অ্যাডভান্স ডেভেলপমেন্টের প্রতারণা, সরকারের সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার সম্পত্তি বেহাত

নিজস্ব প্রতিবেদক : অ্যাডভান্স ডেভেলপমেন্ট টেকনোলজি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার এসএম আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে রাজধানীর বেইলী রোড এলাকার প্রায় সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় দুই একর জমি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ওই জমির প্রকৃত মালিক সপরিবারে ভারতে চলে গেছেন। আইন অনুযায়ী জমিটি হস্তান্তরও করা হয়নি। এই জমি তাই খাস হিসেবে ঘোষণার প্রক্রিয়া চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই জমির দাবি ছেড়ে দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালে এই সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি করার অনুমোদন দিয়ে দেয় মন্ত্রণালয়।

২০০২ সালে ইলিয়াস গং পূর্বের (১৯৫০ সালের) পাওয়ার অব অ্যাটর্নি মূলে ও তর্কিত রেকর্ড সূত্রে অ্যাডভান্স ডেভেলপমেন্ট টেকনোলজি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার এসএম আনোয়ার হোসেনকে অ্যাটর্নি নিয়োগ করেন। এই ক্ষমতাবলে ইঞ্জিনিয়ার এসএম আনোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ ইলিয়াস, মোহাম্মদ সাইদ, মোহাম্মদ সালেহীন, হামিদা খাতুন ও জোহরা খাতুন মিলে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে পেছনের তারিখ ব্যবহার করে ভূয়া আম-মোক্তারনামা তৈরি করে এই সম্পদ আত্মসাত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ইঞ্জিনিয়ার এসএম আনোয়ার হোসেন ওই জমির ওপর ১৬ ও ১৪ তলাবিশিষ্ট দুটি বহুতল ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রি করেন। এ দুটি ভবনে মোট ২৩২টি ফ্ল্যাট রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিতর্কিত এই সম্পত্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে অনেক প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তার কাছে কম দামে ফ্ল্যাট বিক্রি করেন ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ার হোসেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বেইলি রোডের গার্লস হাইস্কুলের পাশের এই জমি নিয়ে ২০১০ সাল থেকে জটিলতা চলছিল। ওই সময় সাবেক ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরার নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সেই কমিটির রিপোর্ট ছাড়াই ২০১৪ সালে মন্ত্রণালয় এমন সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ কিংবা প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী কারও মতামত নেয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী মৌজায় ১/১ নিউ বেইলি রোডে ১ একর ৭৪ শতক জমি রয়েছে। নথির বিবরণ অনুযায়ী সিএস রেকর্ডে এই জমির মালিক ছিলেন বাহাদুর গোয়ালা ও মদন গোয়ালা। কিন্তু পরে বীর বল্লভ পাল নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা গ্রহণ করেন হাজী হাফেজ মো. ইউসুফ নামে এক ব্যক্তি। বলা হয়, পঞ্চাশের দশকে কথিত বীর বল্লভ পাল সপরিবারে কলকাতা চলে যান। যাওয়ার প্রাক্কালে এই সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য ১৯৫০ সালে হাজী হাফেজ মো. ইউসুফকে ৫ বছরের জন্য আমমোক্তার নিয়োগ করেন। কিন্তু পাওয়ার অব অ্যাটর্নি মূলে তিনি ওই জমি কখনও বিক্রি বা হস্তান্তর করেননি। এসএ রেকর্ডের সময় তিনি এই জমি নিজের নামে রেকর্ড করে নেন। সে মোতাবেক পরবর্তীকালে আরএস রেকর্ডে তার নামে এবং সিটি জরিপে তার ওয়ারিশ ইলিয়াস গং নিজেদের নামে রেকর্ড করে নেয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যার (বীর বল্লভ পাল) কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেয়া হয়েছে তার মালিকানার সপক্ষে কোনো দলিল বা রেকর্ড নেই।

২০১০ সালের ১৯ মে সিদ্ধেশ্বরী এলাকার জনৈক বাসিন্দা এবিএম এসকেন্দার আলী জমিটি সরকারি সম্পত্তি দাবি করে বিষয়টি তদন্তের জন্য তৎকালীন ভূমিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভূমি সচিবকে লিখিত নির্দেশনা দেন। এরপর উপসচিব আবদুর রউফকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি যখন তদন্ত শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসে তখন কমিটির প্রধানকে ওএসডি করে দেয়া হয়। এরপর রহস্যজনক কারণে ওই কমিটির কোনো কার্যক্রম আর এগোয়নি।

এ বিষয়ে ২০১৪ সালের ১৯ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক যুগান্তর। ওই প্রতিবেদনে তদন্ত কমিটির প্রধান তৎকালীন উপসচিব আবদুর রউফ বলেন, পুরো বিষয়টি ছিল জালিয়াতিতে ভরা। ওই সময় তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে ইলিয়াস গং ও ডেভেলপার কোম্পানির কাছে তিনটি নোটিশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা জবাব দেয়নি। তারা প্রথমে দাবি করেছিল, ভায়া দলিলের মাধ্যমে হাফেজ ইউসুফের নামে এসএ রেকর্ড হয়েছে। কিন্তু কমিটির কাছে কোনো দলিল জমা দিতে পারেনি। ওই সময় দখলকারীদের পক্ষে তদন্ত রিপোর্ট দেয়ার জন্য অনেক বড় বড় স্থান থেকে তাকে চাপ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সরকারি স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে কারও তদবির আমলে নিতে চাননি। তিনি জানান, এক পর্যায়ে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিলে তাকে ওএসডি করে দেয়া হয়। এই কর্মকর্তা জানান, আলোচ্য জমিটি শতভাগ সরকারি। কেউ খাজনা আদায়ের সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকলে তা আইনবহির্ভূত হবে।

উপসচিবকে ওএসডি করার পর ঢাকা জেলার এডিসি (রাজস্ব) আবুল ফজল মীরের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এই কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এই প্রতিবেদনেও বলা হয়, হাজী হাফেজ মোহাম্মদ ইউসুফ পাওয়ার অব অ্যাটর্নিমূলে জমি হস্তান্তর করেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো পর্যবেক্ষণ কিংবা সুপারিশ করা হয়নি। প্রতিবেদনটি পাওয়ার পর এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথির ৯ নম্বর পৃষ্ঠায় উপসচিব মো. আতাহার হোসেন একটি নোট লেখেন। এতে বলা হয়, ‘তদন্ত প্রতিবেদন ও কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, নালিশি সম্পত্তিতে হাজী ইউসুফের মালিকানা হস্তান্তরিত হয়নি। শুধু অনিয়মিতভাবে রেকর্ড হয়েছে। ওই মালিকানার বিভিন্ন রেকর্ডের কারণে আরএস ও সিটি জরিপ নামজারি হয়েছে। পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, ওই সম্পত্তিতে ভুল রেকর্ডের কারণে ইউসুফের নামে রেকর্ড হয়েছে। তাই সিএস রেকর্ডের প্রকৃত মালিক না থাকলে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের (এসএ অ্যান্ড টি) ৯২ (ক) ধারা অনুসারে এই সম্পত্তিতে সরকারের স্বার্থ জড়িত। এ বিষয়ে এই ধারা অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে।’ প্রসঙ্গত এই ধারায় বলা আছে, কোনো সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত না হলে তা সরকারি খাস জমি হিসেবে বিবেচিত হবে।

পরবর্তীকালে ১০ এপ্রিল নথির ১০ নম্বর পৃষ্ঠায় মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা লেখেন, ‘২৩২টি ফ্ল্যাটের অনেক মালিক আমাদের সহকর্মী। যাদের মধ্যে প্রাক্তন সচিবও রয়েছেন। তারা নামজারি ও খাজনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়ার জন্য এ মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘোরাঘুরি করছেন। অর্থাৎ এখানে অহেতুক ফ্ল্যাট গ্রহীতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।’

এই পৃষ্ঠায় অপর এক স্থানে তিনি লেখেন, ‘বীর বল্লভ ভারতে চলে যাওয়ার পর হাফেজ ইউসুফ এই বাড়ির ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। কিন্তু তিনি জীবদ্দশায় এটি কাউকে হস্তান্তর করেছেন তার কোনো প্রমাণ নেই। জিপিএ মূলে হাফেজ ইউসুফ এই জমির মালিকানা অর্জন করেননি, বিধায় তাদের অনুকূলে এসএ, আরএস ও ডিসিএস রেকর্ড শুদ্ধ হয়নি। পাশাপাশি বীর বল্লভের স্বত্ব তাদের ওপরও বর্তায়নি। তাই স্বত্ব বীর বল্লভের রয়ে গেছে। এমতাবস্থায় অ্যাডভান্স ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, হাফেজ ইউসুফের বা বীর বল্লভের উত্তরাধিকারীদের কাছে এই জমি হস্তান্তরের দলিল থাকলে উপস্থাপনের জন্য বলা হোক। কোনো দলিল দেখাতে না পারলে বীর বল্লভের প্রকৃত ওয়ারিশদের হাজির করতে বলা হোক। এ দুটিতে ব্যর্থ হলে জমি এসএ অ্যান্ড টি অ্যাক্টের ৯২(ক) ধারা মতে খাস করতে হবে।’

মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে হস্তান্তর দলিল কিংবা বীর বল্লভের প্রকৃত উত্তরসূরিদের হাজির করতে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের চাহিদা মোতাবেক কিছুই পাওয়া যায়নি। বিষয়টি উল্লেখ করে পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য ৪ মে শাখা থেকে ফাইলটি ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এবার অবস্থান পাল্টে ফেলেন ওই কর্মকর্তা। ১০ জুলাই তিনি এ বিষয়ে তার মতামতে লেখেন, ‘বিবেচ্য বিষয়ে কমপ্লেক্সের অ্যালটি আবদুস সাত্তার ও আশীষ পাল (উভয়ে অবসরপ্রাপ্ত সচিব) আমাকে পুরো বিষয়টি অবহিত করেন। তারা জানান, এই হোল্ডিং নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি সিন্ডিকেট এই সমস্যাটি তৈরি করেছেন। তারা জানান, এই বিশাল কমপ্লেক্স নির্মাণের শুরুতে চক্রটি অ্যাডভান্স ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের কাছে ৫ কোটি টাকা চেয়েছিল। সেটি না দেয়ায় এ হয়রানির উদ্ভব।’

সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে ২০ আগস্ট পাঠানো নথির ১৫ পৃষ্ঠায় ৫৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘সার্বিক বিবেচনায় যেহেতু অ্যাটর্নি কর্তৃক বর্ণিত সম্পত্তি হস্তান্তর হয়নি সেহেতু এসএ, আরএস এবং সিটি জরিপ শুদ্ধভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি মর্মে প্রতীয়মান হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা জেলার রমনা থানাধীন সিদ্ধেশ্বরী মৌজায় ১নং নিউ বেইলি রোডের সমুদয় সম্পত্তি এসএ অ্যান্ড টি অ্যাক্ট ১৯৫০-এর ৯২ ধারামতে সরকারের দখলে এবং শুদ্ধভাবে রেকর্ড সংশোধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক ঢাকাকে পত্র দেয়া যায়।’
এই প্রস্তাব দিয়ে নথি উত্থাপন করার পর পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে থাকে। ১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় এই জমির বিষয়ে সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী নামজারি ও খাজনা আদায় অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত দেয়। সাফ জানিয়ে দেয়, এই জমিতে সরকারের কোনো স্বার্থ ও স্বত্ব কোনটিই নেই।

এরপর এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকার ডিসিকে চিঠি দিয়ে সংশ্লিষ্ট জমির নামজারি ও খাজনা আদায় অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এমনকি চিঠিটি বিশেষ বাহক মারফত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

এই জমি নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে জনস্বার্থে দায়ের করা একটি রীট মামলা রোববার রায়ের জন্য ধার্য রয়েছে।

(টুডে সংবাদ/তমাল)
প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com