একজন প্রকৌশলী। প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি সংসার চালানোর জন্য অফিস শেষে টিউশনি করতেন। তাঁর চরম কৃচ্ছ্র নিশ্চয়ই প্রভাব ফেলেছিল আমাদের জীবনে। যেমন: সর্বশেষ মোবাইল ফোনসেট কিনতে আমি খরচ করতে
পেরেছি ১৪ হাজার টাকা। খোঁজ নিয়ে দেখি, আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মোবাইল সেটের দাম এ রকমই, দু-একজনেরটা বড়জোর ২৫-৩০ হাজার টাকা।

মোবাইল ফোন নিয়ে এই খোঁজখবর নিয়েছি সরকারের একটি সিদ্ধান্ত জানার পর। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক মোবাইল সেট কেনার জন্য মন্ত্রী ও সচিবদের ৭৫ হাজার টাকা করে দেবে সরকার। মোবাইল সেটের যে এত দাম হতে পারে, সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। মোবাইল সেট দেওয়ার নামে এই অপচয়ের যুক্তি কী?

সরকারের টাকা মানে হচ্ছে অবশ্যই জনগণের টাকা। এটি বিদেশ থেকে অনুদান পাওয়া অর্থ নয়, সরকারের লোকজনের উপার্জিত অর্থ নয়, তাঁদের দানকৃত অর্থও নয়। এই টাকা বাংলাদেশের মানুষের শ্রমে-ঘামে অর্জিত অর্থ, তাদেরই দেওয়া (এবং সরকার কর্তৃক দফায় দফায় বাড়ানো) বিভিন্ন কর, সারচার্জ ও বিল। এই জনগণের এক শতাংশও কি রাজি হবে তাদের উপার্জিত অর্থে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ৭৫ হাজার টাকায় মোবাইল কিনে দিতে? বিনা খরচে এই ফোনে তাঁদের ইচ্ছামতো কথা বলতে দিতে? কী সম্পর্ক আছে এর সঙ্গে জনস্বার্থের?

মোবাইল ফোনের টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে, এমনকি যুগ্ম সচিব পর্যায়ের আমলাদের পর্যন্ত ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা বিনা সুদে ঋণ দেওয়া হয়েছে, গাড়ি ‘পোষা’ বাবদ মাসে ৫০ হাজার টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে, বাড়ি কেনার জন্যও ৭৫ লাখ টাকা বিনা সুদে দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তারা সংবিধানে বর্ণিত আছেন জনগণের সেবক হিসেবে। সংবিধানের ২১ (২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যক ব্যক্তির কর্তব্য।’ আর সংবিধানের ৭ (১) অনুসারে, এই রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক হচ্ছে জনগণ।
মালিকের অর্থ সেবককে খরচ করতে হয় যৌক্তিক কারণে, মালিকের সম্মতি নিয়ে। পৃথিবীর যেকোনো সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটাই অলঙ্ঘনীয় নিয়ম। এসব রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাই কখনোই কোনো ব্যক্তির বা কতিপয় ব্যক্তির ইচ্ছায় রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচের সিদ্ধান্ত হয় না। সংসদ, সংসদীয় কমিটি, অর্থ মন্ত্রণালয় ও একনেকের মতো আরও বিভিন্ন তদারকি ব্যবস্থা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে খতিয়ে দেখে কোন ব্যয় বরাদ্দের যথার্থতা। এসব রাষ্ট্রে সরকারি যান বা টেলিফোন ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার হলে, কোনো রাষ্ট্রীয় সফরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিলে বা যেকোনো কাজে অনাবশ্যক খরচ হলে তীব্র সমালোচিত হয়ে ক্ষমতাধরদের পদত্যাগ করার ঘটনাও ঘটে। আমাদের দেশে এসবের দায় নেই কারও। ‘সরকার কা মাল, দরিয়ামে ঢাল’-এমন আপ্তবাক্য তাই এ সমাজেই জন্ম নেয়, উচ্চারিত হয় অসীম অসহায়তায়।

২.
ক্ষমতাধর ব্যক্তি, মন্ত্রী বা সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পক্ষে দুর্বলভাবে হলেও কিছু যুক্তি আছে। তা ছাড়া সব বাড়তি সুবিধা দেওয়ার পরও তাঁদের জন্য যে ব্যয় বরাদ্দ হচ্ছে, তা অন্য কিছু সম্পূর্ণ অনৈতিক ব্যয় বরাদ্দের তুলনায় কিছুই না। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে জনগণের অর্থ থেকে এসব ব্যয় বরাদ্দ করা হচ্ছে জনগণের অর্থ লুটে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত বা তা ঠেকাতে ব্যর্থ গোষ্ঠীদেরই স্বার্থে!

খেলাপি ঋণ অবলোপন এমনি একটি ব্যবস্থা। খেলাপি ঋণ এ দেশে আগেও ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক কালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য অঙ্কে। শুধু ২০১১ সাল থেকে পরবর্তী ছয় বছরে এই ঋণের পরিমাণ হয় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৫ হাজার কোটি টাকা আর কোনো দিন আদায় হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। এই অবলোপনকৃত ঋণের অধিকাংশই মঞ্জুর করা হয়েছিল সরকারি লোকজনের প্রভাবে, সরকারের কারও না কারও ঘনিষ্ঠ মহলকে। ঋণের নামে অবাধে লুটপাট করতে দেওয়ার এই প্রক্রিয়ার কারণে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি ৯টি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এই ব্যাংকগুলোকে পুনঃ মূলধনের নামে এখন পর্যন্ত বরাদ্দ করা হয়েছে সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা!

বরাদ্দটা করেছে সরকার। কিন্তু মনে রাখতে হবে, টাকাটা জনগণের। পুনঃ মূলধনের নামে জনগণের সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা এসব ব্যাংকে আবারও দেওয়া হচ্ছে ব্যাংক লুট ব্যবস্থার ফাঁকফোকরকে অব্যাহত রেখে (যেমন সরকারি ব্যাংকে পরিচালক পদে দলীয় ব্যক্তিদের রেখে) বা কখনো, এমনকি আরও জোরালো করে (যেমন বেসরকারি ব্যাংককে একই পরিবার থেকে পরিচালকদের সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে, এসব ব্যাংককে সরকারি টাকা রাখার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে)। প্রশ্ন হচ্ছে জনগণের কি সম্মতি আছে এসব বিষয়ে? জনগণ কি কোনোভাবে সম্মত হতে পারে তাদের টাকা লুটপাটের ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে?
জনগণের টাকা লুটপাটের আরও বহু ব্যবস্থা চালু আছে এ দেশে। ‘ভুল’ পরিকল্পনায় রাস্তা নির্মাণে শত শত কোটি টাকা গচ্চা, দফায় দফায় সেতু নির্মাণে হাজার কোটি টাকা খরচ বাড়ানো, অদক্ষ ও কাঁচা প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহজনক প্রক্রিয়ায় সরকারি কাজের বরাদ্দ দেওয়ার বহু খবর আমরা দেখি পত্রিকার পাতায়। কিছুদিন আগে জানা গেল, বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানকে জেনেশুনে শূন্য গ্যাসফিল্ড খুঁড়তে দিয়ে ২৩০ কোটি টাকা লুটে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে সরকারের জ্বালানি বিভাগ! কোনো ভাগ না পেয়েই কি জনগণের অর্থের এই হরিলুটের ব্যবস্থা করেন সরকার বা তাদের নিয়োজিত লোকজন?

এ দেশে দুর্নীতি দমন বিভাগ আছে, সংসদীয় কমিটি আছে, আদালত আছেন। জনগণের টাকায় এসব হরিলুটের ফুট সোলজারদের বিচার হয় মাঝে মাঝে, কিন্তু কুশীলবেরা থাকেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। জনগণের অর্থের লুটপাট তাহলে বন্ধ হবে কীভাবে?

৩.
জনগণের সঙ্গে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি মূল সূত্র রয়েছে। তা হচ্ছে জনগণ থেকে সরকার অর্থসংস্থান করবে শুধু জনগণের সেবা, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির জন্য। কাজটি করার জন্য সরকারের মন্ত্রী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন পাবেন। জনগণের স্বার্থে এই অর্থের পরিমাণ বাড়ানো যাবে, যদি জনগণের প্রতিনিধিরা বিশদ ও প্রকাশ্য আলোচনার পর এতে সম্মত হন। জনগণের স্বার্থে এসব, এমনকি কমানোর ঘটনাও ঘটে (যেমন মালয়েশিয়ায় সম্প্রতি মন্ত্রীদের বেতন ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে) জনবান্ধব রাষ্ট্রগুলোতে। জনগণের টাকা নিয়ে দুর্নীতি হলে, অপচয় হলে, লুটপাট হলে এ জন্য তাঁদের বিচারের সম্মুখীন হতে হয় জনগণের অর্থে প্রতিষ্ঠিত আদালতে।

জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য তাই সংসদে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি থাকতে হয়, সংসদে অর্থবহ আলোচনা হতে হয়, পাবলিক অ্যাকাউন্ট বা এস্টিমেট কমিটিগুলোর মতো ফোরামে বিরোধী দলের সদস্যদের রাখতে হয়, বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হয়, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। না হলে হাজারো প্রক্রিয়ায় জনগণের গলায় পা রেখে, তাদের থেকে অর্থ আদায় করে যা ইচ্ছা তা-ই করা হয়। রাস্তা ভেঙেচুরে গর্তে পরিণত হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থেকে নিঃশেষ হয় মানুষের জীবনীশক্তি, অন্ধকারে ডুবে থাকে দেশ, অনাহারে, বিনা চিকিৎসায়, বিনা বিচারে মারা যায় মানুষ। এই সবকিছুকে আড়াল করার জন্য আয়োজন করা হয় নানা ধরনের মেকি সাফল্য উদযাপনের আতশবাজি।

আমাদের অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঠিক এমনই। সরকারকে জবাবদিহি করার মতো প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাগুলোতে অবক্ষয় ও দূষণ অব্যাহত থাকলে দিনে দিনে এটি হতে পারে আরও শোচনীয়।

আসিফ নজরুল : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক