রেডিও জাদুঘরের স্বপ্ন দেখেন মোফাজ্জল

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
টুডে সংবাদ.কম

ঢাকা: মানুষের স্বপ্ন অনেক কিছু নিয়েই থাকে। কারও স্বপ্ন বাড়ি-গাড়ি। কারও নাম–যশ প্রতিপত্তি অর্জন করা। আবার কারও স্বপ্ন উড়োজাহাজের পাইলট হয়ে পৃথিবী চষে বেড়ানো। কিন্তু এসব স্বপ্নের কোনোটাই তাকে ছুঁয়ে যায় না।

তার স্বপ্ন একটাই, রেডিও জাদুঘর করা। যেখানে থাকবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার ব্যবহৃত সব রেডিও। আরও থাকবে, পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হাজারও রেডিওর সমাহার। সেই রেডিও জাদুঘর হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেডিও জাদুঘর। এসব রেডিও নিয়ে গবেষণা করবে আগামীর প্রজন্ম।

এমন স্বপ্ন যাকে সারাক্ষণ তাড়া করে সেই রেডিওপাগল মানুষটি হলেন মোফাজ্জল হোসেন। তার জন্ম ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার আকুয়া গ্রামে।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ বেতার ভবনে বিশ্ব বেতার দিবসে কথা হয় মোফাজ্জলের সঙ্গে। এদিন তার সংগ্রহে থাকা ছয়শো রেডিও নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করে বাংলাদেশ বেতার। রেডিও দিবসের অন্য আয়োজন তো ছিলোই, এরই এক ফাঁকে বাংলানিউজকে শোনালেন তার গল্প।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রেডিও সংগ্রহ তার নেশা। রেডিওই যেনো তার ধ্যান-জ্ঞান। তবে বিয়ের পর রেডিওর কারণে স্ত্রী তাকে প্রথমে পাগলই ভেবেছিলেন। কিন্তু এখন বোঝেন, তার স্বামী একটি ভালো কাজ নীরবে করে চলেছেন। রেডিও কেনার জন্য স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কারও বিক্রি করতে হয়েছে মোফাজ্জলকে।

শুধু কি তাই? রেডিও সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি বেশ কয়েকবার ঝুট-ঝামেলার মুখোমুখি হয়েছেন। কখনও নিজের পায়ের জুতা রেডিওর মালিককে তুলে দিয়ে খালি পায়েই ঘরে ফিরেছেন। একবার রেডিও কিনে বাড়ি ফেরার সময় ডাকাতের কবলে পড়লে, নদীতে ঝাঁপ দিয়ে রক্ষা করেন তার কেনা রেডিওটি।

কীভাবে শুরু জানতে চাইলে অতীতে ফিরে যান, বাবা আবদুল ফারুক ছিলেন রেডিও মেকানিক। তার বড় পরিচয় তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার দোকানে মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন মানুষ আসতেন ও রেডিওর বিভিন্ন অনুষ্ঠান নিয়ে গল্প বলতেন। বলতেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে রেডিও কীভাবে প্রেরণা যুগিয়েছিলো, পাকিস্তান বাহিনীর মনোবলকে দুর্বল করে দিতে রেডিও কী ভূমিকা রেখেছিলো।

গল্পগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন মোফাজ্জল। শোনেন প্রথম রেডিও আবিষ্কারে বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান।

এসব প্রেরণার গল্প তাকে বিভোর করতো রেডিও সংগ্রহে। তাই বড় হয়ে রেডিও সংগ্রহ শুরু করেন। ভাবনা তার বিফলে যায়নি। ১৯৮৫ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই মোফাজ্জল শুরু করেন রেডিও সংগ্রহ। অনেক সময় বাবার সঙ্গে বাজার করতে গিয়ে, বাজারের ব্যাগ ফেলেই ছুটেছেন অন্য কোনো রেডিওর খোঁজে।

একসময় জীবনের তাগিদে ময়মনসিংহ থেকে তিনি চলে আসেন রাজধানী ঢাকায়। রেডিও সংগ্রহ তার নেশা হওয়ার কারণে পড়াশোনায় প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি মোফাজ্জল।

এ নিয়ে তার ভাষ্য, রেডিও আমাকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে। রেডিওই আমার পড়াশুনা। আমি যদি পড়াশুনা করতাম, তবে আজ ছয়শো রেডিও আমার সংগ্রহে থাকতো না।

তোফাজ্জল পেশায় একজন ঘড়ির মেকানিক। পুরনো ও নষ্ট ঘড়ি কিনে তা ভালো করে বিক্রির পর সেই অর্থ দিয়ে কেনেন রেডিও। তার সংগ্রহের রেডিওগুলো রাখার জন্য প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা রুম ভাড়া গোনেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, সংগ্রহ করা নষ্ট রেডিও ভালো করার জন্য রেখেছেন একজন মেকানিকও।

ফিলিপস, গ্রুন্ডিক, পাই, মারফি, জ্যামিথ, টেলিফোন ক্যান ও বুশ কোম্পানির রেডিওসহ নামি-দামি বিভিন্ন ব্রান্ডের ছয়শো রেডিও সংগ্রহে রয়েছে তার। রয়েছে একশো ও পঁচাত্তর বছর আগের ব্যবহৃত রেডিও।

তিনি জানান, ১৯৯৪ সালে ঢাকার জিনজিরায় এক মুক্তিযোদ্ধার রেডিও কিনতে গিয়েছিলেন। তখন সেই মালিক রেডিওর দাম চেয়ে বসেন ১৫শ টাকা। কিন্তু তার কাছে ছিলো মাত্র আটশো টাকা। দর কষাকষি শেষে আটশ টাকায় যখন রেডিওটি কিনবেন, তখনই রেডিওর মালিক তার পায়ে থাকা সুন্দর জুতাজোড়া চেয়ে বসলেন। অগত্যা টাকা আর জুতা দিয়ে রেডিও সঙ্গে নিয়ে খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে মিরপুরের মনিপুরের বাসায় চলে আসেন।

আরেকবার বরিশালের পয়সার হাটে রেডিও কিনে বাড়ি ফেরার পথে তার নৌকায় ডাকাত পড়ে। সঙ্গে থাকা রেডিও রক্ষার জন্য নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরিয়ে তীরে ওঠেন। পরে সেই রেডিও মেকানিকের কাছ থেকে সচল করে নেন।

মোফাজ্জল বলেন, রেডিও সংগ্রহ আমার এতোটাই নেশা যে, বিয়ের ২২ বছরে মাত্র এক দিন বউকে নিয়া বাইরে ঘুরতে গেছি। অনেক সময় পকেটে টাকা ছিলো না, মানুষের বাড়িত কামলা দিয়া সেই টাকা দিয়া রেডিও কিনছি।

তিনি আরও বলেন, আমার রেডিও নিয়ে গবেষণা করবে নতুন প্রজন্ম। জানবে, রেডিওর ইতিহাস ও স্বাধীনতা যুদ্ধে কী ভূমিকা রেখেছিলো এই যন্ত্রটি।

তিনি চান, তার সংগ্রহ করা রেডিও দিয়ে একটি রেডিও জাদুঘর করতে। তবে কারও অনুগ্রহ বা দয়া-দাক্ষিণ্য তার কাম্য নয়। বলেন, ওই জাদুঘরে থাকবে বাংলাদেশে ব্যবহৃত ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রেডিও। আর জাদুঘরটি আমি রেডিওর আদলে তৈরি করে নাম দিতে চাই, ‘স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু রেডিও জাদুঘর’।

(টুডে সংবাদ / ফ.ম )