‘বাংলা উন্নয়ন বোর্ড’ পুণরায় চালু করতে হবে : অধ্যাপক আসাদুজ্জামান

অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চিন্তাশীল লেখক, প্রশাসন সংস্কারের প্রস্তাবক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, নতুন চিন্তা-চেতনার পথিকৃত এবং যশস্বী অনুবাদক। তাঁর প্রস্তাবনার ফলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নাগরিকদের ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’ নাগরিক কার্ড প্রদান করেন। তিনি বিভিন্ন সময় যে সব প্রস্তাব করেছেন তা হলো : ১. প্রতি জেলায় নির্বাচিত প্রতিনিধির শাসন কায়েম, ২. নাগরিক পরিচিতি কার্ড প্রবর্তন, ৩. বিচার বিভাগ পৃথক করণ, ৪. বিষয় ভিত্তিক প্রয়োজনীয়সংখ্যক ক্যাডার সার্ভিস গঠন, ৫. মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক প্যাকেজ ভিত্তিক পাস-ফেল রহিত করণ, ৬. প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে তথ্য সেবাকেন্দ্র স্থাপন, ৭. ইউনিয়ন পরিষদকে যাবতীয় উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু রূপে গ্রহণ, ৮. প্রতি থানায় একটি করে ট্রেনিং ইন্সস্টিটিউট স্থাপন এবং ৯. সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য পুণরায় ‘বাংলা উন্নয়ন বোর্ড’ চালু করণ।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মানবতাবাদী দল-বিএইচপি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কর্তৃক ২০১৭ সালে জনপ্রশাসন বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় রাষ্ট্রীয় পুরুস্কার স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। আমরা টুডে সংবাদ এর পক্ষ থেকে তাঁর মুখোমুখী হয়েছিলাম সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার না হওয়ার কারণসমূহ জানতে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান রনি।

সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার না হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি আমাদেরকে বলেন, প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারী আসলে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, গ্রন্থমেলা করা হয়, কিন্তু বাংলা ভাষার উন্নয়ন অর্থাৎ ষোল কোটি মানুষের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার এবং এর উন্নয়নের জন্য ১৯৭৩ সালে ‘বাংলা একাডেমি’র পাশাপশি ‘বাংলা উন্নয়ন বোর্ড’ করা হয়েছিল। এ বোর্ডের দায়িত্ব ছিল, বাংলা ভাষার উন্নয়ন, পাঠ্যপুস্তক তৈরি এবং শিক্ষার উচ্চ পর্যায়ে বিজ্ঞান, কারিগরি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সিসমোলজি এবং নানা ধরনের বিজ্ঞানভিত্তিক কারিগরি পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা। কিন্তু ১৯৭৩ সালে ড. মাজহারুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুকে ইনফ্লুয়েন্স করে বাংলা উন্নয়ন বোর্ডকে বাংলা একাডেমির ভেতরে একিভুত করেন। ফলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহারের মূল কাজগুলো আর অগ্রসর হতে পারেনি।

তিনি আরো বলেন, বাংলা উন্নয়ন বোর্ড বিলুপ্ত হওয়ার ফলে বিগত ৪৫ বছর ধরে বাংলা ভাষার উন্নয়নের কাজ বন্ধ রয়েছে। এ বোর্ডের প্রধান পরিচালক ছিলেন, ড. মো. এনামুল হক। ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ও ড. মো. এনামুল হক, তাঁরা দু’জনেই ছিলেন ভাষা বিসারদ এবং ভাষা বিশেষজ্ঞ। কিন্তু সে সময় ড. মাজহারুল ইসলামকে বাংলা একাডেমির মহাপচিালক এবং ড. এনামূল হককে পরিচালক করা হয়। এটা ছিল একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বাংলা উন্নয়ন বোর্ড সৃষ্টি হয়েছিল বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে।

বিশিষ্ট এ শিক্ষাবিদ বলেন, বিগত ৪৫ বছরে বাংলা উন্নয়ন বোর্ড শিক্ষার উচ্চস্তরের বিভিন্ন ভাষার পাঠ্যপুস্তক অনুবাদ করে বাংলা ভাষায় রূপান্তর করতে সক্ষম হতো। অনুবাদ করা বাংলা ভাষার সে সব গ্রন্থ উচ্চ স্তরের শিক্ষায় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভূক্ত করা হলে বাংলা ভাষা সর্বস্তরে ব্যবহার নিশ্চিত হয়ে যেত। তবে সে সুযোগ এখনও ফুরিয়ে যায়নি। বাংলা একাডেমির সঙ্গে একিভূত বাংলা উন্নয়ন বোর্ডকে পৃথক করে পুণরায় কার্যকরী করতে হবে। এ বোর্ডকে পূর্বের মর্যাদায় ফিরিয়ে নিতে হবে। প্রতিভাবান শিক্ষকদের দায়িত্ব দিতে হবে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৭৩ সালে বাংলা উন্নয়ন বোর্ড গড়ে উঠেছিল, সে উদ্দেশ্য সফল করার জন্য পুণরায় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড চালু করতে হবে।

বিশিষ্ট এ শিক্ষা সংস্কারক বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারী আসলে শহীদ মিনারে শুধু ফুল দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে বাংলা ভাষা সর্বস্তরে চালু হবে না। সকল স্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। যে সব বিদেশী শব্দের বাংলা বাক্য না থাকার কারণে উচ্চতর বিচারালয়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার করা যাচ্ছে না, প্রয়োজনে বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে সে সব শব্দ সৃষ্টি করতে হবে। যেমন, Habeas, Write, Term of reference ইত্যাদি শব্দ বাংলায় লিখে ব্যবহারপূর্ব বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ কারণে বাংলা উন্নয়ন বোর্ডকে পুণরায় চালু করার জন্য জোর দাবি জানান এ প্রবীন শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ।

(টুডে সংবাদ/তমাল)
প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com