একাদশ জাতীয় নির্বাচন, বিপরীতমুখী কৌশলে সরকার ও বিএনপি

  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
  • নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান দুই দলের মুখোমুখি অবস্থান
  • নির্বাচন নিয়ে জনমনে নানা শঙ্কা দানা বাঁধছে।

সেলিম জাহিদ : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাংঘর্ষিক বা বিপরীতমুখী কৌশলে এগোচ্ছে সরকার ও বিএনপি। বিএনপিকে চাপে ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচন করার ছকেই এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। আর বিএনপির অবস্থান হচ্ছে খালেদা জিয়াকে নিয়েই নির্বাচনে যাওয়া। খালেদা জিয়াবিহীন নির্বাচন প্রতিরোধ করার কথাও বলছেন দলটির নেতারা।

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান দুই দলের মুখোমুখি অবস্থানের যতই প্রকাশ ঘটছে, ততই নির্বাচন নিয়ে জনমনে নানা শঙ্কা দানা বাঁধছে। এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবেশ যা, তাতে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি না, গেলেও সে নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কী হয়—এ ধরনের নানা প্রশ্নে সব মহলে সংশয় বাড়ছে।

বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকার এখন পর্যন্ত তার পুরোনো নির্বাচনী ছকেই আছে। খালেদা জিয়াকে একটি সাজানো দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দী করা এবং তাঁর জামিন দীর্ঘায়িত করা ওই ছকেরই অংশ। এখন সরকারের কৌশল হচ্ছে নতুন নতুন বিষয় সামনে এনে বিএনপির নেতৃত্বকে ব্যস্ত রাখা ও মানুষের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরানো। সর্বশেষ তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক তোলাও এই কৌশলের অংশ বলে মনে করেন বিএনপির নেতারা।

অবশ্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান প্রথম আলোকে বলেন, খালেদা জিয়ার সাজা, তাঁর জামিন স্থগিত, তাঁর অসুস্থতা এবং সর্বশেষ তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছে, এসব বিতর্ক বিএনপি নিজেরা তৈরি করেছে। এতে সরকারের কিছু নেই।

রাজনৈতিক মহল মনে করছে, দুর্নীতির মামলায় সাজা দিয়ে খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী করাসহ বিএনপিকে চাপে এবং নানা বিষয়ে ব্যস্ত রাখতে সরকার অনেকটাই সফল। আন্তর্জাতিক মহল থেকেও সরকারের ওপর কোনো দৃশ্যমান চাপ নেই। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের একটি বড় প্রতিনিধিদল প্রতিবেশী দেশ ভারতের ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করে এসেছে। সব মিলিয়ে সরকারি দল অনেকটাই ফুরফুরে মেজাজে আছে।

খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার পর বিএনপিতে ভাঙন ধরাতে সরকারি মহলের একটা চেষ্টা ছিল। এখন পর্যন্ত সে চেষ্টা সফল হয়নি। তবে সরকারি ওই মহল মনে করে, নির্বাচন কাছাকাছি এলে বিএনপিতে বিভক্তি হতে পারে। দলের মূল অংশ যদি খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়, আরেকটি অংশ খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেবে। বিএনপির ওই খণ্ডিত অংশকে নিয়ে সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করছে বলে গুঞ্জন আছে। সরকারের এই কৌশলের বিষয়ে সতর্ক বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বও। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে কারা নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে থাকতে পারেন, এমন নেতাদের নাম ও তাঁদের মনোভাব জানার চেষ্টা করছেন লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি ইতিমধ্যে এ বিষয়ে দলের উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকার একদিকে নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে এবং দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ দিয়ে বাধা দিয়ে বিএনপিকে চাপের মধ্যে রেখেছে; অন্যদিকে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে খালেদা জিয়াকে নতুন নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে, জামিন দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। সরকারের এই কৌশলের বিপরীতে বিএনপি চাইছে আপাতত উত্তেজনা এড়িয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত যেতে। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে।

অবশ্য আওয়ামী লীগের নেতা মুহাম্মদ ফারুক খান প্রথম আলোকে বলেন, যুদ্ধ, প্রেম ও নির্বাচন—এই তিনটিতে কেউ হারতে চায় না। তাই এগুলো সব সময় বাঁধাধরা নিয়ম মেনে হয় না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ প্রথাগতভাবেই নির্বাচনী প্রস্তুত নিচ্ছে। আর বিএনপির প্রস্তুতি ও কৌশল ভিন্ন রকম। তারা খালেদা জিয়ার কারাবাসের বিষয়টি সামনে এনে মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, এটা কোনো সহানুভূতির বিষয় নয়। বিরোধী দলের প্রধান নেত্রীকে জেলে দেওয়া হয়েছে জনগণের ভোটাধিকার, তাদের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকারের জায়গা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। সেখানে নির্বাচনের আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।

বিএনপির নেতারা বলে আসছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ নেই। সরকার বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে হয়রানি করে যাচ্ছে। অপর দিকে প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতারা সরকারি খরচে আগাম নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগও করা হয়েছে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বর্তমান পরিস্থিতিকে কিছুটা ঘোলাটে মনে করছেন। তিনি গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিস্থিতি একেক সময় একেক দিকে ডাইভার্ট হচ্ছে। তলে তলে কী হচ্ছে আমরা এখনো জানি না। সমঝোতার কথাও শোনা যাচ্ছে। রোজার পর বুঝতে পারব। তবে বিএনপি যে নির্বাচনের জন্য তৈরি হচ্ছে, এটাও দৃশ্যমান।’
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতারা বলছেন, তাঁদের এখন মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার কারামুক্তি। এ লক্ষ্যে ‘শান্তিপূর্ণ’ কর্মসূচিতে থেকে দলীয় ঐক্য ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। দলীয় প্রধানের কারামুক্তির কর্মসূচির ভেতরেই তাঁরা জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি দেখছেন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশনেত্রীকে কারাগারে রেখে যারা জাতীয় নির্বাচনের কথা ভাববে, তারা অলীক স্বপ্নে বসবাস করবে। দেশনেত্রীকে অবশ্যই মুক্তি দিতে হবে। মুক্ত নেত্রীকে নিয়েই আমরা নির্বাচনে যাব।’

তবে বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, বিএনপির চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সরকারের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে না পারায় দলের নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ আছে। তারা শক্ত কর্মসূচির পক্ষে। দলের নীতিনির্ধারকেরা নির্বাচন নিয়ে সরকারের আচরণ আরও কিছুদিন দেখে তারপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা বা বিএনপির অবস্থান নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আগামী জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত দেখতে চাই।’ তিনি বলেন, সবারই প্রত্যাশা সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। যেটি ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না।

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইখ দিন এবং  শেয়ার করুন।