মিয়ানমারে গণহত্যা না জাতিগত নিধন?

অনলাইন ডেস্ক : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযানকে কেউ বলছেন গণহত্যা, কেউবা বলছেন জাতিগত নিধন। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা নানা মত দিয়েছেন। গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের মধ্যে পার্থক্য আসলে কী? কেন এভাবে বলা হচ্ছে?

কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ মার্ক কারস্টেন বলেন, এই শব্দগুচ্ছ দুটি প্রায় অভিন্ন অর্থ বহন করে। কখনো কখনো যেসব কারণে গণহত্যা সংঘটিত হয়, একই কারণে জাতিগত নিধনও হয়ে থাকে। তিনি বলেন, গণহত্যা একটি নির্দিষ্ট দলকে ধ্বংস করার চেষ্টা। জাতিসংঘের গণহত্যা প্রতিরোধ কনভেনশন ১৯৫১ সালে কার্যকর হয়। সেখানে বলা হয়, জাতীয়তা, জাতিগত পরিচয়, বর্ণ ও ধর্মের ওপর ভিত্তি করে একটি গোষ্ঠীকে ‘পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার ইচ্ছায়’ সংঘটিত হত্যাই গণহত্যা। কারস্টেন সংশয় প্রকাশ করে বলেন, এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের হত্যাকে গণহত্যা হিসেবে প্রমাণ ও বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতিগত নিধন একটি বিশেষ অঞ্চল থেকে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অপসারণের চেয়ে ঢের বেশি। এ ধরনের নিধন সীমান্ত এলাকাগুলোতে বেশি হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র তাদের অবাঞ্ছিত জনগোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করে। তিনি বলেন, ‘জাতিগত নিধনের ফলে কোন গোষ্ঠীর পুরো জনসংখ্যা বা আংশিক নিশ্চিহ্ন হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনে জাতিগত নিধন অপরাধমূলক অভিযোগ নয়। ১৯৯০ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়া ভাঙার সময় এই শব্দগুচ্ছ প্রথম ব্যবহার হয়। সে সময় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর জোরপূর্বক অপসারণসহ নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে জাতিগত নিধন প্রপঞ্চটি ব্যবহার করা হয়। ২০০৫ সালে জাতিসংঘের বিশ্ব সম্মেলনে প্রথম বারের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার সঙ্গে জাতিগত নিধন শব্দগুচ্ছ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, নিজস্ব জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য এই চারটি অপরাধ প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

তাহলে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ কী?
মিয়ানমার বলছে, তারা রোহিঙ্গা জঙ্গিদের দমনে ‘অপারেশন’ চালাচ্ছে। ২৫ আগস্ট ৩০টি পুলিশ পোস্টে রোহিঙ্গাদের সমন্বিত হামলার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা গ্রামে পরিচালিত সেনা অভিযানকে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ হিসেবে উল্লেখ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা করা হয়। পালায়নপর রোহিঙ্গাদের ওপর মর্টারের গোলা ছোড়া হয়। মেশিনগানের গুলি ছোড়া হয়। পুড়িয়ে ফেলা হয় তাদের বাড়িঘর। এ সম্পর্কে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্টিফেন র‍্যাপ এএফপিকে বলেন, ‘আমরা যাকে জাতিগত নিধন বলছি, তা আসলে মানবতাবিরোধী অপরাধ।’ এই হত্যাকে তিনি ‘বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত হামলা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
বিলুপ্ত যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতে বলা হয়, কিছু হত্যার কারণে অন্য কেউ যদি কোনো অঞ্চল ত্যাগ করে, তবে তা গণহত্যা বলে বিবেচিত হবে না। শুধু ১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিকা ‘গণহত্যায়’ এটি দেখা যায়। সেখানে প্রায় আট হাজার বসনীয় পরিবারের বিচ্ছিন্ন মুসলিম পুরুষ ও ছেলেদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারা হয়।
রোহিঙ্গা হত্যায় কি কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হবে?
মিয়ানমার রোম স্ট্যাচুতে স্বাক্ষর করেনি। যা হেগের একমাত্র স্থায়ী আন্তর্জাতিক আদালতের (আইসিসি) অনুমোদন দেয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ এশিয়ার সামান্য কয়েকটি দেশ এটিতে স্বাক্ষর করেছে।
আইসিসি কি এই অপরাধের বিচার করতে পারবে?
হেগ ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল জাস্টিসের ফেলো র‍্যাপ বলেন, এই অপরাধের কোনো অংশ যদি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়, শুধু সে ক্ষেত্রেই এটি আইসিসিতে বিচার করা সম্ভব হবে। যদি মিয়ানমারের সেনারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনে অংশ নেয়, শুধু সে ক্ষেত্রে সম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞরা অন্য একটি বিকল্প রয়েছে বলে মনে করেন। তা হলো যদি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ ঘটনাকে পশ্চিম সুদানের দারফুরে ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো কোনো ঘটনা হিসেবে সুপারিশ করে, সেখানেও সম্ভাব্য বাধা রয়েছে। বিচার বিশেষজ্ঞ র‍্যাপ মনে করেন, এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে চীন তার বিরোধিতা করতে পারে। বর্তমান মিয়ানমারে মার্কিন বিনিয়োগ রয়েছে। তাই আইসিসি এ ধরনের সুপারিশ পাঠাবে বলে মনে হয় না।
এএফপি অবলম্বনে তরিকুল ইসলাম

(টুডে সংবাদ/তমাল)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com