এশিয়া সফর, ট্রাম্পের দর্প চূর্ণ

জুয়ান লক ডোয়ান : ট্রাম্প যতই বলুন না কেন যে তাঁর এশিয়া সফর সফল হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার গণমাধ্যম, সাবেক কূটনীতিক ও এশিয়া বিশেষজ্ঞরা তাঁর সঙ্গে দ্বিমত করছেন। কেউ কেউ বলছেন, এই সফর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয়কর। আবার কেউ কেউ বলছেন, ট্রাম্প যে সাফল্যের কথা বলছেন, সেটা খুব একটা অর্জিত হয়নি। অনেকে আবার এটাও বলছেন যে চীন সফরে যেন ট্রাম্পের দর্প চূর্ণ হয়েছে। আর বারাক ওবামা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে মহান বানানোর বদলে চীনকে মহান বানিয়েছেন।

ব্যাপারটা হলো, ট্রাম্পের দাবি অনুসারে এই সফর অতটা সফল না হলেও অনেকে আবার যেটা বলছেন যে এই সফর বিপর্যয়কর হয়েছে, সেটাও নয়। কিছু ক্ষেত্রে এটা বরং সফল হয়েছে, যদি এটাকে আমরা তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম সফরের সঙ্গে তুলনা করি; ওই সফরে তিনি অনেক অকৌশলী কথা বলেছেন। তবে এবার কিছু ছোটখাটো ভুল ছাড়া তাঁর সফর বেশ নির্বিঘ্নে শেষ হয়েছে। এর আগে ১৯৯২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এ রকম দীর্ঘ এশিয়া সফরে এসেছিলেন।

তবে ইউরোপীয় মিত্রদের তুলনায় এশীয় নেতারা ট্রাম্পকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছেন। চীন তো লালের চেয়েও বেশি লালগালিচা বিছিয়ে দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়েছে। এই সফরকে ‘রাষ্ট্রীয় সফরের চেয়ে বেশি কিছু’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ১৯৪৯ সালের পর এই প্রথম কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিষিদ্ধ শহর বা ফরবিডেন সিটিতে খাবার খেলেন। কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারেন, চীন ট্রাম্পের অহম সন্তুষ্ট করে তাঁর কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি ও ছাড় আদায়ের জন্য এত জাঁকজমক করেছে। এটা সত্যি বলেই মনে হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সাধারণত মুক্ত বিশ্বের নেতা হিসেবে গণ্য হন, এবার সেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন ও তার কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্টকে প্রশংসার বানে ভাসিয়ে দিলেন। ট্রাম্প সি চিন পিংকে ‘খুবই বিশেষ একজন মানুষ’ হিসেবে গণ্য করেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, চীন মার্কিন ‘অর্থনীতি’কে ধর্ষণ করেছে। কিন্তু এবার দেশটির সমালোচনা না করে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাণিজ্য–সুবিধা নেওয়ার জন্য চীনের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। চীনের দিকে আঙুল তাক না করে তিনি দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতির (২০১৬ সালে ৩৫০ বিলিয়নের বেশি) জন্য পূর্বসূরিদের সমালোচনা করেন। উষ্ণ অভ্যর্থনা পাওয়া সত্ত্বেও সফরে তিনি যেসব চুক্তি ও যেসব বিষয় উল্লেখ করলেন, তা সত্ত্বেও বেইজিংয়ে তিনি যেমন অপমানিত হননি, তেমনি এই চার দেশ থেকে খালি হাতেও ফেরেননি। বুধবার তিনি বললেন,
তিন কোটি লক্ষ্য নিয়ে তিনি এবার এশিয়া সফরে গিয়েছিলেন; যার মধ্যে একটি ছিল ‘ন্যায্য ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে জোর দেওয়া’।
বেইজিং, আপেক সম্মেলনসহ সব জায়গায় তিনি এটা পরিষ্কার করে বলেছেন যে এই অঞ্চলের দেশগুলো, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক খুবই অন্যায্য, অসম ও ভঙ্গুর। আর এ ধরনের দীর্ঘ ভারসাম্যহীনতা অবশ্যই শোধরাতে হবে।

অনেকে যে বলেন ট্রাম্প লেনদেনের প্রেসিডেন্ট, সেটা কিন্তু তাঁরা ঠিকই বলেন। অনেকেই আবার সেটা পছন্দ করেন না। কিন্তু যিনি মূলত নিজের দেশকে সর্বাগ্রে রাখার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন, সেই প্রেসিডেন্টের বাণিজ্য-বিষয়ক অবস্থান ভালো রকম কাজে এসেছে বলেই মনে হয়। এই সফরে তিনি মোট ৩০ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য চুক্তি করেছেন, যার মধ্যে শুধু চীনের সঙ্গে ২৫ হাজার কোটি ডলারের চুক্তি করেছেন। এসব চুক্তিতে চীনসহ অন্য এশীয় দেশগুলোতে মার্কিন পণ্য বিক্রয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিনিয়োগ করার কথা রয়েছে।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন স্বীকার করেছেন, এই সফরে যেসব চুক্তি হয়েছে, বাণিজ্য ঘাটতির সাপেক্ষে তা একেবারেই নগণ্য। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে চায়, তাহলে তাকে কোথাও না কোথাও থেকে শুরু করতে হবে। সে ক্ষেত্রে এই চুক্তিগুলো প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আর ট্রাম্প বেইজিং ছাড়ার পর চীন তার ব্যাংক ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিতে বিদেশি মালিকানার সীমা তুলে নিয়েছে। চীন আগে থেকেই আর্থিক খাতে উদারীকরণের কথা ভাবছিল, তবে এটা যে কেবল যুগপৎ ঘটেছে, তা বলা যাবে না। ট্রাম্প বেইজিংয়ে যে পারস্পরিকতার কথা বলেছেন বা সৌজন্য দেখিয়েছেন, তার কারণেও এই শুরুটা হতে পারে।

বস্তুত, লোকে মনে করে, ট্রাম্প যখন অর্থনৈতিক সম্পর্কে ন্যায্যতা ও পারস্পরিকতার কথা বলেন, তখন তার একটা যৌক্তিকতা থাকে। এই লক্ষ্যে কাজ করা বা এটা অর্জন করা হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, এশীয় দেশগুলোও লাভবান হবে, চীনের সঙ্গে যাদের ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। তবে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই সফরের প্রভাব মূল্যায়নের সময় এখনো না এলেও তিনি এশীয় দেশগুলোকে পরামাণবিক অস্ত্রের বিপদ সম্পর্কে একত্র করতে পেরেছিলেন, এটাও তাঁর সফরের অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনামসহ অন্য দেশগুলো যাদের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের সুসম্পর্ক আছে, তারা সবাই উত্তর কোরিয়ার বিপারমাণবিকীকরণের ব্যাপারে একমত হয়েছে।

তবে ট্রাম্প যে শুধু বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বন্দোবস্তের ওপর জোর দিয়েছেন, সেটা কিন্তু আপেক, আসিয়ান ও ইস্ট এশিয়া সামিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জোটগুলোর নীতিবিরোধী। এসব বন্দোবস্ত গড়ে ওঠার কারণ হলো, এশীয় দেশগুলো এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা-বিষয়ক ইস্যুতে বহুপক্ষীয় বন্দোবস্তের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে চায়। তিনি একদিকে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে এশীয় মিত্রদের একত্র হতে আহ্বান জানাচ্ছেন, অন্যদিকে বাণিজ্যের ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় বন্দোবস্তে জোর দিচ্ছেন—ফলে তাঁর মধ্যে একধরনের দ্বিচারণ ও ভণ্ডামি দেখা যাচ্ছে।

অন্ধভাবে না হলেও তিনি যদি একগুঁয়েমি করে বাণিজ্যের ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় মনোভঙ্গি বজায় রাখেন, তাহলে চীন এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে আসীন হবে, যারা ইতিমধ্যে বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। এই অবস্থায় অর্থনৈতিক নেতৃত্ব হারালে এই অঞ্চলের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়বে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।

জুয়ান লক ডোয়ান: যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক গবেষক।

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইখ দিন এবং  শেয়ার করুন