নির্মাণ কাজ শেষ না করেই ঠিকাদার তুলে নিয়েছে কোটি টাকার বিল

মনোতোষ সরকার, গৌরনদী থেকে : খুলনার মেসার্স আমিন অ্যান্ড কোম্পানী লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বরিশালের গৌরনদীতে স্লুইস গেটের নির্মাণ কাজ শেষ না করে ১ কোটি ১০ লাখ টাকার বিল তুলে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিল তুলে নেয়ার পর ৭ বছর অতিবাহিত হলেও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। দীর্ঘদিন ধরে স্লুইসগেটের কাজ ফেলে রাখায় গৌরনদী ও কালকিনি উপজেলার অর্ধলক্ষাধিক কৃষককে বোরো চাষে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বোরো মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ২০১০-২০১১ অর্থ বছরে গৌরনদী উপজেলার বাকাই – দক্ষিণ মাগুরা চতলাপাড় খালের (বেবাইজ্জার খাল) বাকাই গ্রামে স্লুইসগেট নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। দরপত্রের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কার্যাদেশ পান মেসার্স আমিন অ্যান্ড কোম্পানী লিমিটেড নামের খুলনার একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বভার গ্রহণ করে বরিশালের আব্দুস সালাম বাদল, জামাল হোসেন ও বদরুল আলম কাজ শুরু করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশাল পাউবো’র এক কর্মকর্তা জানান, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ৪৫ থেকে ৫০ ভাগ নির্মাণ কাজ শেষ করে ২০১৩ সালে প্রথম চলতি বিল হিসেবে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা বিল উত্তোলণ করেন। পরবর্তীতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় চলতি বিল হিসেবে ২৬ লাখ টাকার বিল পাওয়ার আবেদন করেন। এখনও প্রকল্পটির ব্লক বসানো, মাটির কাজ, চ্যানেল কর্তন, এপ্রোচ সড়ক ও রডের কিছু কাজসহ ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার কাজ বাকি রয়েছে। অথচ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ১ কোটি ১০ লাখ টাকা বিল তুলে নিয়েছে এবং ২৬ লাখ টাকার বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রভাবশালীদের দিয়ে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় চলতি বিলের ২৬ লাখ টাকা নেয়ার পায়তারা করছে। গত ৭ বছর ধরে ঠিকাদার নির্মাণ কাজ না করে ফেলে রেখেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্লুইস গেটের কাঠামো নির্মাণ করে জলকপাট বসানো হয়েছে। লোহার জলকপাট বসানোর পরে দীর্ঘদিন তা পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে থাকায় মরিচা ধরে বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্লুইস গেটের দুই দিকের চারপাশে ব্লক বসানো কাজের কিছুই করা হয়নি। শুধুমাত্র উইং ওয়াল নির্মাণ করে ফেলে রাখা হয়েছে।
এলাকাবাসী জানায়, ঠিকাদার ৪৫ থেকে ৫০ ভাগ কাজ করে বিগত ৭ বছর ধরে লাপাত্তা। এ কাজ সম্পন্ন না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কৃষকদের দূর্ভোগের কথা জানিয়ে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে আবেদন করার পরেও তারা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপই গ্রহন করেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গৌরনদী ও কালকিনি উপজেলার সীমান্তবর্তী বাকাই স্লুইসগেট নির্মাণাধীন প্রকল্পটি এখন কৃষকের মরণফাঁদ। কাজ শেষ না করায় গত ৭ বছর ধরে তা সাধারণ কৃষকদের গলার কাঁটায় পরিনত হয়েছে। খালের মধ্যে বাঁধ দিয়ে স্লুইস গেট নির্মাণ কাজ করায় পানি চলাচল বন্ধ রয়েছে। যে কারণে বোরো মৌসুমে সেচ সংকটের কারণে বোরো আবাদি জমিতে পানি সরবারহে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া সাধারণ পথচারীসহ ১০ গ্রামের মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
কোটি টাকার বেশী বিল তুলে নেয়ার কথা স্বীকার করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী আব্দুস সালাম বাদল বলেন, আমরা যতটুকু কাজ করেছি ততটুকু বিল নিয়েছি। এলাকাবাসীর অসহযোগীতার কারণে সঠিকভাবে কাজটি শেষ করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের সহযোগীতা পেলে বাকি কাজ করা হবে বলে তিনি জানান।
গৌরনদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম সাধারণ কৃষকদের দূর্ভোগের কথা স্বীকার করে বলেন, স্লুইস গেটটির নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় কৃষকদের অপুরনীয় ক্ষতি হচ্ছে।
বিল প্রদানের কথা স্বীকার করে বরিশাল পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আবু সাঈদ বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের ঝামেলার কারণে কাজটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। ঠিকাদারকে কাজ শেষ করার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নির্মাণ কাজ শেষ করার পর বাকি বিল পরিশোধ করা হবে বলে নির্বাহী প্রকৌলশী আবু সাঈদ জানান।