তীব্র স্রোত, পারাপারের কষ্টে বিড়ম্বনা ভিআইপি

কমল জোহা খান :  এমনিতেই নদীর তীব্র স্রোত ঠেলে ফেরি পারাপারে চলছে এক যুদ্ধ, তার ওপর ভিআইপিদের জন্য অপেক্ষা করা বাড়তি বিড়ম্বনা যোগ করেছে। এতে ফেরি পারাপারে যাত্রী ও যানবাহনের চালকদের পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। গতকাল সোমবার মানিকগঞ্জে পাটুরিয়ায় ফেরিঘাটে গিয়ে এই পরিস্থিতি দেখা যায়।

পাটুরিয়ায় ফুলেফেঁপে রয়েছে প্রমত্তা পদ্মা-যমুনা নদী। দেখে মনে হবে, আরেকটু হলেই দুই পারে থাকা ঘরবাড়ি সব গিলে ফেলবে। বিশাল নদীগুলোর ফুলেফেঁপে ওঠার কারণ, উত্তরাঞ্চলে বন্যার পানির ঢল এখন চলে এসেছে দেশের মধ্যাঞ্চলে। আর পাটুরিয়ার কিছু দূরে আরিচায় দুটি নদীর মিলন ঘটায় স্রোতের তীব্রতা আরও বেশি।

পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে প্রতিদিন হাজারো যানবাহন চলাচল করে থাকে। এসব যানবাহনের একমাত্র ভরসা এই ঘাট দুটিতে থাকা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) ছোট-বড় ১৯টি ফেরি। কিন্তু বর্ষার পানিতে ভয়াল রূপ নেওয়ায় দুটি নদীর স্রোতের কাছে অসহায় এই ফেরিগুলো। এদের পক্ষে পদ্মা-যমুনার প্রচণ্ড স্রোত ঠেলে এপার-ওপার করা এখন অনেকটাই দুরূহ। নদীর স্বাভাবিক অবস্থায় আগে একবার পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া যেতে একটি ফেরির সময় যেত ৪৫ মিনিট। ফিরে আসতে মাত্র আধা ঘণ্টা। বর্তমানে সেখানে চলে যাচ্ছে ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট। আর ফিরতে ৪৫ মিনিট। সে কারণে ঢাকাসহ দেশের মধ্যাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে চলাচল করতে প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগছে। অনেক সময় স্রোতের তীব্রতায় কুলিয়ে উঠতে না পেরে অনেক ফেরিকে মাঝনদী থেকে ফিরে আসতে হচ্ছে ঘাটে।

বিআইডব্লিউটিসির তথ্য অনুযায়ী, পারাপারে দীর্ঘ সময় চলে যাওয়ায় এখানে ফেরি চলাচল প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে।

তাই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে আসন্ন কোরবানির ঈদের সময় ঘুরমুখী মানুষের বিড়ম্বনা বা দুর্ভোগের মাত্রা বেড়ে যাবে বহু গুণ।

তবে জানা গেছে, পাটুরিয়ায় পদ্মা-যমুনার প্রবল স্রোত বিড়ম্বনার একমাত্র কারণ নয়। বিআইডব্লিউটিসির ঘাট-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা জানান, অব্যবস্থাপনা, ফেরিগুলো পুরোনো হয়ে যাওয়া, বিশেষ শ্রেণির যাত্রীদের (ভিআইপি) প্রাধান্য দেওয়ার কারণে নদী পারাপারে দেরি হয়। এর ধকল পোহাতে হয় সাধারণ যাত্রীদের।

গতকাল পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বেলা একটার দিকে সেখানে যানবাহনের যানবাহনের লাইন ছিল মাত্র এক কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৫০টি যাত্রীবাহী বাস, অল্প কিছু ট্রাক আর কয়েকটি প্রাইভেট কার। তবে ঘাটে আসার পর ফেরিতে ওঠা পর্যন্ত এসব যানবাহনের সময় চলে যাচ্ছে প্রায় দুই ঘণ্টা। যানবাহনের চাপ বাড়লে সময় আরও বেশি চলে যাচ্ছে।

শৌখিন পরিবহনের যাত্রী ওমর ফারুক বলেন, ব্যবসার কাজে প্রতি সপ্তাহে তাঁর ঢাকা থেকে যশোর আসা-যাওয়া করতে হয়। আগে যশোর যেতে সময় যেত ছয় ঘণ্টা। এখন লাগছে নয় ঘণ্টারও বেশি।

পাটুরিয়ায় ফুলেফেঁপে রয়েছে প্রমত্তা পদ্মা-যমুনা নদী। প্রবল স্রোত কেটে এগিয়ে যেতে বেগ পেতে হচ্ছে পুরোনো ফেরিগুলোকে। ছবিটি গতকাল সোমবার দুপুরে পাটুরিয়ায় ফেরিঘাট এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আবদুস সালাম

ঘাটে বসে কথা হয় গোল্ডেন লাইন নামের একটি বাসের চালক মো. মিলনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঢাকা-ফরিদপুর রুটে প্রতিদিন এক ট্রিপ দেন তিনি। আগে নয় ঘণ্টায় ঢাকা-ফরিদপুরে একবার আসা-যাওয়া করা যেত। এখন একবার যেতেই সময় যাচ্ছে আট ঘণ্টা। এর মধ্যে ফেরিঘাটেই বসে থাকতে হয় কমপক্ষে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। নদী পার হতে লাগে দ্বিগুণ সময়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাকচালক বলেন, অনেক সময় ইচ্ছে করে ফেরি ধীরগতিতে চালানো হয়। এতে করে ঘাটে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। তখন একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতারা ঘাট-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মিলে বাড়তি টাকা নিয়ে যানবাহনগুলো থেকে ফেরিতে উঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। অনেক ক্ষেত্রে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে একটি বাস, ট্রাক বা প্রাইভেট কারকে ভিআইপি সুবিধা দিয়ে ফেরিতে তুলে দেওয়া হয়। তা না হলে ১৬টি ফেরি সচল থাকার পরও ঘাটে কেন সব সময় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে?

এ প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় বিআইডব্লিউটিসির পাটুরিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক খোন্দকার মো. তানভীর হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে মোট ১৯টি ফেরি রয়েছে। এর মধ্যে এখন সচল ১৬টি। এসব ফেরির মধ্যে ৮টি রো রো, ৬টি ইউটিলিটি ও ২টি কে টাইপের ফেরি রয়েছে। একটি রো রো ফেরিতে একসঙ্গে ১২টি বড় বাস অথবা ১৮টি ট্রাক অথবা ৫০টি প্রাইভেট কার বহন করা যায়। ইউটিলিটি বা কে টাইপের একটি ফেরিতে একসঙ্গে ৬টি বাস অথবা ৮টি ট্রাক অথবা ২০টি প্রাইভেট কার পার করানো যায়। সেই হিসাবে ১৪৪টি বাস কিংবা ২০৮ ট্রাক অথবা ৪৬০টি প্রাইভেট কার প্রতি ঘণ্টায় পারাপার করানোর ক্ষমতা বিআইডব্লিউটিসির ফেরিগুলোর রয়েছে।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান নামের ফেরিটি মেরামত করা হচ্ছে। ছবিটি গতকাল সোমবার দুপুরে পাটুরিয়ায় ফেরিঘাট এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আবদুস সালাম

কিন্তু রো রো টাইপের বড় ফেরিগুলোকে নিয়ে বিপত্তিতে পড়তে হয় জানিয়ে তানভীর হোসেন বলেন, নদীর প্রচণ্ড স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে পারে না বড় ফেরিগুলো। কারণ, বড় ৭টি ফেরিই বেশ পুরোনো হয়ে গেছে। আমানত শাহ ও হজরত শাহজালাল নামের দুটি ফেরি ১৯৮২ সালে তৈরি। এগুলোর বয়স বর্তমানে ৩৫ বছর পেরিয়ে গেছে। অন্য পাঁচটি ফেরির গড় বয়স ২৫ বছর। একমাত্র গোলাম মওলা ফেরিটির বয়স মাত্র তিন বছর।

বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানায়, ছোট ফেরিগুলোর তো ধারণক্ষমতা প্রায় অর্ধেক। ফেরি আকার বড়-ছোট যা-ই হোক না কেন, পদ্মা-যমুনার মতো অস্থির নদীতে বিরামহীন চলাচলে ফেরিগুলোর কার্যক্ষমতাও দ্রুত কমে যায়।

তানভীর হোসেন বলেন, কপোতী নামের ফেরিটি স্রোতের বাধায় ১৯ আগস্ট বিকেলে মাঝনদী থেকে যানবাহন নিয়ে পাটুরিয়া ঘাটে ফিরে এসেছে। চার-পাঁচ দিন আগে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান একইভাবে ঘাটে ফিরে আসে। স্রোতের কারণে এটি এখন চলাচল করতে পারছে না। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের মেরামতের কাজ চলছে। এসব ফেরি ঈদের আগে বহনযোগ্য হওয়ার আশা করছেন তিনি। নদীর পানি যদি কমতে থাকে, তাহলে ঈদের সময় যানবাহনের চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

তবে পানি কমে গেলেও বিপত্তি থেকে রক্ষা নেই বলে জানান মাধবীলতা নামের এক ফেরিচালক সাইদুর রহমান। ফেরি চালানোর সময় তিনি বলেন, ‘আপনি দেখেন আমরা নদীতে স্রোত থাকায় ফেরি সরাসরি দৌলতদিয়া ঘাটে নিয়ে যেতে পারছি না। বিশেষ করে দৌলতদিয়া যেতে সময় বেশি সময় লাগে।’

উত্তর দিক থেকে যমুনা আর উত্তর-পূর্ব দিক থেকে পদ্মার স্রোত আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, দুই নদীর স্রোতের বিপরীত যেতে ফেরিকে প্রায় চার কিলোমিটার তীর ঘেঁষে উত্তর দিকে আনতে হচ্ছে। তারপর স্রোতের টানে নিয়ে যেতে হয় দৌলতদিয়া ঘাটে। এতে পার হতে সময়ও বেশি লাগছে, তেল খরচ বেশি হয়। নদী স্বাভাবিক থাকলে প্রতিদিন আসা-যাওয়া প্রায় ৩০ বার করা যেত। এখন ২০ বারের বেশি করা যাচ্ছে না।

ভাষাশহীদ বরকত ফেরিটিও মেরামত করা হচ্ছে। ছবিটি গতকাল সোমবার দুপুরে পাটুরিয়ায় ফেরিঘাট এলাকা থেকে তোলা। ছবি: আবদুস সালাম

পানি কমে গেলে পদ্মা-যমুনায় দ্রুত চর পড়ে যায়—উল্লেখ করে সাইদুর রহমান বলেন, এ মাসে বন্যায় নদীতে স্রোত দেখছেন। পানি কমে গেলে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে চর পড়তে শুরু করবে। তখন বাঁশ দিয়ে নদীর গভীরতা মেপে মেপে ফেরি চালাতে হবে।

ভিআইপিদের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই জানিয়ে বিআইডব্লিউটিসির কয়েকজন কর্মকর্তা ও ফেরিচালক বলেন, প্রতিদিন মন্ত্রী-সচিব থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বড় বড় কর্মকর্তা ফেরিতে ওঠেন তাঁদের গাড়ি নিয়ে। আসার কথা আগে থেকে খবর দেন। তাঁরা না আসা পর্যন্ত ঘাটে ফেরি নিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। আর সবই হয় ওপরের নির্দেশে।

(টুডে সংবাদ/তমাল)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com