মুসলিম জাতি ঐক্যবদ্ধ না হলে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না : সজিব চৌধুরী, পীর সাহেব হুজুর, জয়পাড়া দরবার শরীফ (ভিডিওসহ)

মজিবুর রহমান চিশতী : ঢাকা জেলার দোহার থানা অঞ্চলের পীরে কামিল, মুর্শিদে মুকাম্মিল, হযরত শাহ সুফি আবদুল জব্বার চৌধুরী নকশাবন্দী মুজাদ্দেদী (কু:ছে:আ:) এর পরলোকে গমন দিবস উপলক্ষে ‘জয়পাড়া দরবার শরীফ’ এর উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী পবিত্র উরশ মুবারক সম্পন্ন হয়েছে। এ উরশ মুবারকের উদ্বোধন করেন, দরবার শরীফের পীর সাহেব হুজুর হযরত শাহ সুফি সামছুজ্জামান চৌধুরী ওরফে সজিব চৌধুরী। পহেলা মার্চ থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত উরশ মুবারক অব্যাহত ছিল। ২ মার্চ শুক্রবার পবিত্র এ উরশ মুবারকের প্রধান দিবস ছিল।

এ উরশ মুবারকে ‘জয়পাড়া দরবার শরীফ’ এর পীর সাহেব হুজুর হযরত শাহ সুফি সামছুজ্জামান চৌধুরী ওরফে সজিব চৌধুরী বিশ্বমুসলিম জাতির উদ্ধেশ্যে বিশেষ জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য রাখেন। পাঠকদের সুবিদার্থে তাঁর সম্পূর্ণ বক্তব্য এখানে তুলে ধরা হলো :

তিনি বলেন, ১৭০৩-১৭৯২ খ্রীস্টাব্দে মাওলানা আব্দুল ওয়াহাব নজদীর নেতৃত্বে ওয়াহাবি আকিদার ইসলাম ব্যাপকভাবে প্রশার ও প্রতিষ্ঠালাভ করেছে। মাওলানা আবদুল ওয়াহাব আরবের বেদুঈন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার গোষ্ঠীগত শক্তি ছিল প্রবল। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষিত পন্ডিত ব্যক্তি। তিনি ইরাকের বসরা নগরীর ধনাঢ্য এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি সৌদি আরবের বাদশা আবদুল আজিজের পিতা ইবনে সৌদের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ইসলামের মূল ভিত্তি হলো, আল্ল¬াহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নাই, মুহম্মদ (স) আল্ল¬াহর রসূল। আল্ল¬াহকে পেতে হলে, মহানবী (স) এর নির্দেশিত পথে চলতে হবে, তাঁকে ভালোবাসতে হবে।

মহানবী (স) বলেন : যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা তোমাদের কামনা-বাসনা আমার বিধানের অনুগামী করতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না (শারহুস সুন্নাহ ও মিশকাত)।

মহানবী রসূলে করিম (স) বলেন : তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাদের মাতা-পিতা ও সন্তান-সন্ততির চেয়ে অধিক প্রিয় হবো (বুখারী, মুসলিম ও মিশকাত-কিতাবুল ঈমান)।

মহানবী (স)-কে ভালোবাসা মুমিন হওয়ার পূর্বশর্ত। হাদিস শরীফে মহানবী রসূলে করিম (স)-কে ভালোবাসা ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লে¬খ করা হয়েছে। মহানবী (স) হলেন, মহান আল্লাহতা’লা ও বান্দার মধ্যকার সেতুবন্ধন। আল্ল¬াহতা’লার সাথে বান্দার সম্পর্ক সৃষ্টির বিষয়টি মহানবী রসূলে করিম (স) এর প্রতি অন্ধ ভালোবাসা, অন্ধ অনুগত ও অনুসরণের উপর নির্ভরশীল। জীবনের সর্বক্ষেত্রে মহানবী রসূলে করিম (স) এর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ, প্রাণঢালা ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে হবে। কারণ ঈমানদার হওয়ার প্রশ্নে মহানবী রসূলে করিম (স) এর ভালোবাসাই হলো প্রধান শর্ত।

ইসলামের মূল আকিদা হলো, মহান আল্ল¬াহতা’লা ও মহানবী রসূলে করিম (স) এর প্রতি অন্ধ ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করা। ইসলামের প্রধান স্তম্ভ কালিমা তৈয়্যেবায় মহান আল্ল¬াতা’লা তা ঘোষণা করেছেন। আল্লাহতা’লার সার্বভৌমত্ব স্বীকার, আল্ল¬াহতা’লার ইবাদত-বন্দিগি করতে হবে মহানবী রসূলে করিম (স) এর প্রতি ঈমান আনায়ন ও তাঁকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। এই আকিদা চিরঞ্জীব। সৃষ্টিজগৎ যতদিন থাকবে ততদিন মহানবী রসূলে করিম (স) এর শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ত্ব ও আদর্শ স্বীকার করতেই হবে। একই সঙ্গে মহানবী (স) এর বংশধর (আহলে বাইত) ও তাঁর সাহাবিদের সম্পর্কে কোনো কটুক্তি করা যাবে না। উমাইয়াদের আনুষ্ঠানিকতার ওই ইসলাম মুসলমানদের ঈমান ও আকিদার মূল স্তম্ভেই আঘাত করেছে।

মহানবী রসূলে করিম (স) সম্পর্কে ওয়াহাবিদের ঈমান ও আকিদা হলো, মুহম্মদ (স) একজন সাধারণ অচল মানুষ ছিলেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর কেবল একটাই পার্থক্য তা হলো, তিনি ওহি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিলে আবদুল ওয়াহাব নজদি নিজের হাতের লাঠিটি দেখিয়ে বলতেন, আমার হাতের এই লাঠির যে ক্ষমতা আছে, মৃত মুহম্মদের সেই ক্ষমতাও নেই। তিনি সাহাবায়ে কিরাম ও আউলিয়া-কিরাম সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করতেন। বর্তমানে তার অনুসারীরা নবীজি (স) ও পরলোকপ্রাপ্ত আউলিয়াদের ইঙ্গিত করে বলেন, যতক্ষণ মানব দেহে প্রাণ আছে, ততক্ষণ সে যা ইচ্ছা তা করতে পারবে। যখন দেহ থেকে প্রাণ চলে যাবে তখন প্রাণহীন দেহের কোনো মূল্য বা ক্ষমতা থাকে না। সে নবী, অলি যে-ই হোকনা কেন! তারা আরও বলেন, সাহাবা, আওলাদে রসূল ও নবীদের মাজার-রওজা ধ্বংস করা ফরয। কিন্তু পবিত্র কুরআন মজিদে মহান আল্ল¬াহতা’লা বলেন :

ওয়াল-তাকুলু লিমাই ইউক্বতালু ফী সাবীলিল্লা-হি আমওয়া-ত; বাল আহ্ইয়া ইউওয়ালা-কিল্লা-তাশ’উরূণ (সূরা বাক্বারা, ২:১৫৪)।

অর্থ: যারা আল্লাহ্র পথে মৃত্যুবরর্ণ করেছে, তাঁদেরকে মৃত মনে করো না, বরং তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝ না।

ওয়াল-তাহসাবানাল্লাজীনা কূতিলু ফী সাবীলিল্লা-হি আমওয়া-তা, বাল আহ্ইয়া ইউন ’ইন্দা রব্বিহীম ইউরযাকূ-ন (সূরা আল-ইমরান, ৩:১৬৯)।
অর্থ: যারা আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করেছে, তাঁদেরকে মৃত মনে করো না, তাঁরা বরং জীবিত, স্বীয় রব্বের নৈকট্যপ্রাপ্ত, স্বীয় রব্বের পক্ষ থেকে রিয্কও প্রাপ্ত।

মহান আল্লাহতা’লা বলেন, ‘যারা আল্লাহ্র পথে মৃত্যুবরণ করেছে, তাঁদেরকে মৃত মনে করো না, বরং তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝ না’। অপর আয়াতে বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করেছে, তাঁদেরকে মৃত মনে করো না, তাঁরা বরং জীবিত, স্বীয় রবের নৈকট্যপ্রাপ্ত, স্বীয় রবের পক্ষ থেকে রিয্কও প্রাপ্ত’। অর্থাৎ তাঁরা নিয়মিত খাদ্য সেবন করেন।

বিজ্ঞ পাঠক, কোনটা সঠিক? মহান আল্লাহতা’লা ও মহানবী রসূলে করিম (স) ঘোষণা, নাকি ওয়াহাবি অনুসারীদের মতবাদ? তারা ওই সব জঘন্য মতবাদ প্রচার করে সরলপ্রাণ মুসলমানদের ঈমান-আকিদা ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং মুসলমানদের বিভক্ত করে দিচ্ছে। হাদিস শরীফে মহানবী রসূলে করিম (স) বলেছেন, ‘আত্মশুদ্ধির সাধনায় থাকা অবস্থায় যারা মৃত্যুবরণ করেন, তারা শহিদের মর্যাদা লাভ করেন’। কাফিরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদে অংশগ্রহণ করা হলো, যিহাদে ‘আজগর’ অর্থাৎ ছোট যিহাদ। আর নিজ দেহ-মনের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে আত্মশুদ্ধির যিহাদ করা হলো, যিহাদে ‘আকবর’ অর্থাৎ বড় যিহাদ। কিন্তু ওয়াহাবি অনুসারীরা উপরোক্ত আয়াত দুটির আংশিক বর্ণনা করেন। তারা আয়াত দুটিকে সশস্ত্র যিহাদকারী শহিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে বর্ণনা করেন।

ইসলাম ধর্মের শরীয়া অনুযায়ী কবরের হেফাযত করা ওয়াজিব। কবরবাসীর জন্য দু’য়া করা সুন্নত। কেউ যদি কারো কবরের হেফাযত করে কিংবা কবরবাসীর জন্য দু’য়া করেন তাহলে ওই দু’য়াকারী যখন কবরবাসী হবেন, তখন দুনিয়াবাসী তার কবরের হেফাযত করবেন এবং তার জন্য দু’য়া করবেন। কবরের হেফাযত ও কবরবাসীর জন্য দু’য়া করা হলো, সদকা-ই-যারিয়া। এ জন্য কবর দেখলেই কবরবাসীকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিতে হয়। আস্সালামু আলাইকুম ইয়া আহ্লাল কুব্রে।

কবরস্থান কিংবা মাজার শরীফে শয়তান প্রবেশ করে না। মাজার শরীফে প্রবেশকালে গেট থেকেই শয়তান মাজারে প্রবেশকারী ব্যক্তির দেহ-মন থেকে বেরিয়ে যায়। তখন ওই ব্যক্তির দেহ-মন পবিত্র ও শয়তানের কুমন্ত্রনা থেকে মুক্ত থাকে। শয়তান মুক্ত দেহ-মনের অধিকারী ব্যক্তি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। পবিত্র মনে চোখের জল ফেলে মহান আল্লাহতা’লার কাছে কাকুতি-মিনতি করে প্রার্থনা করেন। মহান আল্লাহতা’লা বান্দার চোখের জল অত্যাধিক পছন্দ করেন। বান্দার চোখের জলে দয়ালু আল্লাহতা’লার রহমতের দরজা খুলে যায়। বান্দার মনের বাসনা পূর্ণ হয়। মহান আল্লাহতা’লার সাহায্য পাওয়ার ওই সহজ-সরল পথ বন্ধ করার জন্যই ওয়াহাবি অনুসারীরা ওই সব অপপ্রচার করেন। রাষ্ট্রশক্তির প্রবল প্রতাপে আবদুল ওয়াহাব নজদীর অনুসারীরা আরবজুড়ে করেছিল এক ভয়াবহ তান্ডব। তারা সাহাবায়ে কিরামদের মাজার ভেঙ্গে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল। তাদের আক্রমণ থেকে মা ফাতিমা (রা) এর মাজার শরীফও রক্ষা পায়নি।

সাহাবায়ে কিরাম, আওলাদে রসূল ও নবীদের মাজার-রওজা ধ্বংস করা ফরয! যে সাহাবায়ে কিরাম, আওলাদে রসূল ও নবীগণ মানুষ জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছেন, শান্তির পথে নিয়ে এসেছেন, তাঁদের মাজার-রওজা ধ্বংস করা কীভাবে ফরয হয়? সাহাবায়ে কিরাম, নবী-রসূল তো দূরের কথা একজন সাধারণ মানুষের কবর ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন গুনাহের কাজ। এই গুনাহের কাজ কীভাবে ফরয হয়? যারা এই ফৎওয়া দেয় তারা কী মুসলমান? কোনো মুসলমান সম্প্রদায় এ ধরনের জঘন্য ফৎওয়া দিতে পারেন না।

মহানবী রসূলে করিম (স) জীবদ্দশায় অচল মানুষ ছিলেন। মহানবী (স) যদি অচল মানুষ হতেন তাহলে তিনি কীভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? কীভাবে তিনি ২৭টি যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন? তিনি ছিলেন মুসলিমবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তাঁর নির্দেশেই যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হতো। কোনো সুস্থ ব্যক্তি মহানবী রসূলে করিম (স) জীবদ্দশায় অচল মানুষ ছিলেন বলে কল্পনা করতে পারেন না। সুতরাং ওয়াহাবি আকিদা ইসলামের জন্য একটি আত্মঘাতী আকিদা। ওই আকিদা বর্জন করা না গেলে মুসলমানরা কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না এবং পৃথিবীতে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না। মুসলমানদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেওয়ার জন্যই ওই আকিদা প্রণয়ন, প্রচলন ও শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।