বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের যুদ্ধ হলে ভারতই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে!

ড. সুফি সাগর সামস্ : জাতীয়ভাবে দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ব্যতীত রাষ্ট্রের শান্তি, সমৃদ্ধি, সংহতি, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হয় না। যে রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর কৃষ্টির বন্ধন যত মজবুত, সেই রাষ্ট্রের জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় সংহতি তত সুকঠিন। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হলে তাদের কৃষ্টির বন্ধন মজবুত হতে হয়। কৃষ্টির বন্ধন বিভেদ রেখাকে মুছে দেয়। এ জন্যই বাঙ্গলার উৎস ও ইতিহাস জানা দরকার। বাঙ্গলার ইতিহাস বিগত হাজার হাজার বছরের। ‘বঙ্গ’ থেকেই ‘বাঙ্গলা’ ও ‘বাঙালি জাতি’। আমাদের স্বাধীন বাঙ্গলার ভূখন্ডই হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের ‘বঙ্গ’ অঞ্চল। বঙ্গ কিংবা বঙ্গের সূত্র ধরে অগ্রসর হলে বাঙ্গলার সঙ্গে এর যোগসূত্র পাওয়া যায়। কুরআন মজিদে বর্ণিত পয়গাম্বর হযরত নুহু (আ) এর কনিষ্ট পুত্রের নাম ছিল হযরত ‘হাম’। হযরত নুহু (আ) এর আমলের মহাপ্লাবনের পর হাম ইরাক থেকে ভারতবর্ষে আগমন করেন। তাঁর ছয় পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম ছিল হিন্দু। হিন্দুর প্রথম পুত্রের নাম ছিল পুরুব, দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিল বঙ্গ। এই বঙ্গ থেকেই বাঙ্গলা এবং হাজার হাজার বছর পর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে নামকরণ হয়েছে বাংলাদেশ। পুরুব হিন্দুস্থানের প্রথম রাজা হন। পুরুবের বংশে রাজা যুধিষ্ঠির জন্ম হয়। যুধিষ্ঠির চার হাজার বছর পর পৃথ্বিরায় জন্মগ্রহণ করেন। হিন্দু’র নামানুসারে ‘হিন্দুস্থান’ আর ভরত রায়ের নামানুসারে ‘ভারত’ এবং বঙ্গ’র নামানুসারে ‘বঙ্গ’ বা ‘বাঙ্গলা’ এবং ‘বাঙালি জাতিসত্ত্বার সৃষ্টি হয়েছে (মুসলিম ইতিহাস গ্রন্থ, ‘তোয়ারিখ ফেরেস্তা’)। ভারতবর্ষে হিন্দুস্থান এবং বঙ্গস্থানের আদিবাসী হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্ঠান, ইহুদি, শীখ সকলেই হযরত নুহু (আ) এর নাতি ‘হিন্দু’র পরিবারের সদস্য।

বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহ বহুজাতিক জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে গঠিত। ইংরেজী নেশন বাক্যটি বহুল ব্যবহৃত একটি মাত্রিক বাক্য। জনগোষ্ঠী হলো, নেশন এর অন্যতম ভিত্তি। নেশন এর সমষ্টিগত ভিত্তি হলো, জনগোষ্ঠী। জনগোষ্ঠী হলো, ‘বংশ, ভাষা, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি’ ইত্যাদির সংমিশ্রণ। নেশন থেকে ন্যাশনালিটির উৎপত্তি। ন্যাশনালিটির অর্থ হলো, ‘জাতীয়তা’। জাতীয়তা হলো, কোনো জাতির সদস্যতা। ফরাসি বিপ্লবের পর জাতীয়তার সংজ্ঞা ব্যাপকতালাভ করেছে। ফরাসি অভিধানে নেশন বাক্যটির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘নেশন হলো এমন মানব সমাজ যা একই ভূখন্ডে বসবাস করে, যাদের মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক ঐক্য’। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলেছে, ‘রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ হলো, একটি জাতিগত দলবদ্ধতার চেতনা; বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতি হলো, রাষ্ট্রভিত্তিক; ধর্ম, ভাষা কিংবা অঞ্চল ভিত্তিক নয়’। জাতীয় রাষ্ট্রের আকাঙ্খিত এবং উপার্জিত চেতনাই জাতীয় চেতনা। কৃষ্টির অনেকগুলো উপাদানের মধ্যে একটি হলো, ‘ভাষা’। শুধু একটি উপাদানের উপর ভিত্তি করে জাতীয়তাবাদী চেতনা হয় না। শুধুমাত্র ভাষাগত বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা বাংলাদেশকে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে আবর্তিত করেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে প্রচ্ছন্নভাবে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা বলতে শুধু বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর চেতনাকে বুঝায় না। তন্মধ্যে ভারতের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক চেতনাও পরোক্ষভাবে জড়িত। কোনো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে যদি অন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা বিদ্যমান থাকে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে উভয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে যদি ভারতের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনা বিদ্যমান থাকে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে ভারত তাদের ওই অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত রয়েছে মর্মে উপলব্ধি করতে পারে। তাদের ওই উপলব্ধি অমূলক হবে না। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক দল কিংবা কোনো ব্যক্তিত্ব যদি ভারতের জন্য হুমকিস্বরূপ হয় তাহলে ভারত ওই শক্তি বা ব্যক্তিকে অবদমিত করতে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে, সেটা তাদের জন্য দোষের হবে না, বরোঞ্চ সেটা হবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের অংশ। তারা তাদের সার্বভৌমত্বের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার বিপরীতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক শক্তির প্রতিপক্ষকে প্রচ্ছন্নভাবে সহযোগীতা করতে পারে, যাতে রাজনৈতিকভাবে তাদের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে বিএনপি থেকে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের কাছে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিরাপদ নয়। দেশ রক্ষার জন্যই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে’। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে দেশের সার্বভৌমত্ব কীভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ে বিএনপি থেকে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয় না। কিন্তু বিএনপি তো সার্বভৌমত্বের অস্তিত্ব নিয়ে অমূলক কথা বলতে পারে না। সত্যিই কী আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে? কিন্তু কীভাবে? আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে কোন্ রাষ্ট্রের কারণে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে? বাংলাদেশের সীমান্তে রয়েছে ভারত ও মিয়ানমার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে মিয়ানমারের জন্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। অবশিষ্ট থাকে ভারত। তাহলে কী বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে? ভারত কী মনে করে যে, বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক শক্তি ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চলের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ? অবশ্য ভারত এমন ধারণা পোষণ করতেই পারে। অর্থাৎ ভারতের কোনো অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব যদি বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক চেতনাগত কারণে অরক্ষিত হয় তাহলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বও অরক্ষিত হবে। বিএনপি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে ভারত তাদের বাংলাভাষী অঞ্চলের রাজনৈতিক চেতনার বিষয়ে চিন্তামুক্ত থাকে। কারণ, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার সাথে ভারতের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাশক্তির এক হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। এদিক থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকে। ভারতের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বও সুরক্ষিত থাকবে। সুতরাং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে দুই ধরনের জাতীয়তাবাদী চেতনা বিদ্যমান থাকলে জাতীয় ঐক্য ধ্বংস হয়ে যায়। জনগণ বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিভক্ত জাতি কখনো মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পাড়ে না। বিভেদ-বৈসম্য লেগেই থাকে। এই সুযোগে প্রবল প্রতিবেশী বন্ধু না হয়ে প্রভু হয়ে যায়। তখন ওই প্রভুর সমর্থন পাওয়ার জন্য জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিতে হয়। সীমান্তে নির্বিচারে পাখি শিকারের মতো গুলি করে হত্যাযজ্ঞ চালালে অথবা কোনো আদরের বোনকে হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখলে কিংবা আটক হওয়া কোনো ভাইকে উলঙ্গ করে অমানুষিক নির্যাতন করা হলেও কিছু বলা যায় না।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারী কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি সীমান্তে ১৪ বছরের বোন ফালানিকে ভারতের বিএসএফ গুলি চালিয়ে হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রেখেছিল। ৯ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্ত থেকে আটক হওয়া এক বাংলাদেশী তরুণকে বিএসএফ উলঙ্গ করে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করেছে। ওই উলঙ্গ করা নির্যাতন যখন দেখেছি তখন মনে হয়েছে বিএসএফ বাংলাদেশকে উলঙ্গ করে নির্যাতন করছে। ষোল কোটি বাংলাদেশীকে নির্যাতন করছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলেই বিএসএফ সীমান্তের ওই সব নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে। বিএসএফ যেভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায়, তার জবাবে যদি বাংলাদেশের বিজিবি পাল্টা গুলি চালায়, তাহলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিঃসন্দেহে অরক্ষিত হয়ে পড়বে। ওই হত্যা ও নির্যাতন পর্যালোচনা করলে ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অরক্ষিত হয়ে পড়ে’ বিএনপির ওই কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করা যায়।

পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠীর সাথে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর ভাষাগত আক্ষরিক মিল ছাড়া অন্যকোন মিল নেই। এই ভাষাগত মিলও খুব বেশি দিনের নয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই রাঢ় ও সূক্ষ্ম অঞ্চলের সঙ্গে বঙ্গ অঞ্চলের ভাষা ও কৃষ্টির পার্থক্য ছিল। অখন্ড ভারতে বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শাসনামলে তারা প্রশাসনের সুবিধার্থে রাঢ় অঞ্চলকে যুক্ত করে বাঙালি অঞ্চলের প্রশাসনিক ইউনিট গড়ে তুলেছিল। ১৮৫৪ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষা, ছোট নাগপুর ও আসাম নিয়ে একটি প্রেসিডেন্সি করা হয়েছিল। ওই সীমারেখা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল কৃত্রিম। ওতে কৃষ্টি বা প্রকৃতিগত কিছু ছিল না। ঐতিহ্যগতভাবেই দুই বাংলার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। দুই বাংলার সত্ত্বা দুই ভাগে বিভক্ত। বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর কৃষ্টির সাথে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্টির কোনো মিল নেই। বাংলা সাহিত্যের আদি যুগে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা কিংবা পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠী জাতিতে বাঙালি ছিল না। তারা ছিল ভারতীয়। একমাত্র বাংলা ভাষার আক্ষরিক মিল ছাড়া দুটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর অন্যকোন মিল নেই। মৌখিক বাক্য উচ্চারণ ও আক্ষরিক বাক্য সৃষ্টিতেও অনেক অমিল রয়েছে। তারা গল্পচ্ছলে বলেন, ‘আর দাদা বলবেন না, কলকাতা থেকে বড়দা এসেছিল বৌদিকে নিয়ে, বাজার থেকে আড়াইশ’ ইলিশ এনেছিলুম, আর যা খেলুম না’! এরকম বাক্য প্রয়োগে উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমায় বসবাসকারী সকল জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীকে নিজস্ব জাতীয়তাবাদী চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ওই চেতনা হবে, ‘স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক এলাকা নিয়ে’। বঙ্গ পিতার সন্তান হিসেবেই বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর আদি পরিচয়। স্বাধীন বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয়তাবাদী চেতনাই হবে বঙ্গবাসীর স্বকীয়তার পরিচয়। নিজস্ব জাতীয়তাবাদী চেতনাই হবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে দীর্ঘকালব্যাপী। সকলের চরিত্রগত বৈশিষ্ট, আচার-আচরণ, ধর্ম, ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্পকলা ইত্যাদি হলো এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার বছরের লালিত অমূল্য কৃষ্টি। তবে আমাদের কৃষ্টিতে একটি ঘাটতি ছিল। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ছিল না। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতাও অর্জন করেছি। আমরা এখন পূর্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদী চেতনায় প্রজ্জ্বলিত বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন জাতি। ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন জাতি অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছিল। সুতরাং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের সুরক্ষার স্বার্থেই আমাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদের জন্য ভারতের সাথে মনস্তাত্ত্বিক বিমূর্ত বৈরী সম্পর্ক জিইয়ে রাখার মধ্যে আমাদের ক্ষতি ছাড়া কোনো কল্যাণ নেই।

সাত দফা ভিত্তিক চুক্তির মধ্য দিয়ে ভারত আমাদের সাথে একাকার হয়ে থাকতে চেয়েছিল। সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে বাংলাদেশের জনগণের সাথে একাকার হয়ে থাকার ওই প্রত্যাশা ভারী সুন্দর। এ ধরনের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে দু’পক্ষেরই শুভ সম্মতি থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে যদি কোনপক্ষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনকিছু চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে তা পূরণ হয় না। বঙ্গবন্ধু সাত দফা ভিত্তিক চুক্তি বাতিল করায় ভারতের ওই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এককভাবে চুক্তি বাতিল হওয়ায় ভারত তা অসম্মানজনক মনে করতেই পারে। ভারতের সম্মানে আঘাত লাগতেই পারে। নিশ্চয়ই ভারত বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এমনটা আশা করেনি। কারণ নিজ সন্তানকে বাঁচাতে পিতা-মাতা যা-যা করে থাকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত তাই করেছিল। কিন্তু সন্তান বিপদমুক্ত হয়ে অবাধ্য ও অকৃতজ্ঞ হবে তা হয় না। কিন্তু সন্তানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনকিছু চাপিয়ে দেয়াও যথার্থ নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান থাকবে চির অম্লান, চির অক্ষয়, চির অব্যয় বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় কোটরে।

ভারতের ওই মনোকষ্ট এবং বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক প্রভাবের মনস্তাত্ত্বিক শঙ্কাকে জিইয়ে রাখার কোনো অবকাশ নেই। ভারতের সাথে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর বিন্দুমাত্র বৈরী বিষয় জিইয়ে রাখা সুখের নয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলেদেশ হলো, ভারতের দেহাভ্যন্তরে অবস্থিত। বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে যেমন মানবদেহ গঠিত। তেমনি বিভিন্ন ভূঅঞ্চল নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। বাংলাদেশের ভূখন্ড তেমনি ভাবে ভারতের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরই অংশ। মানব-দেহের কোনো একটি অঙ্গে যদি কোনো একটি ক্ষতের সৃষ্টি হয় তাহলে সর্বাঙ্গেই সে ব্যথা অনুভূত হয়। বাংলাদেশ যদি রাজনৈতিকভাবে অস্থিরতার মধ্যে আবর্তিত থাকে, সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যদি আঘাতে আঘাতে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে ক্ষতবিক্ষত করতেই থাকে আর বাংলাদেশ যদি ওই অপশক্তির রাজনীতি নিষিদ্ধ করে আর ওই অপশক্তি যদি আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে বিন লাদেন কিংবা আফগানিস্তানের মোল্লা ওমরের মতো তালেবান যোদ্ধা সৃষ্টি করে কিংবা সাম্প্রতিক মিয়ানমার যে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে নিধন করছে, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করছে, রোহিঙ্গাদের কেন্দ্র করে মিয়ানমার যে যুদ্ধংদেহি স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে, বারবার যুদ্ধের পাঁয়তারা করছে, এমতাবস্থায় যদি মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধ লেগে যায় এবং এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যদি বিদেশি শক্তি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় সামরিক শক্তির অপব্যবহার করে তখন ভারত যে খুব একটা লাভবান হবে এমনটি ভাবার কোনো অবকাশ নেই। ভারতই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। যেমন, ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশের ইস্ট-ইন্ডিয়া কম্পানী শুধু বাংলা দখল করেনি, তারা দিল্লীও দখল করেছিল এবং ব্রিটিশ রাজত্ব কায়েম করেছিল। ১৯৯১ সালে ইরাক ও কুয়েতের যুদ্ধে ইরাকেরই বেশি ক্ষতি হয়েছিল। এছাড়া দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিদেশি পরাশক্তির টার্গেট ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশ নয়, তাদের টার্গেট ভারত। ইস্ট-ইন্ডিয়া কম্পানীর টার্গেট বাংলা ছিল না, তাদের টার্গেট ছিল সমগ্র ভারত। এটা ভারতের বুঝতে হবে। বর্তমান যুদ্ধের প্রকৃতি অত্যন্ত ভয়্কর এবং অসহনীয় নৃশংস হয়। এ যুদ্ধে বাংলাদেশের হারানোর কিছু নেই। বাংলাদেশ ছোট একটি রাষ্ট্র আর এর জনসংখ্যা হলো সাড়ে ষোল কোটি। সাড়ে ষোল কোটি মানুষ হত্যা করে এ ছোট্ট রাষ্ট্রটি দখল করে বিদেশিদের তেমন একটা লাভ হবে না। তার চেয়ে এ উসিলায় বড় দেশ ভারত আক্রমন করলে তাদের অনেক লাভ হবে, এটা যে তারা বুঝে না এমন নয়, অবশ্যই তারা ভালোভাবে বুঝেন। এসব অশুভ পরিস্থিতি হলে ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের অপুরণীয় ক্ষতিসাধিত হবে। সুতরাং এসব বিবেচনা করেই ভারত ও বাংলাদেশকে আগামীর পথে অগ্রসর হতে হবে।

১৯৮৪ সালে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তখন ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের অমৃতসরে অবস্থিত শিখ স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে শিখ ধর্মীয় নেতা ভিন্দ্রানওয়ালে নিহত হন। একই বছর ৩০ অক্টোবর অত্যন্ত বিশ্বস্ত দু’জন শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হন। বিন লাদেনকে যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছিল তারাই বিন লাদেনের দ্বারা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সুতরাং ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের জনগোষ্ঠীর সুখ-শান্তি চিরঞ্জিব করার লক্ষ্যে, আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার বিষয়ে ভারতীয় ওই মনস্তাত্ত্বিক শঙ্কার অবসান করতে হবে। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদী চেতনা নির্দিষ্ট করতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশে পঁচাত্তরের কলঙ্কিত ঘটনা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংঘাত চলতেই থাকবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর জাতীয় ঐক্য, উন্নয়ন, জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভারত কর্তৃক অভিন্ন নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণ, তিস্তা ও গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া, জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকার প্রশ্নে সংশয় থেকেই যাবে।

লেখক : ড. সুফি সাগর সামস্, রাজণতিবিদ, প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব, বাংলাদেশ মানবতাবাদী দল (বিএইচপি), e-mail : humannationlism@gamil.com, facebook : @bhpforpeople, phone : 01771-027094

(টুডে সংবাদ/তমাল)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com