যুদ্ধোত্তর জার্মানির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

সরাফ আহমেদ : শুধু লোকরঞ্জনবাদী কায়দায় মানুষের আবেগকে সম্বল করে মাত্র চার বছর আগে গঠিত ইসলাম, শরণার্থী ও অভিবাসীবিরোধী জার্মানির জন্য বিকল্প বা অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড নামের দলটি জার্মানির নির্বাচনে ৯৪ আসন নিয়ে তৃতীয় বৃহত্তর দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

জার্মানির যুদ্ধোত্তর সমাজে এ ধরনের জাতীয়তাবাদী কট্টরপন্থীদের দলের বিজয়ে সবাই স্তম্ভিত। ইতিপূর্বে এই বছর মধ্য ইউরোপের আরও দুটি দেশের নির্বাচনের মধ্যে হল্যান্ডে গ্রিট ভেল্ডারের পার্টি ফর ফ্রিডম ও ফ্রান্সে মারি লো পেনের কট্টর উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট বেশ শোরগোল তুললেও জার্মানিতে এই পন্থীরা একরকম সফল হয়েছেন।

এই মুহূর্তে জার্মানির অর্থনৈতিক ভিত্তি বেশ শক্ত। বেকারত্বের পরিমাণ রেকর্ড পরিমাণে কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তাও আছে সেখানে। জার্মানি এই সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম স্বাবলম্বী দেশ। তারপরও কেন জার্মানির বৃহত্তম ও জনপ্রিয় দল আঙ্গেলা ম্যার্কেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন দলের আট ও মার্টিন সুলজের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পাঁচ শতাংশ সমর্থকেরা তাঁদের ছেড়ে চলে গেল।

জার্মানির বড় দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন মূলত রক্ষণশীল হলেও আঙ্গেলা ম্যার্কেলের নেতৃত্বে দলটি বিগত ১২ বছরে ক্রমেই রক্ষণশীলতা থেকে বের হয়ে মধ্যপন্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া গত দুই দফায় ২০০৫ থেকে ২০০৯ আবার ২০১৩ থেকে ২০১৭ সোশ্যাল ডেমোক্রেট দলের সঙ্গে জোট বেঁধে দেশ শাসনের কারণে অনেক বিষয়েই সামাজিক গণতন্ত্রীরা গুরুত্ব পেয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাহত দেশগুলো থেকে আসা ১০ লাখের বেশি শরণার্থীকে (অধিকাংশই মুসলিম) জার্মানির গ্রহণ করার বিষয়টি ম্যার্কেলের দলের অনেক অনুসারীর পছন্দ হয়নি। তবে বিপুলসংখ্যক জার্মান এই বাস্তুচ্যুত শরণার্থীদের সাদরে গ্রহণ করেছিলেন বা অন্যভাবে বলা যায়, ম্যার্কেলের মানবিক শরণার্থী নীতি মোট ভোটারদের মাত্র ১৩ শতাংশের পছন্দ হয়নি। আর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের কিছু নীতির বিরুদ্ধাচরণকারীদের ক্ষোভ কাজে লাগিয়েছে কট্টরবাদী অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড দলটি। তাদের ৬০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, তাঁরা সরকারের কিছু সিদ্ধান্তে বিরক্ত হয়ে বা প্রতিবাদ হিসেবে দলটিকে ভোট দিয়েছেন।

দলটির সভাপতি আলেকজান্ডার গাউল্যান্ড বলেছেন, তিনি জার্মানির রাজনীতি থেকে সবাইকে বিতাড়িত করবেন এবং জার্মান জাতিকে পুরোনো ঐতিহ্যে ফিরিয়ে আনবেন। এই নেতা এবং দলটির কথাবার্তা পুরোনো নাৎসিবাদী রাজনীতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। জার্মানির ডাইসাইট পত্রিকা অনলাইনে একটি ব্লগ খুলে প্রশ্ন করেছে, আপনি কেন অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড দলটিকে ভোট দিলেন! সেখানে বেশির ভাগ মানুষ বলেছেন, জার্মানিতে মুসলিম শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং অধিক হারে অভিবাসীদের জার্মানিতে বসবাসের কারণে জার্মানির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সংকট প্রকট হতে পারে। আবার কেউ কেউ সব ক্ষেত্রে জার্মান সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন করে শরণার্থীদের পেছনে বিপুল ব্যয়ের প্রসঙ্গটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব জার্মানির যে মানুষেরা অধিকতর মৌলিক অধিকার আর গণতন্ত্রের জন্য তৎকালীন এরিখ হোনেকারের সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন এবং অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়ে স্বদেশ ছেড়ে পালিয়ে প্রাগে পশ্চিম জার্মানির দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে শরণার্থী হয়েছিলেন, আজ সেই পূর্বাঞ্চলের মানুষেরাই অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড দলটিকে ২২ শতাংশ ভোট দিয়েছেন।

জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল নির্বাচনের পর জানিয়েছেন, তিনি গণতান্ত্রিক রাজনীতি দিয়ে কট্টরবাদীদের মোকাবিলা করবেন এবং তাঁর দলের যেসব সমর্থক চলে গেছেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনবেন। তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী সামাজিক গণতান্ত্রিক দলের মার্টিন শুলজ বলেছেন, শরণার্থী রাজনীতি নিয়ে জার্মান সমাজকে আপাতবিভক্ত করা হলেও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই কট্টরবাদীদের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের বাইরে ও ভেতরে লড়বেন।

তবে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকলে তারা আবারও পুরোনো ভাবমূর্তি ফিরে পাবে বলে দলটির সমর্থকেরা মনে করেন। এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট সরকারের তিন শরিক দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের পক্ষে ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন (২৪৬ আসন) ও সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলকে (১৫৩ আসন) নিয়ে পুনরায় জোট সরকার গঠন সম্ভব হলেও সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দল জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় যাবে না বলে জানিয়েছে। বিকল্প জোট হিসেবে আঙ্গেলা ম্যার্কেলের হাতে লিবারেল ফ্রি ডেমোক্রেটিক দল ও পরিবেশবাদী িগ্রন দলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা ছাড়া নতুন সরকার গঠনে বিকল্প নেই। সম্ভাব্য শরিকেরা সরকার গঠনে তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে দেনদরবার করবেন বলে আগেভাগেই জানিয়েছেন।

আঙ্গেলা ম্যার্কেল এবার কিছুটা ধাক্কা খেলেও ৮৭ শতাংশ ভোটারের আস্থা তাঁর ওপরই রয়েছে। জার্মানির তথা ইউরোপীয় ঐক্যের কান্ডারি এবং বিশ্বনেতৃত্বের আসনে জায়গা করে নেওয়া এই নেত্রী তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে আগামী দিনেও জার্মানি তথা ঐক্যবদ্ধ ইউরোপকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।