দুই বোনের পায়ে শেকল বাঁধা ১৮ বছর (ভিডিওসহ প্রতিবেদন)

শফিক জামান : ভাঙাচোরা টিনের একচালা ঘর। ভেতরে উৎকট গন্ধ। ধুলোবালি আর খড়ের ছড়াছড়ি। ঘরে ঢুকতেই গন্ধে দম আটকে যাওয়ার দশা। এই ঘরেই প্রায় দেড় যুগ (১৮ বছর) ধরে পায়ে শেকল বাঁধা অবস্থায় আটকে আছে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের দুই বোনের জীবন।

পাপড়ির বয়স এখন ৩৩, তাঁর ছোট বোন অনন্যার বয়স ৩০। দেড় যুগ ধরে পায়ে শেকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে তাঁদের। চিকিৎসা আর পুষ্টিহীনতায় দুই বোনের শরীর এখন কঙ্কালসার। হাঁটার শক্তিও হারিয়েছেন ছোট বোন অনন্যা। বড় বোন পাপড়ির স্বপ্ন ছিল বড় শিল্পী হবেন আর ছোট বোন অনন্যার স্বপ্ন ছিল হবেন প্রকৌশলী। বড় বোন পাপড়ি এখনো কাউকে কাছে পেলে গেয়ে যান গান। কথা বলেন সুস্থ মানুষের মতো। আর ছোট বোন অনন্যা হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফ্যাল ফ্যাল চোখে চেয়ে থাকেন।

একসময় অন্য ১০টি শিশুর মতো হেসেখেলে পড়াশোনায় কাটছিল এই দুই বোনের জীবন। ১৯৯৯ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় পাপড়ি আর ২০০১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় অনন্যার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। একপর্যায়ে তাঁরা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। বন্ধ হয়ে যায় লেখাপড়া। সামাজিকভাবে বিব্রত হওয়া থেকে রক্ষা পেতে দুই বোনকে আটকে রাখা হয় ঘরে। পায়ে পরানো হয় শেকল। সেই থেকে শেকলে বাঁধা জীবন তাঁদের। মিলছে না পর্যাপ্ত খাবার ও চিকিৎসা। পুষ্টির অভাবে তাদের শরীর হয়ে উঠেছে কঙ্কালসার। এর মধ্যে বাবা-মাকেও হারিয়েছে দুই বোন। ছোট দুই কিশোর ভাই ছাড়া অভাব-অনটনে অন্ধকার হয়ে আসা এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।

দুই বোনের চাচা আবদুল হাই জানান, মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর দুই বোন প্রায়ই গ্রামের এদিক-সেদিক চলে যেতেন। নিরাপত্তার কথা ভেবে বাধ্য হয়ে ঘরে আটকে রাখতে হতো তাঁদের। অবস্থার অবনতি হলে একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তাঁদের পায়ে শেঁকল পরানো হয়।

পাপড়ি ও অনন্যার ছোট ভাই ১৯ বছরের সম্রাট বলেন, ‘বাবা আবদুল মান্নান পরিসংখ্যান বিভাগে ছোট পদে চাকরি করতেন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে আট বছর অসুস্থ থাকার পর ২০১০ সালে মারা যান তিনি। তখন আমার বয়স ছিল ১২ আর ছোট ভাই পথিকের বয়স ছিল ৮। মা শাহিনা পারভীনও মারা গেছেন ২০১৩ সালে। সামান্য জমি ছাড়া কিছু নেই। ছোট ভাই পথিক এখন নবম শ্রেণিতে পড়ে।’

সম্রাট জানান, জমি থেকে যা পাওয়া যায়, তা দিয়ে চারজনের তিনবেলা খাবার জোটানোই কঠিন। একবেলা খাবার জোটে তো আরেক বেলা জোটে না। জমির কাজ আর রান্নাবান্নাসহ গৃহস্থালির কাজ সবই করতে হয় তাঁকে।

অসহায় কণ্ঠে সম্রাট বলেন, বড় দুই বোনকে শেকলে বাঁধা দেখতে তাঁর কষ্ট হয়। কিন্তু তাঁর করার কিছুই নেই। বোনদের চিকিৎসা করাবেন এমন আর্থিক সামর্থ্য তাঁর নেই।

আদারভিটা হাই স্কুলের শিক্ষিকা সান্তেজা খানম বলেন, ‘পাপড়ি ও অনন্যা দুজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি তারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল। দুই বোনই ভালো গান গাইত ও নাচতে পারত।’

আদারভিটা গ্রামের আরেক স্কুলশিক্ষিকা নাজমা রহমান জানান, পাপড়ির স্বপ্ন ছিল বড় শিল্পী হবেন আর অনন্যার স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হবেন। তাঁদের শেকল বাঁধা জীবন দেখে খুব খারাপ লাগে। যথাযথ চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন এই দুই বোন। ফিরে আসতে পারেন মুক্ত স্বাভাবিক জীবনে। গভীর অন্ধকার থেকে একসময়ের মেধাবী এই দুই বোনকে আলোয় ফিরিয়ে আনতে এগিয়ে আসবে কোনো মানবিক হাত এমন আশা করেন তিনি।

এদিকে, দুই বোনের বন্দি কাহিনীর সংবাদ পেয়ে বিকেলে তাঁদের বাড়ি ছুটে যান জামালপুরের জেলা প্রশাসক মো. শাহাবুদ্দিন খান। তিনি সম্রাট ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলেন।

জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের জানান, খুব শিগগির দুই বোনকে ঢাকায় পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। এ সময় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মাদারগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ড. কামরুজ্জামান ও আদারভিটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলতাফুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন এবং

লেখাটি ভালো লাগলে লাইখ দিন এবং  শেয়ার করুন