খুচরা বিক্রেতা এখন পৃথিবীর এক নম্বর ধনী

  • আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জেফ বেজোস সবচেয়ে ধনী মানুষ
  • পণ্য বহুমুখীকরণ এবং বাজারে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা সংহত করার মধ্য দিয়ে আমাজন এ জায়গায় এসেছে।

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক : আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জেফ বেজোস শুধু এখনকার সবচেয়ে ধনী মানুষই নন, তিনি পৃথিবীর এযাবৎকালের সবচেয়ে ধনী মানুষও বটে। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১১২ বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ সম্পদ পৃথিবীতে কোনো কালে আর কারও ছিল না। এ মুহূর্তে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ কিংবদন্তি বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট ও মাইক্রোসফট করপোরেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সম্পদের চেয়ে বেশি। ফোর্বস ম্যাগাজিনের ২০১৮ সালের বৈশ্বিক বিলিয়নিয়ারদের তালিকায় বেজোস এখন শীর্ষে।

২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট খুচরা বিক্রির ৪ শতাংশ হয়েছে জেফ বেজোসের প্রতিষ্ঠিত আমাজন ডটকম ডট ইনকরপোরেশনের মাধ্যমে। আর দেশটিতে ডিজিটাল মাধ্যমে যত ব্যয় হয়েছে, তার ৪৪ শতাংশ হয়েছে আমাজনের মাধ্যমে। একদিকে ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়া সারা পৃথিবীতে মানুষের আচার-আচরণ বদলে দিচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ী উদ্যোগের ধরনও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের (আমাজন ওয়েব সার্ভিস) বদৌলতে বদলে যাচ্ছে-এই পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইন খুচরা বিক্রয়ের পুরোধা জেফ বেজোসের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বলই বলতে হয়। আমাজন শুরুর আগে বেজোস আর্থিক খাতে চাকরি করতেন। তিনি ‘সবকিছুর দোকান’ হিসেবে আমাজনের স্বপ্ন দেখতেন। এটি শুরুর আগে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে চাকরি ছাড়তে নিরুৎসাহিত করতেন।

প্রযুক্তি খাতের এই স্বপ্নদ্রষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক করেন। স্নাতক শেষ করার পর স্টার্টআপ কোম্পানি ফিটেলে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি ইনটেল ও বেল ল্যাবসের মতো কোম্পানির চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর তিনি সিনেটের প্রতিষ্ঠাতা হ্যালসে মাইনরের সঙ্গে ফ্যাক্সের মাধ্যমে সংবাদ সরবরাহের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদ্যোগ ব্যর্থ হলে তিনি ডি. ই শ নামের এক হেজ ফান্ডে যোগ দেন।

২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ হাজার ৩০০ শতাংশ বাড়ে। ইন্টারনেট ব্যবহারের এই চমকজাগানিয়া উল্লম্ফন দেখে তাঁর মাথায় আমাজন প্রতিষ্ঠার চিন্তা আসে। এরপর তিনি অনলাইনে বিক্রয়যোগ্য ২০টি পণ্যের তালিকা তৈরি করেন। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের এই প্রবৃদ্ধি না দেখলে তিনি হয়তো ওয়াল স্ট্রিটেই থেকে যেতেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে নিজের বাড়ির গ্যারেজে ১৯৯৫ সালের ১৬ জুলাই আমাজন প্রতিষ্ঠা করেন জেফ বেজোস। নিজের ১০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে স্ত্রী ও দুই প্রোগ্রামারকে সঙ্গে নিয়ে বেজোস আমাজনের কাজ শুরু করেন। পরিহাস হলো, পার্শ্ববর্তী বার্নার্স অ্যান্ড নোবেলের কার্যালয়ে আমাজনের প্রথম দিককার বৈঠকগুলো হতো। আমাজন ডটকম শুরুতে বই বিক্রির প্ল্যাটফর্ম ছিল। প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যে আমাজন যুক্তরাষ্ট্রের সব রাজ্যসহ ৪৫টি দেশে বই বিক্রি করে।

আমাজনের শুরুর দিকে বেজোস টাকা জোগাড়ের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ২০০০ সালের মধ্যে আমাজন ৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পণ্য বিক্রি করবে। যদিও বাস্তবে বিক্রি হয় অনেক বেশি, ১৬৪ কোটি ডলার। তিনি অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টরদের (যারা স্টার্টআপে বিনিয়োগ করে) কাছ থেকে ১০ লাখ ডলার জোগাড় করেন। এর আগে তিনি পরিবারের সদস্য ও পিতামাতার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন, যাঁরা জীবনের সঞ্চয়ের বড় অংশই তাঁকে দিয়ে দেন। বেজোস বলেন, আমাজনের প্রথম ২০ জন বাইরের বিনিয়োগকারীর সবাই ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে, যদিও তাঁদের হিস্যা ছিল ১ শতাংশের কম। এই বিনিয়োগের পরিমাণ বর্তমানে ৬০০ কোটি ডলারের সমান। এরপর ১৯৯৬ সালের জুন মাসে আমাজন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম ক্লেইনার পারকিন্সের কাছ থেকে ৮০ লাখ ডলার সংগ্রহ করে।

১৯৯৭ সালের মে মাসে আমাজন গণশেয়ার ছাড়ে। ১৯৯০-এর দশকে ইন্টারনেটভিত্তিক কোম্পানিতে বিনিয়োগের হিড়িক পড়ে যায়, যাকে বলে ডটকম বাস্ট। স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোর মধ্যে আমাজনে বিনিয়োগের এই বুদ্বুদ ফেটে যায়নি। পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বাজারে নিজের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা সংহত করার মধ্য দিয়ে আমাজনের বার্ষিক বিক্রয় ১৯৯৫ সালের ৫ লাখ ১০ হাজার ডলার থেকে ২০০১ সালে ১৭০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

গত বছর জেফ বেজোসের সম্পদ বৃদ্ধির মূল কারণ তাঁর প্রতিষ্ঠিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজনের শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি। এক বছরে আমাজনের শেয়ারের দাম ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। এতে বেজোসের সম্পদ বেড়েছে ৩৯ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। আমাজনের ব্যবসা বাড়ানোর পাশাপাশি ২০১৩ সালের আগস্টে ২৫ কোটি ডলারে প্রভাবশালী মার্কিন পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট কিনে নেন জেফ বেজোস। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় পত্রিকাটি।

(টুডে সংবাদ/তা.সু.পি)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com