বেসিক ব্যাংক-হলমার্ক, নীরব এক ব্যাংক ডাকাতি

শাকিলা হক : বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক কেলেঙ্কারির সুবাদে ব্যাংক জালিয়াতির অনেক বিষয়ই এখন বাংলাদেশের মানুষের জানা। এসব দুর্নীতির তদন্তে ঢিলেঢালা গতি থাকলেও দুর্নীতি দমন কমিশন বা আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের। তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেল ভারতের নীরব মোদির ব্যাংক ডাকাতি। ব্যাংকে ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা তুলে নিয়েছেন হাজার হাজার কোটি রুপি। এখন দেশ থেকে পালিয়ে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন গোয়েন্দা সংস্থাকেও।

চলতি বছরের শুরুতে ২৮০ কোটি রুপি জালিয়াতিতে একজন হীরা ব্যবসায়ীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রথম সন্দেহে আসে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের (পিএনবি)। নীরব মোদি নামের ওই হীরা ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানের হীরার গয়নার দারুণ সুনাম রয়েছে বিশ্বজুড়েই। শুধু বলিউডের তারকারাই নন, হলিউড, এমনকি অনেক দেশের রাজপরিবারের সদস্যরাও পরছেন এই গয়না।

এমন এক স্বনামধন্য ব্যক্তি কি ডাকাতি করতে পারেন? অবিশ্বাস্য মনে হলেও তা সত্যি। এবার শুনুন সেই ডাকাতির গল্প।

গল্পটা শুরু হয়েছে হীরা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। হীরা ব্যবসার জন্য সুনাম রয়েছে ভারতের গুজরাটের। আর এই গুজরাটের মানুষ হলেন ৪৭ বছরের নীরব মোদি। হীরাসহ বিভিন্ন জুয়েলারির ব্যবসা তাঁর। ফোর্বস সাময়িকীর তালিকায় ২০১৬ সালে ভারতের অন্যতম ধনকুবের ছিলেন এই নীরব মোদি। পরের বছর ধনকুবেরদের বিশ্ব তালিকায় তাঁর স্থান হয় ১ হাজার ২৩৪তমতে।

নীরব মোদি মূলত খনি থেকে তোলা কাঁচা হীরা আমদানি করেন। দক্ষিণ আফ্রিকা, হংকংসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আনতেন ওই হীরা। ভারতে হীরা কাটা ও নকশা করায় খরচ অনেক কম পড়ে। আর এই ব্যবসাকে কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে ব্যাংক ডাকাতির এক অভিনব পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন নীরব মোদি।

নীরব মোদি, তাঁর স্ত্রী অ্যামি নীরব মোদি, ভাই নিশাল মোদি ও আত্মীয় মেহুল চোকসি পরিচালনা করেন গীতাঞ্জলি জেমসের ডায়মন্ড আর ইউএস, সোলার এক্সপোর্ট ও স্টেলার ডায়মন্ড নামের তিনটি কোম্পানি। প্রথমে তাঁরা হীরা ও মুক্তা আমদানির কথা বলে ভারতের সরকারি ব্যাংকের বিদেশি শাখা থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। কোম্পানির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক পিএনবির কাছে লেটারস অব আন্ডারটেকিং (এলওইউ) ইস্যু করার আবেদন জানান। অর্থাৎ হীরা ও মুক্তা আমদানির জন্য পিএনবির বিদেশের শাখা থেকে ঋণ চান তাঁরা। বিদেশের শাখা থেকে ঋণ নেওয়ার প্রধান কারণ ছিল দুটো। একটি হলো ভারতের শাখা থেকে ঋণ নিলে যে ১০ শতাংশ হারে সুদ দিতে হয়, বিদেশের ক্ষেত্রে তা সাড়ে ৩ শতাংশ। দ্বিতীয় কারণ বা প্রধান কারণ হলো বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশেই পরিশোধ করা, এতে দেশে কোনো প্রমাণ থাকছে না। এলওইউ সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে ইস্যু করা হয়। এর মানে হলো, যে ব্যাংক এটি ইস্যু করছে (পিএনবি), গ্রাহক যদি ঋণখেলাপি হন, তাহলে ইস্যুকারী ব্যাংকই পুরো অর্থ দিতে বাধ্য।

এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য এমনটা করা তো ব্যবসায়িক পন্থা হিসেবেই ধরা যায়। এরপরই শুরু হয় আসল খেলা। নীরব মোদি ও তাঁর আত্মীয়রা ঋণ ইস্যুর বিষয়টি সহজ করতে হাত করেন পিএনবির দুই কর্মকর্তাকে। গল্পে প্রবেশ করেন পিএনবির কর্মকর্তা গোকুলনাথ শেঠি ও মনোজ হুনুমন্ত খারাত। তাঁরা এলওইউ ইস্যু করেন প্রয়োজনীয় অফিশিয়াল রেকর্ড ছাড়া ও ভুয়া জামিনদার দেখিয়ে।

নীরব মোদিদের আবেদনের ভিত্তিতে বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেন প্রতিষ্ঠান সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে বিদেশে ভারতীয় ব্যাংকের ৩০টি শাখায় গ্রাহকের জন্য ঋণের আবেদন করে পিএনবি। গোকুলনাথ শেঠি ম্যানুয়াল পাসওয়ার্ড দিয়ে সুইফট সিস্টেমে লগইন করেন। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার সঙ্গে এই সুইফট সিস্টেমের কোনো যোগাযোগ ছিল না। তাই ম্যানুয়াল পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করে তিনি ও তাঁর সহকারী মিলে সুইফট সিস্টেমে ঢুকে প্রচুর পরিমাণে ভুয়া গ্যারান্টি ইস্যু করেন। সুইফটের সংকেত পাওয়ার পর বিদেশের ৩০টি ব্যাংক থেকে টাকা চলে যায় পিএনবির বিশেষ অ্যাকাউন্টে।

পিএনবি ওই অর্থ নীরব ও তাঁর কোম্পানিকে দিয়ে দেয়। তাঁরা ওই অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করেন। এরপর আবার ঋণ নিতে এলওইউয়ের আবেদন করেন নীরব মোদি। গোকুলনাথ শেঠি ও মনোজ খারাতের সহযোগিতায় আবার ঋণ পান। ঋণের অর্থের কিছু অংশ দিয়ে পুরোনো ঋণের সুদ শোধ করা হয়। বাকিটা থেকে যায় নীরবের পকেটে।

একদম সহজভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা যায়। ধরা যাক, নীরব মোদি প্রথম বছর ব্যাংক থেকে ১০০ টাকা ধার নিলেন, জানালেন পরের বছর সেই টাকা সুদসমেত মিটিয়ে দেবেন। এবার পরের বছর আবার ব্যাংক থেকে ২০০ টাকা ধার নিলেন এবং সেই টাকা থেকে গত বছরের ১০০ টাকা মিটিয়ে দিলেন। পরের বছর ফের ৪০০ টাকা ধার নিলেন এবং আগের বছরের ২০০ টাকা সুদ পরিশোধ করলেন। এভাবে প্রতিবছরই মোটা অর্থ ফাঁকি দিতে দিতে ঋণের পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন নীরব মোদি। এখানে অভিনব বিষয়টি হলো নীরব মোদি পুরো অর্থ সরিয়েছেন ভারতের সরকারি ব্যাংকের বিদেশের শাখা থেকে। অর্থাৎ, বিদেশ থেকে বিদেশেই পাচার হয়ে যায় বিপুল অর্থ।

২০১১ সাল থেকে এই জালিয়াতি শুরু হলেও তা ধরা পড়তে লাগে সাত বছর। চলতি বছরে বিদেশের শাখা থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে পিএনবিতে কড়াকড়ি আরোপ কড়া হয়। মোদির কোম্পানি যখন আবার নতুন এলওইউর আবেদন করে, তখন তাঁদের কাছে পুরোনো কাগজপত্র চাওয়া হয়। আর এতেই বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। এরপর তদন্তে ভারতীয় গোয়েন্দারা ঝাঁপিয়ে পড়েন। তবে তত দিনে পাখি উড়ে গেছে নীরবে।

(টুডে সংবাদ/তমাল)
প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com