রাজধানীর জলাবদ্ধতা, বছর বছর উঁচু হচ্ছে ঢাকার রাস্তা

  • ঢাকার জলাবদ্ধতা
  • রাস্তা উঁচু হওয়ায় আশপাশের গলিগুলো নিচু হয়ে যাচ্ছে।
  • বন্ধ হচ্ছে অনেক ম্যানহোল ও ক্যাচপিট।
  • বৃষ্টির পানি ঢুকছে বাড়ির নিচতলায়।

সাদ্দাম হোসাইন : রাজধানীর রমনার সিদ্ধেশ্বরী রোডের অপ্সরা, অন্তরা, অনন্যা ও পরমা নামে পাশাপাশি চারটি বহুতল ভবন। নির্মাণের সময় সামনের রাস্তাটি ছিল ভবনগুলোর নিচতলার চেয়ে নিচু। গত সাত বছরে অবস্থা একেবারে উল্টে গেছে। এখন সড়ক উঁচু আর নিচু হয়ে গেছে ভবনের নিচতলা।

সংস্কারের জন্য দফায় দফায় রাস্তাটিতে পিচ বা কংক্রিটের পরত দেওয়ায় এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার পানি নিচতলায় ঢুকে আটকে থাকে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, নিচতলার গাড়ি রাখার জায়গায় প্রায় আধহাঁটু পানি জমার দাগ রয়েছে দেয়ালে। ভবনগুলোর নিরাপত্তারক্ষী নাজিম উদ্দিন বলেন, রাস্তা সংস্কারের কারণে এ অবস্থা হয়েছে। এই সড়কের খন্দকার গলি, তত্ত্বের গলিসহ শাখা পথগুলো বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

শুধু সিদ্ধেশ্বরী রোড নয়, ঢাকার অধিকাংশ সড়কেই এই অবস্থা। সংস্কারের সময় পুরোনো পিচ বা কংক্রিটের পরত তুলে ফেলা হয় না। তার ওপর নতুন করে ঢালাই করা হয়। ফলে বছর বছর রাস্তার উচ্চতা বাড়ে।
নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, এটি জোড়াতালি মার্কা কাজ। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার পিচ পুরোপুরি না তুলে নতুন করে তার ওপর পিচ ঢালাই করলে সেটিও বেশি দিন টিকবে না। এতে রাস্তার ভিত্তি যেমন দুর্বল হয়, তেমনি পানি নিষ্কাশনের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়। রাস্তা সংস্কারের সময় অবশ্যই পুরোনো স্তরটি তুলে ফেলতে হবে।

বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরে দেখা গেছে, বারবার সংস্কারের কারণে অনেক ম্যানহোল নিচু হয়ে গর্তের মতো হয়ে আছে। দ্রুতগতিতে ছুটতে গিয়ে প্রায়ই যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়ে। আসাদ অ্যাভিনিউ, নিউ এলিফ্যান্ট রোডে এখনো এমন অনেক ম্যানহোল রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ম্যানহোলের ওপর দিয়েই পিচ ঢালাই করা হয়েছে। ফলে ম্যানহোল বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ঢেকে ফেলা হয়েছে ক্যাচপিট (ফুটপাতের পাশের পানি নিষ্কাশনের পথ)।

ঢাকা ওয়াসার পরিচালক (কারিগরি) এ কে এম সহিদ উদ্দিনজানান, ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের রাপা প্লাজার সামনে থেকে আসাদ অ্যাভিনিউয়ের পাশে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত ৫৮টি ক্যাচপিট ও ম্যানহোল ছিল। রাস্তা সংস্কারের সময় ১৭টি ছাড়া বাকিগুলো ঢেকে ফেলা হয়েছে।
রাস্তা সংস্কারের প্রচলিত পদ্ধতি বদলাতে ২০১৬ সালে প্রায় ২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কোল্ড মিলিং মেশিন’ ও অন্যটি ‘কোল্ড রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট’ নামে দুটি আধুনিক যন্ত্র কিনেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। মিলিং যন্ত্রটি দিয়ে রাস্তায় ১৩ ইঞ্চি গভীর পর্যন্ত পিচ ও ইটপাথর কাটা যায়। ১২ ফুট প্রস্থের এক কিলোমিটার রাস্তা কাটতে সময় লাগে এক ঘণ্টা। কাটার পর বেরিয়ে আসা ইটপাথর ও পিচ পুনঃপ্রক্রিয়া করা হয় রিসাইক্লিং যন্ত্র দিয়ে। এভাবে যন্ত্র দুটি দিয়ে এক কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করতে সময় লাগে এক ঘণ্টা।

২০১৬ সালের নভেম্বরে পলাশী থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত সড়ক যন্ত্র দুটি দিয়ে সংস্কারের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করা হয়। এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি সড়ক সংস্কার করা হয়েছে যন্ত্র দুটি দিয়ে। পরে যন্ত্র দুটির আর ব্যবহার হয়নি। এ সময়ে দুই সিটি করপোরেশনে কয়েক শ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার হয়েছে প্রচলিত পুরোনো পদ্ধতিতেই। ফলে এই সড়কগুলোর উচ্চতা বেড়েছে।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তোপখানা রোডের একটি অংশ মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য কাটা হচ্ছে। কাটা অংশ থেকে দেখা গেছে, বারবার পরতের পর পরত পিচ ঢালাই করে সংস্কার করায় নতুন-পুরোনো মিলিয়ে প্রায় এক ফুট উঁচু হয়েছে ঢালাইয়ের অংশ। এর নিচের রয়েছে সড়কের বালু, খোয়ার মূল ভিত্তি।

বিসিএস প্রশাসন একাডেমির সামনের সড়কেও (ময়মনসিংহ রোড) দেখা গেছে, সংস্কারের ফলে পাশের দোকানগুলোর মেঝে থেকে রাস্তাটি উঁচু হয়েছে। ফলে একটু ভারী বৃষ্টি হলেই দোকানের ভেতরে পানি চলে আসে। পুরোনো পিচ না তুলে এর ওপর নতুন পিচ বসানোর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে টিএসসিতে নিবন্ধিত এক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুরোনো পিচ তুলতে গেলে অতিরিক্ত সময় ও খরচের প্রয়োজন হয়। এ জন্য আলাদা বরাদ্দও থাকে না। তাই পুরোনো পিচের ওপরই তাঁরা নতুন করে সংস্কার করেন।

রাস্তা সংস্কার ও আধুনিক যন্ত্র দুটি সম্পর্কে ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিছুর রহমান বলেন, আধুনিক যন্ত্র দুটি দিয়ে পলাশী মোড় থেকে নিউমার্কেট, ধানমন্ডি ২৭ নম্বর থেকে রাসেল স্কয়ার ও ডিএনসিসি এলাকায় সাতরাস্তা সড়ক পরীক্ষামূলকভাবে সংস্কার করা হয়েছে। এতে সফলতা পাওয়া গেছে। আগামী অর্থবছর থেকে রাস্তা সংস্কারের ক্ষেত্রে যন্ত্র দুটি ব্যবহার করা হবে। দুটি যন্ত্র পর্যাপ্ত নয়। এমন আরও যন্ত্র কেনা হবে, তখন এগুলো ভাড়া নিয়ে ঠিকাদারেরা রাস্তা কেটে সংস্কার করবেন। এতে খরচও অনেক কমবে।