বাজিতপুরে কমিটিহীন ২১ বছর, ক্ষোভ থেকে কোন্দল

সুমন মোল্লা : কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ ২১ বছর ধরে চলছে একটি আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। এই সময়ে তিন দফায় আহ্বায়ক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু কেউই পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেননি। এ নিয়ে নেতা-কর্মীদের হতাশা-ক্ষোভ এখন প্রকাশ্য কোন্দলে রূপ নিয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয় ১৯৯২ সালের শুরুর দিকে। ওই কমিটিতে সাবেক পৌর মেয়র মিজবাহ উদ্দিন আহমেদ সভাপতি ও আইনজীবী আবদুর রহমান সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিন বছর মেয়াদি কমিটি ছিল সাড়ে চার বছর; ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। ওই কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনজন আহ্বায়ক বাজিতপুর আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

বর্তমানে স্থানীয় সাংসদ মো. আফজাল হোসেন আহ্বায়ক পদে রয়েছেন। তাঁর প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে আছেন সাবেক সাংসদ মঞ্জুর আহমেদ, জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আলাউল হক, সহসভাপতি শেখ নুরুন্নবী, জেলা কৃষক লীগের সহসভাপতি ফারুক আহমেদ ও যুবলীগ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সাবেক সদস্য রফিকুল ইসলাম। সাংসদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ তাঁদের।

ফারুক আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ এখন শক্তিশালী ক্ষমতাসীন দল। ক্ষমতায় শক্তিশালী হলেও সাংগঠনিক দিক দিয়ে বাজিতপুরে অন্তঃসারশূন্য দলে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে মূল কারণ দুটি—দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকা এবং আওয়ামী লীগ এখানে সাংসদের ‘মাইম্যান’ দলে পরিণত হওয়া।

সাংসদ আফজাল হোসেন অবশ্য প্রতিপক্ষের এসব অভিযোগ মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগ থেকে আমি কমিটি করার চেষ্টা চালিয়ে আসছি। কিন্তু জেলা কমিটি না থাকায় তা করা হয়নি। এখন জেলা কমিটি হয়েছে। তবে এই সময়টা নির্বাচনী সময়। এই অবস্থায় কমিটি করা কঠিন।’

গত সোমবার বাজিতপুরে গিয়ে কথা হয় স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীর সঙ্গে। তাঁরা বলছেন, বাজিতপুরে আওয়ামী লীগ কখনো খুব বেশি স্বাভাবিক ও সঠিক পথে এগোতে পারেনি। নেতৃত্বের কোন্দল ও প্রভাবশালী জ্যেষ্ঠ নেতাদের কলকাঠি নাড়ার কারণে দল এখানে উপধারায় বিভক্ত হয়ে থাকে। কমিটি করতে না পারার পেছনে মূল কারণ এটাই।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বাজিতপুর আওয়ামী লীগের বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির পথচলা শুরু ১৯৯৬ সাল থেকে। তখন আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন বিলুপ্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান। কথা ছিল, আহ্বায়ক কমিটি দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেবে। কিন্তু আবদুর রহমান ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকলেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি আর উপহার দিতে পারেননি।

তবে ওই ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন আবদুর রহমান। তিনি এ জন্য দায়ী করেন পদপ্রত্যাশীদের অতিমাত্রায় স্বার্থপরতা ও নাছোড়বান্দা মনোভাবকে।

আবদুর রহমান আহ্বায়কের পদ ছাড়লেও কমিটি আর বিলুপ্ত করা হয়নি। শুধু শেখ নুরুন্নবীকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয়। নুরুন্নবী প্রায় এক যুগ এ পদে থাকলেও ফল সেই একই। সর্বশেষ ২০১২ সালের মাঝামাঝিতে নুরুন্নবীকে সরিয়ে সাংসদ আফজালকে আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে হিসাবে সাংসদের জামানায়ও ওই আহ্বায়ক কমিটি চার বছর পার করে ফেলেছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে শুরু থেকেই তাঁর দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে পদপ্রত্যাশীদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। ক্ষোভের প্রকাশ্য রূপ হিসেবে এখন বাজিতপুরে সাংসদের প্রতিপক্ষ ধারা তৈরি হয়ে গেছে।

বিরোধীবলয় সম্পর্কে সাংসদ আফজাল হোসেনের বক্তব্য হলো, যাঁরা মূল দলের বাইরে গিয়ে রাজনীতি করছেন, প্রথমত তাঁরা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছেন। একই সঙ্গে বিএনপির ফাঁদে পা দিচ্ছেন। তাঁদের তিনি জনবিচ্ছিন্ন হিসেবে আখ্যা দেন।

সাংসদের প্রতিপক্ষবলয়টি গত রমজান মাসে পুরো উপজেলায় ১২টি ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। এসব কর্মসূচি সম্পন্ন হয় সাবেক সাংসদ মঞ্জুর আহমেদের সভাপতিত্বে। এ পক্ষটি ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে গণভোজের আয়োজন করে। ৮ সেপ্টেম্বর করে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। এ দুই কর্মসূচিতে শেখ নুরুন্নবী সভাপতিত্ব করেন। এসব আয়োজনে সাংগঠনিক কথাবার্তার চেয়ে সাংসদ আফজালবিরোধী বার্তাই বেশি দেওয়া হচ্ছে।

নতুন বলয়ের বিষয়ে শেখ নুরুন্নবী বলেন, দল পরিচালনায় সাংসদ যেভাবে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছেন, তা আর সহ্য করার মতো ছিল না।

২১ বছরেও বাজিতপুরে কমিটি করতে না পারার জন্য কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ আফজল নিজেদের মধ্যে বিবাদ ও নিজ উপজেলার বাইরের নেতাদের প্রভাবকে দায়ী করছেন। বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে অনেক কথা। বলে শেষ করা যাবে না। এত ঘটনা থাকলে কমিটি হয় কীভাবে?’

(টুডে সংবাদ/তমাল)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com