নিরেপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে : ড. কামাল

নিজস্ব প্রতিবেদক : নিরপেক্ষ সরকার ও প্রশাসনের অধীন নির্বাচন চেয়েছে গণফোরাম। এ লক্ষ্যে দলটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা পরিবর্তন করে ১৯৯১ সালের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী নির্বাচনকালে সশস্ত্র বাহিনী এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার যে এখতিয়ার ছিল, তা পুনর্বহাল করাসহ ২২ দফা প্রস্তাব দিয়েছে।

আজ বুধবার বিকেলে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে গণফোরামের সভাপতি ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন এ প্রস্তাব দেন।

২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনীকে বাদ দেওয়া হয়। এখন নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় আছে পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও কোস্টগার্ড।

পরে গণফোরামের সভাপতি সাংবাদিকদের বলেন, ‘গণফোরাম সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। এর জন্য নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ সরকার ও প্রশাসন থাকতে হবে। এর জন্য ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হয়েছিল। দলীয় সরকার থাকলে যে কী সমস্যা হয়, তা আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরেছি। এটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য চ্যালেঞ্জ।’

এর আগে সকালে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয় গণফ্রন্ট। দলটি সংবিধান সংশোধন করে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।

বেলা সোয়া তিনটায় কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গণফোরামের নয় সদস্যের প্রতিনিধিদল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে সংলাপ করেন। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাসহ পাঁচ নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টার সংলাপ শেষে কামাল হোসেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

সাংবিধানিকভাবে তো নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচন সম্ভব নয়, দলীয় সরকারের অধীন নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব মনে করেন কি? এমন প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে দেশ চললে প্রশাসনের নিরপেক্ষ হওয়ার কথা। নির্বাচন যদি সুষ্ঠু করতে হয়, প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। বাস্তবে সেটা তো হচ্ছে না। নির্বাচনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের অনেক প্রস্তাব আছে।’

ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘দুই এমপির (মানি পাওয়ার অ্যান্ড মাসল পাওয়ার) জন্য সংসদীয় গণতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে। নির্বাচনে কীভাবে দুই এমপি থেকে বাঁচা যায়, সরকারের ক্ষমতা কীভাবে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, সেসব কথা আমরা কমিশনকে বলেছি। আমরা দেখেছি, নির্বাচন কমিশন আমাদের প্রস্তাবগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে।’

সংবিধানের এই অন্যতম প্রণেতা বলেন, নির্বাচনের জন্য সুস্থ রাজনীতি দরকার। বিভাজনের রাজনীতি তা নষ্ট করে। সংবিধানের যে মূল্যবোধ, তাতে গণতন্ত্র থাকবে, আইনের শাসন থাকবে, নাগরিকের মৌলিক অধিকার থাকবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকবে—এসব নিয়ে কোনো বিভাজন থাকবে না।

গণফোরামের লিখিত প্রস্তাব

লিখিত প্রস্তাবে গণফোরাম বলেছে, নির্বাচনের নিরাপত্তা বিধান ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্বাচন কমিশনে ন্যস্ত করতে হবে এবং তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের থাকবে। নির্বাচন পরিচালনার জন্য নিয়োগকৃত প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং কর্মকর্তাদের তালিকা নির্বাচনের ১৫ দিন আগে প্রার্থীদের সরবরাহ করতে হবে, যাতে এ বিষয়ে কোনো আপত্তি উপস্থাপিত হলে তা নির্বাচনের আগে নিষ্পত্তি করা যায়।

এ ছাড়া ভোটার তালিকা প্রণয়নে পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা, প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি এবং তাদের ভোট প্রদানের ব্যবস্থা করা, নির্বাচনী এলাকায় সর্বদলীয় পর্যবেক্ষক দল গঠন করা, নির্বাচনের ছয় মাস আগে স্থানীয় পর্যবেক্ষক দলের তালিকা প্রণয়ন এবং ভোটের এক মাস আগে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলের তালিকা প্রকাশ ও তাদের কার্যপরিধিও নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব করেছে গণফোরাম।

লিখিত প্রস্তাবে গণফোরাম আরও বলেছে, নির্বাচনে ধর্মের সব অপব্যবহার, সাম্প্রদায়িক প্রচার প্রচারণা ও ভোট চাওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতাকারী যুদ্ধাপরাধী হলে কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের সঙ্গে তার নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণ, কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর স্বার্থ জড়িত আছে কি না, সে সম্পর্কে হলফনামাযুক্ত বিবরণ দিতে হবে। নির্বাচনী কাজে আয়-ব্যয়ের হিসাব নির্বাচনের এক মাসের মধ্যে কমিশনের কাছে জমা দিতে হবে এবং তা করতে না পারলে নির্বাচন বাতিল করতে হবে। নির্বাচন ট্রাইব্যুনালের মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা এবং এ-সংক্রান্ত আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বেঞ্চ কর্তৃক তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এ বিষয়ে কমিশনকে নিজে পক্ষভুক্ত হয়ে মামলার নিষ্পত্তির ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ছাড়া গণফোরাম মনে করে, জনসংখ্যার ভিত্তিতে নয়, যোগাযোগ, যাতায়াতব্যবস্থা, নদ-নদীর অবস্থা, চর বা পাহাড়ি দুর্গম এলাকা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা সমীচীন।

সংলাপে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে গণফোরামের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে অংশ নেন মফিদুল ইসলাম খান, সুব্রত চৌধুরী, আলতাফ হোসেন, মোশতাক আহমেদ প্রমুখ। দলের মহাসচিব মোস্তফা মহসীন মন্টু সংলাপে যাননি।

গণফ্রন্ট: গণফ্রন্টের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের প্রতিনিধি সংলাপে অংশ নেন। দলটি ভোট গ্রহণে সেনা মোতায়েন, ইভিএম চালু, ধর্মবিরোধী দলের নিবন্ধন বাতিল, সংসদীয় আসন আরও ১০০ থেকে ১৫০টি বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে।

(টুডে সংবাদ/তমাল)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com