পাকিস্তান শুধু জঙ্গিবাদ মোকাবিলাই করছে না, ভারতের বৈরিতাও মোকাবিলা করছে

masiul-alam

সৈয়দা মামুনা রুবাব : বছরজুড়ে কানাঘুষা চলার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লে. জেনারেল আসিফ বাজওয়া যখন টুইট করলেন, জেনারেল রাহিল শরিফ লাহোর থেকে বিদায় সফর শুরু করেছেন, তখন সবাই নিশ্চিত হলো পাকিস্তানের সেনাপ্রধান বিদায় নিচ্ছেন। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে রাহিল শরিফ বলেছিলেন, তিনি চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করবেন না। আবার তাঁকে সে প্রস্তাব দেওয়া হলে তা গ্রহণও করবেন না। কিন্তু তাতেও মানুষের সন্দেহ দূর হয়নি। তাঁর বিদায় সফরের ছবি প্রকাশিত হওয়ার পরই মানুষ নিশ্চিত হলো। আবার গণমাধ্যম ও মানুষকেও দোষ দেওয়া যায় না, কারণ গত ২০ বছরে তারা কোনো সেনাপ্রধানকে সময়মতো অবসর নিতে দেখেনি। এর আগে ১৯৯৬ সালে জেনারেল আবদুল ওয়াহিদ কাকর সময়মতো অবসর নিয়েছিলেন।
সময়মতো বিদায় নিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন। একই সঙ্গে, তিনি এই রীতিটির পুনরুজ্জীবন ঘটালেন। সেনাবাহিনীর পেশাদারি ও ভাবমূর্তি রক্ষায় এটি জরুরি ছিল। পাকিস্তান এমন এক দেশ, সেনাবাহিনী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে এখানে গভীরভাবে জড়িত। এই সিদ্ধান্তের জন্য লোকে তাঁকে মনেও রাখবে। এটাও মনে রাখা দরকার, তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি এমন সময় এই সিদ্ধান্তটা নিলেন, যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী শুধু দেশের ভেতরে জঙ্গিবাদ মোকাবিলাই করছে না, তাকে ভারতের বৈরিতাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তিনি কিছু কাজ করেছেন, আবার কিছু কাজ এড়িয়ে গেছেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে উত্তর ওয়াজিরিস্তানের জার্ব-ই-আজব অভিযান। যদিও এই অভিযানের পরিকল্পনা তাঁর পূর্বসূরির আমলের। কিন্তু তাঁর পূর্বসূরিরা এই ভয়ে অভিযান শুরু করতে পারেননি যে এতে পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডে জঙ্গি হামলা হবে। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে গড়ে প্রতিবছর ৭ হাজার ৩০০ মানুষ সন্ত্রাসী হামলায় মারা গেছে। সরকারও একই ভয়ে অভিযান শুরু করার নির্দেশ দিতে ভয় পাচ্ছিল। কিন্তু রাহিল শরিফ সেই সাহস দেখান। দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তিনি অভিযান শুরু করেন। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার যেমন এক চ্যালেঞ্জ ছিল, তেমনি তার প্রতিক্রিয়া সামলানোও কম ঝামেলা ছিল না। এর পাল্টা হামলা যে হয়নি তা নয়, কিন্তু তার ফলে এ বছর মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৭০০তে নেমে এসেছে, যেটা উল্লিখিত পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক কম।
এই অভিযানের সফলতা সত্ত্বেও কিছু উদ্বেগের কারণ আছে। একটি ব্যাপার হচ্ছে, এই অভিযান পাকিস্তানের মধ্যাঞ্চলে অতটা ব্যাপকভিত্তিক হয়নি, যেটা ভাবা হয়েছিল। এ ছাড়া তালেবান ও এফএটিএভিত্তিক সংগঠনগুলো ছাড়া অন্য যেসব গোষ্ঠী পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদকে চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছে, তাদের গায়ে নাকি টোকাটাও দেওয়া হয়নি। সেই গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান ও সাম্প্রতিক ‘চিরুনি অভিযানের’ সময়ও তাদের স্পর্শ করা হয়নি। এর ফল তো আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। এখন তারা বিদেশি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কথা হচ্ছে, এদের ছাড় দেওয়া বড় রকমের ভুল ছিল, তা কৌশলগত বা তারা এর আওতায় না পড়ার কারণেই হোক। কাজটা আধা খ্যাঁচড়া থেকে গেল। এখন তাঁর উত্তরসূরির প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে এই অভিযান চালিয়ে যাওয়া।
সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের কারণেও রাহিল শরিফের জমানা চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দেশটির ইতিহাসে এই সম্পর্ক কখনোই প্রগাঢ় ছিল না। সব সময়ই দেখা গেছে, এই সম্পর্ক সেনাবাহিনীর দিকেই ঝুঁকে ছিল। রাহিল শরিফের জমানায় এই সম্পর্ক খাদের কিনারে ছিল। এ সময় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে সেনাবাহিনীর প্রভাব বেড়েছে। সরকারকে ছাড় দিতে হয়েছে। কিন্তু তা যতটা না সেনাবাহিনীর চাপের মুখে, তার চেয়ে বেশি সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও ভুল বিচারের কারণে। সরকার বারবার নিজেকে ব্যক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, তা সে পররাষ্ট্র নীতি, জেনারেল মোশাররফের বিচার বা নিরাপত্তাজনিত ব্যাপার যা–ই হোক না কেন। ফলে মানুষ রক্ষাকর্তা হিসেবে জেনারেল রাহিল শরিফের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক সংকট নিরসনেও তাঁকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। পিটিআইয়ের সঙ্গে বৈঠক, ২০১৪ সালের ধরনার পর তাহিরুল কাদরির নেতৃত্ব, পানামা পেপারস ফাঁস—সব ক্ষেত্রেই তিনি উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তবে ধরনার সময় তিনি প্রলোভন উপেক্ষা করেছেন, সে জন্য তাঁর ধন্যবাদ প্রাপ্য। তিনি তখন বিশেষ কিছু করে বসলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতো।
মার্কিন-ইরান সম্পর্ক ও আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় তিনি ভূমিকা পালন করতে পারেননি। এই ব্যর্থতার জন্য শুধু তাঁকে দোষারোপ করা যাবে না, কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তিনিই যেহেতু মূল ভূমিকা পালন করছিলেন, তাই সমালোচনার ভাগীদার তিনি নিজেও।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাঁর ওপর আশা রেখেছিল। তারা তাঁকে ২০১৪ সালে ইউএস লেজিয়ন অব মেরিট পদক দিয়েছিল। এর পরের বছর তাঁকে অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা দেওয়া হয়। এক মার্কিন কূটনীতিকের ভাষ্যমতে, তাঁরা রাহিলকে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হিসেবেই বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু হাক্কানি নেটওয়ার্ক ও তালেবান–বিষয়ক কৌশল প্রণয়ন করে তিনি মার্কিনদের মন জয় করতে পারেননি।
তেহরান ২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তি করার পর পাকিস্তান-ইরান সম্পর্ক নতুন করে শুরু হয়। এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল যে ইসলামাবাদ এটা কাজে লাগাবে। কিন্তু ইরান সম্পর্কে জেনারেলের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে সে নিয়ে আর অগ্রগতি হয়নি। এমনকি তিনি সফররত ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির কাছে কূটনৈতিক রীতি ভঙ্গ করে অভিযোগ করেছিলেন, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং ইরানের মাটি ব্যবহার করছে।
কথা হচ্ছে, রাহিল শরিফ অনেক কাজে হাত দিয়েছিলেন, আবার সেই তিনিই অনেক কিছু অসমাপ্ত রেখে যাচ্ছেন। রাহিলের মিডিয়া ম্যানেজার তাঁকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলেছিলেন। এতে মানুষের আশা বেড়ে গিয়েছিল। সেটা না হলে তাঁকে হয়তো আমরা আরেকটু উঁচু আসনেই বসাতাম।
পাকিস্তানের দ্য ফ্রাইডে টাইমস থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
সৈয়দা মামুনা রুবাব: ইসলামাবাদভিত্তিক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।

(টুডে সংবাদ/তমাল)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন