যানজটের বাড়তি অভিশাপ রিকশা!

ইমানুর রহমান,ঢাকা : রাজধানী ঢাকার যানজটের কারণ হিসেবে রিকশাকে দায়ী করা হয়। এ কারণে তিন দশক আগে থেকেই রিকশার নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে এক শ্রেণির নাম সর্বস্ব সমিতি ও সংগঠন। তারা রিকশার লাইসেন্স স্বরূপ নম্বর প্লেট দিচ্ছে। একেকটি রিকশায় এ ধরনের দুই থেকে পাঁচটি করে নম্বর প্লেট দেখা যায়। এক একটি নম্বর প্লেটের বিপরীতে রিকশা প্রতি তিনমাস অন্তর আদায় করা হচ্ছে ৪৫০ টাকা। আর লাইসেন্সের কথা বলে নেওয়া হচ্ছে ১৫-২০ হাজার টাকা। ফলে লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রাখায় একদিকে যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে সিটি করপোরেশন, অন্যদিকে অতিরিক্ত রিকশার কারণে বাড়ছে যানজট।

দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য মতে, রাজধানীতে লাইসেন্সধারী রিকশার সংখ্যা ৭৯ হাজার ৫৫৪টি। অথচ বাস্তবে এর সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। গত ৩০ বছর ধরে রাজধানীর রাস্তায় কাগজে-কলমে নতুন কোনও রিকশার লাইসেন্স বা অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। তারপরও প্রতিদিনই রাস্তায় নামছে নতুন নতুন রিকশা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে বৈধ রিকশার সংখ্যা সাড়ে ৭৯ হাজার। আর অবৈধ রিকশার সংখ্যা ১০ লাখ। এই অবৈধ রিকশার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে ২৮টি সংগঠন। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিভাগ রিকশা ও ভ্যান মালিক সমিতি, বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশন, মহানগর রিকশা মালিক লীগ, রিকশা ও ভ্যান মালিক শ্রমিক লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশন, জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগ ও বাংলাদেশ রিকশা মালিক লীগ, রিকশায় এবং শ্রমিক-মালিক লীগ, ঢাকা সিটি মুক্তিযোদ্ধা রিকশা-ভ্যান মালিক কল্যাণ সোসাইটি অন্যতম।

লাইসেন্সবিহীন এসব রিকশা নিয়ন্ত্রণহীন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন থেকে লাইসেন্স দেওয়া রিকশাগুলোর বিষয়েও নেই কোনও নিয়ন্ত্রণ বা বিধিমালা। নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে রিকশাগুলো।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসূফ আলী সরদার বলেন, রিকশার কারণে নগরীতে যানজট বাড়ায় ১৯৮৬ সালের পর সরকারের নির্দেশে রিকশার লাইসেন্স বন্ধ রাখা হয়েছে। এরপর বিভিন্ন সংগঠনের নামে লাইসেন্স দেওয়ার আবেদন করা হয়। কিন্তু সিটি করপোরেশন নতুন করে কোনও লাইসেন্স দিতে পারেনি।’

তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন সময় অবৈধ রিকশার বিরুদ্ধে নগরীতে অভিযান পরিচালনা করা হলে এসব সমিতি আদালতে রিট করে। আদালত স্থিতাবস্থার আদেশ দিলেও সংশ্লিষ্ট সমিতি ও সংগঠনগুলো রিটের দোহাই দিয়ে নতুন করে আরো রিকশার লাইসেন্স দেওয়া শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নগরীতে রিকশা-ভ্যানের নিয়ন্ত্রণ নেই। অবৈধ রিকশার ছড়াছড়ি। বৈধ লাইসেন্সধারী রিকশার তুলনায় ১৫ গুণ বেশি রিকশা-ভ্যান নগরীতে চলছে। ভাড়ায়ও নেই নিয়ন্ত্রণ। অতিরিক্ত রিকশার কারণে সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা। রিকশা কেন্দ্রীক যেসব সংগঠন গড়ে উঠেছে সেগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চালানো উচিত।

অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগ মানুষ নিজস্ব গাড়িতে চলে। ভাড়ায় চালিত বাস ও মিনিবাসে ২৫ ভাগ। সিএনজি ও ট্যাক্সিক্যাবে ৫ ভাগ। বাকি ৬০ ভাগ মানুষ চলাচল করেন রিকশায়। এ সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত ভাড়াও আদায় করেন রিকশা চালকরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ এলাকার রিকশা চালক আশরাফ উদ্দিন বলেন, আমার রিকশায় সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স আছে। কিন্তু সমিতি থেকে লাইসেন্স না নেওয়ায় গ্যারেজে রিকশা রাখতে পারি না। সে কারণে আর দুইটা লাইসেন্স (নম্বর প্লেট) নিই। প্রতিটা লাইসেন্সের জন্য তিনমাস অন্তর ৪৫০ টাকা করে দিতে হয়।’

এ প্রসঙ্গে জাতীয় রিকশা ভ্যান মালিক শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলী বলেন, ২০০১ সালে সরকার ও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। এরপর সেই চুক্তি অনুযায়ী তারা সিটি করপোরেশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু সিটি করপোরেশন পরবর্তীতে সেগুলোর নিবন্ধন দেয়নি। পরে বাধ্য হয়ে তারা সংগঠনের পক্ষ থেকে নম্বর প্লেট দিয়েছেন।

অতিরিক্ত টাকা আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংগঠনের খরচের জন্য মাসে ২০ টাকা নেওয়া হয়। এর বাইরে কোনও টাকা নেওয়া হয় না। তবে আমাদের নাম ভাঙিয়ে যদি কেউ টাকা আদায় করে সেখানে আমার করার কিছুই নেই। তিনি আরো বলেন, ভুয়া কিছু সংগঠন মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ভাঙিয়ে ঢাকায় রিকশা নামাচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ওসমান গণি বলেন, সিটি করপোরেশন ছাড়া কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রিকশার লাইসেন্স দিতে পারে না। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। এখনও আলোচনা হচ্ছে।