কবিতাকে উপজীব্য করে পথের কবি আব্দুর রহিম

নজরুল ইসলাম তোফা : এই জগৎ সংসারে কষ্ট পাওয়ার জন্যে তো আর কখনোই মানুষ জন্ম গ্রহণ করে না। হয়তো নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে বহুত কষ্ট আপনা আপনি চলে আসে তাদের জীবন সংগ্রামে।হাজারও কষ্টের মাঝে অগণিত মানুষ তাদের প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও স্নেহের সহিত যতসামান্য আর্থিক সাহায্য প্রদান করে। তাদেরকে ভালোবাসা না দিলে যে, শিকড় সংস্কৃতিকেও আঘাত করা হয়। কারণ, তাঁরা দারিদ্র্যতার মাঝেও সাধারণ মানুষকে খুব সহজেই অতীতের অনেক বিলুপ্ত হওয়া শিকড় সংস্কৃতিকে তোলে ধরেন। পেটের দায়েই হয়তো বা এমন বিলুপ্ত সংস্কৃতিকে জনগণের কাছে পৌঁছায়।

এমন ধারার মানুষও সামাজিক দায়বদ্ধতায় অনেক প্রয়োজন বৈকি। তাদের সৃজনশীল বিকাশের ওপর অনেক কথাই বলা যায় কিন্তু সেদিকে যেতে চাইনা। বলতে চাই, তাঁরা যেটুকু অর্থ উপার্জন করে তাতেই কোনও ভাবে বেঁচে থাকে। অবশ্যই তাঁরা আর দশ জনের মতো সুুুুখী হওয়া আশায় কঠিন এই কষ্টের পথ বেছে নিয়েছে। এমন এই সংগ্রামে কুচক্রীদের জাতা কলেও পড়তে হয়েছে বারংবার।

তাদের ঠিক মোক্ষম সময়েই কেড়ে নেওয়া হয় বসত বাড়ির যত সামান্য ভিটাটুকু, তবুও যেন থেমে থাকার মানুষ নন তাঁরা। আজ অবধি এমনই ধারার এক গুনী ব্যক্তি অগণিত মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা এবং আর্থিক সাহায্য, সহযোগিতা পেয়ে যাচ্ছেন। তাকে নিয়েই নজরুল ইসলাম তোফা মনে করেন, তিনিই একজন পথের কবি, চারণ কবি হওয়ার যোগ্য। এই মানুষটি ভালবাসার পরশ বিলিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন-এগাঁ থেকে সেগাঁয়ে পুরনো এক ভাঙ্গা বাই সাইকেল চালিয়ে। পুরো জীবনটাই কেটেছে পথে মাঝে। তাঁর স্বরচিত কবিতা ও নিজস্ব সুরে গাওয়ার অপূূূর্ব ভঙ্গি সত্যিই এক নান্দনিকতায় ভরপুর। কোনো প্রকারের দ্বিধাবোধ সৃষ্টি না করেই গ্রামাঞ্চলের জনপদে এমন চারণ কবি, কবিতা ভান্ডার নিয়ে মানুষকে পুলকিত করছে। তাঁকে তালিকায় না আনলে যেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশে একটু অপূর্ণই রয়ে যাবে। এমন ধারায় যিনি জনপ্রিয় কবি, সবার ভালোবাসার প্রিয় ব্যক্তি, কবি আব্দুর রহিম।

জানা দরকার, পথে ঘাটের চারপাশ জুড়ে মানুষের জটলা পাকিয়ে গানের আসর যেন আর দেখা যায় না বলেই চলে। কিন্তু এখনো এমন ধারার এই চারণ কবির অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ দেখতে পাচ্ছে। নিরুপায় হয়েই হয়তো এমন সংস্কৃতির ধারাবাহিক রূপ চোখে পড়ছে বলা যায়। মনের আনন্দে চালিয়ে যাচ্ছেন সুরেলা কণ্ঠে কবি গান।

ছোট বেলার এমন প্রতিভা নিয়েই যৌবন কাল পর্যন্ত মানুষকে খুব বিনোদন দিয়েছেন। কিন্তু এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেন হাপিয়ে উঠেছেন।দেখা যায় যে, সব বয়সের লোকজন রয়েছে তাকে ঘিরে। মাঝখানে মাঝবয়সী এই চারণ কবি আব্দুর রহিম। হাতে খঞ্জনি আর মুখে সুর বাহ! কি অপূর্ব না দেখলে তাকে মূল্যায়ন করা দুরূহ। পরনে আধছেঁড়া প্যান্ট আর গায়ে পুরাতন ছেঁড়া শার্ট। মূলত তাঁকে ঘিরেই লোকজনের সমাগম। আপন মনে সুর আর ছন্দে নেচে নেচে গাইছেন। গভীর মনোযোগ দিয়েই তাঁর কথা শুনছে আর উপভোগ করছে লোকজন।তিনি সত্যিই একজন জাদুকরী মানুষ, মানুষ ধরে রাখার কৌশল কবিতার কথা, সুর এবং গায়কী ঢং।

তিনি জানালেন, নিজেকে উপস্থাপন করেন যৌতুক বিরোধী, নির্যাতিত গণমানুষ, বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা চেতনা, ভূমিহীন জনতা, সামাজিক পরিবেশের নানা দিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও শ্রমজীবী মানুষদের চলমান দিনকাল সহ বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক কবিতা ছন্দবদ্ধতায় রচনা করে তাতে সুর দিয়ে পথে পথে নেচে গেয়ে মানুষকে তৃপ্তি দিতেন। তাই তো সকলেই তাঁকে যেন পল্লি কবি হিসেবে ভূষিত করেন।

তাঁর বাড়ি ছিল রাজশাহীর বাগমারার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম দ্বীপনগরে। তিনি শোনালেন তাঁর কবি হওয়ার কথা, শোনালেন বঞ্চিত হওয়ার কথা এবং শোষণের কথা। এভাবেই সারা জীবন কবিতা আর পুঁথি পাঠ করে চলে তাঁর সংসার এবং শেষ জীবনেও এ কর্মে থাকতে চান। শুধু যে সংসার চালানোর জন্যই এমন কাজ করেন, তা নয়। তবে মানুষকে আনন্দ দেওয়া, সমাজ পরিবর্তন করা, সামাজিক অসংগতি তুলে ধরা এবং লোকজনকে সচেতন করার জন্যই তিনি ঘুরে বেড়ান রাজশাহীর বিভিন্ন অঞ্চলে। এটাতেই যেন তাঁর আনন্দ আর দারিদ্রতায় পেশা হিসেবেই নিয়েছেন। বেশ কিছুক্ষণ গান দিয়েই ধরে রাখলেন মানুষকে।

যখন আসর ভেঙে গেল, তখন এগিয়ে গেলাম তাঁর কাছে। কিছু সময় চাইলাম। হেঁসে ফেললেন তিনি। বললেন, কেন সময় দেব না বলুন, কী জানতে চান বলেন। শুনতে জানতে চাইলাম কবি হওয়ার গল্প।নিজ সম্পর্কে কথা বলতে কোনো প্রকারের বাধা না দিয়ে আব্দুর রহিম জানালেন, প্রাতিষ্ঠানিক লেখা পড়া কিছুই জানা নেই। বিদ্যালয়ে গেলেও যেন তাঁর পড়ালেখা হয়নি। হয়তো বা দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছেন। খুব একটা মনে পড়ে না তাঁর। তবে তাঁর রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকুমার বড়ুয়ারের মতো কবিদের অনেক কবিতা তাঁর মনে রয়েছে। তিনি যে কোন ক্লাসে, এ গুলো পড়েছেন বলতে পারছেন না। নিজের আগ্রহেই গ্রামের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে ছুটে গিয়ে কিছু পড়েতেন ও লিখতে শিখেছেন। সুতরাং এখন তাঁর বাংলা পড়া লেখায় কোনও সমস্যা সৃষ্টি হয় না। বলতে গেলে এই লেখা পড়াই তাঁর জীবিকা অর্জনের সম্বল।

অল্প সময়েই তিনি পুঁথি পাঠ শুরু করেন এবং কণ্ঠ ভালো হওয়ায় তাঁর কাছে সবাই ছুটে আসেন পুঁথি পাঠ শোনার জন্য। নজরুল ইসলাম তোফাকে কবি আব্দুর রহিম জানালেন, জীবিকা নির্বাহের জন্যই করাত মিস্ত্রি হিসেবে কাজ শুরু করেন। গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন মানুষের কাজে এই পেশার জন্যেই যেতেন, আর রাতে বসতেন পুঁথি নিয়ে।

এভাবেই জানালেন, কবি হওয়ার গল্প। ১৯৯২ সালের কথা অনেক বড় করেই তুলে ধরলেন। তিনি সরকর থেকে ভূমিহীন হিসেবে খাস জমি পেয়ে ছিলেন। সেখানেই টিনের ছাপড়া করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাস করছিলেন। হঠাৎ রাতে তাঁর ঘর ভেঙে ফেলেন প্রভাবশালী চক্র। তাই তো উচ্ছেদ হলেন এবং নিরুপায় হয়ে নিদারুণ কষ্টে ছুটে যান প্রশাসনের দ্বারে। প্রতিপক্ষরা প্রভাবশালী হওয়ায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। সুতরাং বলাই যায় যে, গরিবদের প্রতিবাদী ভাষার গুরুত্ব এ সমাজ আর দিতেই চায় না। তাই প্রতিবাদ হিসেবে হাতে কলম আর খাতা তুলে নেন এই ‘মূর্খ’ মানুষটি। যা জানে বা বুঝে, তাকেই সম্বল করে সেই কুচক্রীর নির্যাতনের ঘটনা ছন্দে ছন্দে লিখে ফেলেন। গ্রামের লোকজন এবং প্রশাসনের কাছে তাঁর ছন্দে লেখা গীতি কবিতা পাঠ করে শোনাতে থাকেন। বলা যায়, সেই থেকেই তাঁর কবি হওয়া, আবার পর্বতীতে এই চারণ কবি আরও বহু উদ্দেশ্যে মূলক কবিতা লিখে মানুষকে শুনিয়েছেন। তাঁকে আর কখনও পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি। এখন তিনি রেডিওতেও এমন ধারার গান করে থাকেন। রেডিওতেও নাকি চারণ কবি হিসেবে পরিচিত পান।

এই চারণ কবি, আব্দুর রহিমের ভাষ্য মতেই বলি, প্রায় চারশোরও অধিক স্বরচিত কবিতা তাঁর এবং তা ছাপাখানায় পাঠালে সেখানে গিয়ে তাঁকে বুঝিয়ে দিতে হয়। কারণ, তাঁর সে লেখা তিনি ছাড়া কেউ পড়তে পারেন না। তখন নিজেকে বড় অসহায় মনে করেন বলে জানান।আব্দুর রহিম জানান, এই কবিতা লিখে আর পাঠ করে চলে তাঁর সংসার। এ ছাড়া পুঁথিও পাঠ করেন। গ্রামে কোনো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটলেই তিনি সুদক্ষ সাংবাদিকদের মতোই ছুটে যান ঘটনাস্থলে। পুরো ঘটনা সম্পর্কে তথ্য নিয়ে লিখে ফেলেন কবিতা। তা চটি বই আকারে প্রকাশ করেন এবং হাট বাজারে বিক্রি করেন, তবে তেমন অর্থ না থাকায় আর সেই ভাবে প্রকাশ করতে পারেন না।

তিনি এই কায়দায় বিভিন্ন জাতীয় দিবস, নারী নির্যাতন, স্যানিটেশন, বৃক্ষরোপণ, মাদকসহ বিভিন্ন জাতীয় ও সামাজিক সমস্যা, তার ক্ষতিকারক ও প্রতিকার নিয়ে কবিতা লিখে পাঠ করে রেডিওতে নাকি পুরস্কৃত হয়েছেন। তাঁর লেখনীর কারণে এলাকায় অনেক পরিবর্তনও হয়েছে, তবে এ জন্য তাঁকে কেউ উদ্বুদ্ধ করে না।তাঁর মতে জানা যায়, তাঁর কবিতা ও পুঁথিপাঠ নাকি সব শ্রেণীর লোকজন শোনেন। সমাজটাকে এমন ভাবেই তিনি পরিবর্তন করতে চান এবং নিজ দায়িত্ব বলেই তিনি মনে করেন।

জানা দরকার, তাঁর দখল হওয়া জমি বুঝে পাওয়ার জন্য প্রশাসনের দরজায় এখনও কড়া নাড়েন। এক গাদা কাগজ বের করেন এবং তাঁর নিজ বসত ভূমি বুঝে পাওয়ার আবেদন সহ বিভিন্ন কর্মকর্তা, ব্যক্তি, সাংসদ ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ তুলে ধরে বলেন, শেষ জীবনেও হয়তো ফিরে পাব না। সুতরাং এমন ফরিয়াদ কবিতার আসরেই তা অনেক কষ্টের ভাষায় ছন্দার তালে তুলে ধরেন।

এত কিছুর পরেও হতাশ নন আব্দুর রহিম। অধিকার ফিরে পাবেনই কিংবা তাঁর চাওয়া এ আন্দোলন সফল হবেই। তিনি বলেন, বিরূপ কর্মকান্ড, নেতিবাচক অশুদ্ধ চিন্তা-চেতনা, উগ্র স্বভাব, অনুভূতি ও মূল্যবোধের অনেক দিকে মানুষ চলে যাওয়ায় সমাজের ক্ষতি হচ্ছে।ভালো মানুষের সন্ধানেই জীবনের নানা অভিজ্ঞতা এবং পরিকল্পনা সহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে লিখেন।তাকে আবার সুর করে মানুষকে শুনিয়েও থাকেন।মানুষ শত বছর বাঁচবে না, মৃৃৃৃত্যু নিশ্চিত জেনে তাঁর সৃজনশীল কাজ গুলো উত্তরাধিকার সূত্রেই ভালো মানুষকে প্রদান করতে চান। এমন এ ভাবনা নিয়েই তিনি শিষ্য খোঁজেন সদা সর্বদা। তাঁর শেষ ইচ্ছা গণ মানুষ তাঁর কবি গান ও পুঁথি পাঠের ধারা অব্যাহত রাখেন এবং তাঁকে যেন স্মরণীয় করে রাখেন এটিই চাওয়া।

নজরুল ইসলাম তোফা, টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক।