থ্যাচারের ছক নিয়ে স্বর্ণমন্দিরে হামলা করেছিলেন ইন্দিরা?

কুলদীপ নায়ার : ভারতের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে চালানো ‘অপারেশন ব্লু স্টার’-সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাগজপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি শিখ সম্প্রদায় যে দাবি তুলেছে, ব্রিটিশ সরকার তা নাকচ করে দিয়েছে। ১৯৮৪ সালের ১ থেকে ৮ জুন স্বর্ণমন্দিরের হারমন্দির সাহেব কমপ্লেক্স থেকে ধর্মীয় জঙ্গিনেতা জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে ও তাঁর অনুসারীদের উৎখাত করতে এক রক্তক্ষয়ী সেনা অভিযান চালানো হয়েছিল। খবর পাওয়া যাচ্ছে, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে এই অভিযান পরিকল্পনায় তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার সহায়তা করেছিলেন।

এখন জানা যাচ্ছে, ওই সময় একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্বর্ণমন্দির রেকি করেছিলেন এবং তিনিই ভারতীয় সেনাবাহিনীকে স্বর্ণমন্দিরের গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কায়দা-কানুন বাতলে দিয়েছিলেন। এখন বোঝা যাচ্ছে, সেখানে এভাবে সামরিক অভিযানের কোনো দরকার ছিল না এবং অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করেও ‘আকাল তখত্’ থেকে ভিন্দ্রানওয়ালেকে উৎখাত করা যেত।

তবে ৩৪ বছর পরও ভারতের জনগণ জানতে পারেনি, ঠিক কোন কারণে সেখানে এমন রক্তক্ষয়ী অভিযান চালানো হয়েছিল। এটা সত্যি যে ভিন্দ্রানওয়ালে ‘আকাল তখত্’সহ পুরো স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সকে ঘিরে ফেলে সেটিকে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেকে তিনি শিখ সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র অধিপতি ঘোষণা করেছিলেন এবং গোটা সম্প্রদায় তাঁর আদেশে চলত। সেখানে অভিযান শুরুর একপর্যায়ে সেনাবাহিনী ট্যাংক ব্যবহার করে। আমার মনে আছে, সেনাবাহিনীর প্রথম দলটি পরিকল্পিত অভিযান শুরু করার পর মধ্যরাতে ইন্দিরা গান্ধীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা হয়েছিল। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল পাল্টাপাল্টি গোলাগুলি হচ্ছিল।

এমনকি এখনো হারমন্দির সাহেবের দেয়ালে গুলির চিহ্ন দেখা যায়। শিখ সম্প্রদায় স্বর্ণমন্দিরকে তাদের ‘ভ্যাটিকান’ মনে করে। ফলে এখানে অভিযান পরিচালনা তাদের আহত করে। ব্রিটিশ সরকারের হাতে থাকা তথ্য প্রকাশ না করার কারণে এটা বোঝা শক্ত যে কেন বিকল্প কোনো উদ্যোগ না নিয়ে প্রথমেই হারমন্দির সাহেবে সেনা অভিযান চালানো হয়েছিল।

এই সেনা অভিযানের পর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিখরা ব্যাপক বিক্ষোভ করে এবং এর কিছুদিন পর ভারতে শিখদের ওপর হামলার ঘটনায় তাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এ ঘটনার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে থাকা বহু শিখ বিদ্রোহ করেন। সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তার পদ থেকে বহু শিখ পদত্যাগ করেন। এর প্রতিবাদে অনেক শিখ সরকারের কাছ থেকে পাওয়া পুরস্কার ও সম্মাননা ফিরিয়ে দিয়েছেন।

শিখ সম্প্রদায় যে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটি শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন। ভুবনেশ্বরে এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, তাঁর মনে হচ্ছে তাঁকে হত্যা করা হবে। এর চার মাসের মাথায় নিজের শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে তিনি মারা যান। প্রতিশোধ হিসেবেই তাঁকে হত্যা করা হয় বলে মনে করা হয়। এখানেই ঘটনা থেমে থাকেনি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইন্দিরা হত্যার পর শিখবিরোধী দাঙ্গায় শুধু দিল্লিতেই তিন হাজারের বেশি শিখ নাগরিককে হত্যা করা হয়।

একটি পাঞ্জাবি গ্রুপ স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান চালানোর বিষয়ে তদন্ত করতে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, এয়ার মার্শাল অর্জুন সিং এবং ইন্দর গুজরালের (যিনি পরে প্রধানমন্ত্রী হন) নেতৃত্বে একটি কমিটি করেছিল। আমি সেই কমিটির একটি অংশে ছিলাম। আমাদের তদন্ত প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম, স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের দরকার ছিল না এবং অন্য কোনোভাবেও ভিন্দ্রানওয়ালেকে সামাল দেওয়া যেত। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন পি ভি নরসিমা রাও।

আমরা সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে খোঁজখবর করতে গেলে তিনি আমাদের বিষয়ে সন্দিগ্ধ হয়ে পড়েন। সরকারের লোকজন ছাড়া ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরাসহ বাকি সবাই আমাদের বলেছিলেন, সরকার স্পষ্টতই বাড়াবাড়ি করেছিল।

ইন্দিরা হত্যার পর দিল্লিতে বেধে যাওয়া দাঙ্গা সহজেই দমন করা যেত। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ইচ্ছা করে পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনীকে সেখানে হস্তক্ষেপ করতে দেননি। তিনি ওই দাঙ্গাকে মানুষের ‘স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া’ আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, বিশাল বৃক্ষ মাটিতে পড়লে ভূমি কেঁপে উঠতে বাধ্য।

স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের তিন দশক পর প্রকাশ করা ব্রিটিশ নথিপত্র থেকে এখন জানা যাচ্ছে, যুক্তরাজ্য সরকার শিখদের উপাসনালয়ে অভিযান চালাতে ভারতকে পরামর্শ দিয়েছিল। নতুন এই তথ্য লন্ডন ও দিল্লিতে রাজনৈতিক ঝড় তুলেছে। ব্রিটেন সরকার এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এবং বিজেপি এর ব্যাখ্যা দাবি করেছে।

তবে পাঞ্জাবে উগ্রপন্থী শিখদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এবং অপারেশন ব্লু স্টারে অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তারা কোনো ব্রিটিশ পরিকল্পনার সহায়তা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, তাঁদের জানামতে, এই অভিযান ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা ও পরিচালনায় হয়েছে। এখানে ব্রিটিশদের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, দেশটির জাতীয় মহাফেজখানা থেকে ৩০ বছর পর গোপন নথি প্রকাশ করা হয়। সম্প্রতি প্রকাশ করা ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির একটি নথির শিরোনাম ‘শিখ সম্প্রদায়’। ওই নথিতে দেখা গেছে, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একজন একান্ত সচিবকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে বলা হয়, ‘অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির থেকে উগ্রপন্থী শিখদের উৎখাত করতে সম্প্রতি ভারত সরকার ব্রিটিশ সরকারের পরামর্শ চেয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে একজন এসএএস অফিসার ইতিমধ্যে ভারত পরিদর্শন করেছেন এবং একটি পরিকল্পনা জমা দিয়েছেন, যেটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী অনুমোদনও করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, ভারত খুব শিগগির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।’

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, যদি ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পনা সরবরাহের কথা ফাঁস হয়, তাহলে ব্রিটেনে বসবাসরত ভারতীয়দের মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে। তবে শেষ পর্যন্ত বি৶টিশদের সরবরাহ করা পরিকল্পনা মাফিকই স্বর্ণমন্দির অভিযান হয়েছিল কি না, সেটি নিশ্চিত করার মতো আর কোনো নথিপত্র এখনো পাওয়া যায়নি।

আমি মনে করি, অপারেশন ব্লু স্টার-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় নথিপত্র প্রকাশ করা উচিত। কারণ, যতই দিন যাচ্ছে, ততই জনমনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে ওই অভিযান চালানো ঠিক হয়নি।

ইংরেজি থেকে অনূদিত।

কুলদীপ নায়ার ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

(টুডে সংবাদ/তমাল)
প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com