বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, কার স্বার্থে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে?

masiul-alam

মশিউল আলম : ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার আছে। সাংসদেরা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে বাল্যবিবাহ নিয়ে কথা বলছেন। অনেক সাংসদ তাঁর এলাকায় বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। এসব নানা উদ্যোগের ফলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে।’
এই উৎসাহব্যঞ্জক ভবিষ্যদ্বাণী শোনা গেল জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রতিনিধি আর্জেন্টিনা মাতাভেল পিচ্চিনের কণ্ঠে। তাঁর কথাগুলো ছাপা হয়েছে গত ৩০ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
একই দিনে ছাপা হয়েছে আরেকটি খবর। শরীয়তপুর সদর উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামে পুলিশ সাবিনা আক্তার নামের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করেছে। পুলিশের ধারণা, ওই কিশোরী সম্ভবত আত্মহত্যা করেছে। কারণ, তার পরিবার তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। সে রাজি হচ্ছিল না বলে পরিবারের সদস্যরা তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী, ১৪ বছরের কিশোরীর কোমল মন এতটা পীড়ন সইতে পারেনি; আত্মহত্যাকে সে মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে।
আবার সাবিনার পথে না গিয়ে মা-বাবার অদূরদর্শী ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে বাল্যবিবাহ এড়িয়েছে, এমন কিশোরীও এই বাংলাদেশে আছে। ঝালকাঠির কিশোরী শারমিন আক্তারের সাহসিকতার কাহিনি ইতিমধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মা তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে সে তার এক সহপাঠীর সহযোগিতায় বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছে এবং মাকে গ্রেপ্তার করিয়েছে। যদিও এ ধরনের ঘটনা এই দেশে অত্যন্ত বিরল, যদিও শারমিনের মতো সাহসী কিশোরীর সংখ্যা এ দেশে খুবই কম, তবু এ রকম দু-একটি ঘটনাই গোটা সমাজের মানসিকতা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে দিলে যে তার মঙ্গলের পরিবর্তে স্থায়ী ক্ষতি করা হয়—এই সচেতনতা সৃষ্টির কাজ সবচেয়ে বেশি জরুরি

মানসিকতার পরিবর্তন ইতিমধ্যে যে শুরু হয়েছে, বাল্যবিবাহ যে আর আগের মতো সহজ থাকছে না, তারও কিছু কিছু দৃষ্টান্ত এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যেমন, ২৯ নভেম্বর প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে এ রকম একটা খবর: বর-কনে দুজনই অপ্রাপ্তবয়স্ক; একজনের বয়স ১৫, অন্যজনের ১৭। তাদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক হয়েছে বলে তাদের দুই পরিবার সানন্দে তাদের বিয়ের আয়োজন করছিল। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার এক গ্রামের এই ঘটনার খবর আশপাশের লোকজন জেনে গিয়েছিল। একইভাবে জানতে পারেন ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের ছাত্রী সাহিদা আক্তার। তিনি শ্রীপুর থানায় গিয়ে ঘটনাটি জানান এবং পুলিশের দুই সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে সেই বিয়েবাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন।
না, ধরপাকড় বা মামলা-মোকদ্দমার ঘটনা সেখানে ঘটে না। সাহিদা আক্তার উভয় পরিবারের সদস্যদের বোঝান যে বাল্যবিবাহ শুধু বেআইনি নয়, ক্ষতিকরও বটে। প্রীতিকর বিষয় হলো, উভয় পরিবার সাহিদা আক্তারের কথা মেনে নিয়ে বিয়ে স্থগিত করেছে এবং সবার সামনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ছেলেমেয়ে দুটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তারা তাদের বিয়ে দেবে।
ওই বিয়েবাড়িতে সাহিদা আক্তারের সঙ্গে পুলিশের দুই সদস্য না থাকলে দুই পরিবারের সদস্যরা তাঁর কথা মেনে নিয়ে বিয়ে বাতিল করতেন কি না, তা আমাদের পক্ষে বলা কঠিন। সাহিদা আক্তারকে তাঁরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা তাঁরা আসলেই রক্ষা করবেন কি না, ছেলেমেয়ে দুটি নিজেরাই বিয়ে করে ফেলবে কি না, তা-ও আমরা জানি না। কিন্তু ওই বিয়েবাড়িতে সাহিদা আক্তারের উপস্থিত হওয়া এবং দুই পরিবারের লোকজনকে বিয়েটা বাতিল করতে সম্মত করাই এক বিরাট তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই ঘটনার দৃষ্টান্ত নিশ্চয়ই আশপাশের অঞ্চলে কিছু না কিছু প্রভাব সঞ্চারিত করবে।
ইউএনএফপিএর প্রতিনিধি সরকারি ও সাংসদদের যেসব উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছেন, কিশোরী শারমিন আক্তার কিংবা তরুণী সাহিদা আক্তারের সাহসী সক্রিয়তা তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং সামাজিক প্রভাবের দিক থেকে এ দুই কিশোরী-তরুণীর দৃষ্টিভঙ্গি ও কাজের তাৎপর্য ব্যাপক ও গভীর। বিশেষত, সাহিদা আক্তারের মতো সুবিবেচক ও সাহসী তরুণীকে আমাদের লক্ষ করা দরকার। তিনি বাল্যবিবাহ ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ওই বিয়েবাড়িতে একা যাননি, সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশকে সঙ্গে নিয়েছেন। এটা তাঁর বাস্তব বুদ্ধির পরিচায়ক: তিনি একা গেলে ওই বিয়েবাড়িতে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারতেন, এমনকি তাঁর বিপদও হতে পারত। দ্বিতীয়ত, পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ওই বিয়েবাড়িতে গিয়ে কাউকে গ্রেপ্তার করা বা এ ধরনের কোনো পথে পা বাড়াননি, বরং উভয় পরিবারের সদস্যদের শুভবুদ্ধি জাগানোর চেষ্টা করেছেন, বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিকগুলো তাঁদের বুঝিয়ে বলেছেন এবং বিয়েটা ভেঙে দিতে তাঁদের রাজি করাতে সক্ষম হয়েছেন।
বাল্যবিবাহ নামের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নতুনভাবে আইন প্রণয়নসহ সরকারি-বেসরকারি যেসব উদ্যোগ ও তৎপরতা চলছে, তার সামগ্রিক অ্যাপ্রোচ হওয়া উচিত তরুণী সাহিদা আক্তারের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতির মতো।
প্রথমত, একটা আইন দরকার, সে আইনের দ্ব্যর্থহীন বিধান হবে কোনো পরিস্থিতিতেই ১৮ বছরের কম বয়সী কারও বিয়ে হতে পারবে না। মন্ত্রিসভা যে আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে, সেটার ১৯ ধারা সম্পর্কে অনেকেই তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেছেন। এ হতাশা অমূলক নয়। কারণ, আমাদের আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি অত্যন্ত দুর্বল; অনেক নিশ্ছিদ্র আইনেরই প্রয়োগের সময় অনেক ফাঁক-ফোকর বেরিয়ে যায়। এমন অবস্থায় বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ১৯ ধারা এ আইনটির প্রয়োগকে শুভংকরের ফাঁকিতে পরিণত করতে পারে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, বিশেষ ক্ষেত্রে ‘সর্বোত্তম স্বার্থে’ আদালতের নির্দেশ এবং মা-বাবার সম্মতিতে যেকোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে হতে পারবে।
এ রকম ধারাসংবলিত আইনের আলোকে গাজীপুরের ওই বাল্যবিবাহের ঘটনা বিচার করে দেখতে গেলে আমরা প্রথমেই লক্ষ করব, সাহিদা আক্তারের পাশে আইন নেই। কারণ, বর ও কনে উভয়েই অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও তাদের বিয়ে হচ্ছে উভয়ের মা-বাবার সম্মতিতে। উভয় পরিবারের জন্য এটা একটা বিশেষ পরিস্থিতি, কারণ ছেলেমেয়ে দুটি পরস্পরের প্রেমে পড়েছে, এলাকার লোকজন তা জেনে গেছে এবং বিয়ের আগে তাদের মেলামেশার ফলে তাদের পারিবারিক সম্মানহানির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সুতরাং, এই বিশেষ পরিস্থিতিতে উভয়ের মা-বাবা তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার মধ্যেই উভয় পরিবারের ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ দেখতে পেয়েছেন। প্রস্তাবিত বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ১৯ ধারায় এই ‘সর্বোত্তম স্বার্থের’ কথাই বলা হয়েছে। অর্থাৎ, আইনটি ইতিমধ্যে বলবৎ থাকলে গাজীপুরের ওই বাল্যবিবাহ ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করার আইনগত অধিকার সাহিদা আক্তার কিংবা অন্য কারোরই থাকত না।
সুতরাং, বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে সাহিদা আক্তারদের মতো সক্রিয় মানুষদের পক্ষে প্রথমেই দরকার একটা যুক্তিসংগত ও কার্যকর আইন।
দ্বিতীয়ত, আইন থাকলেই বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে না। খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে আইন যেমন প্রত্যাশিত মাত্রায় ফলপ্রসূ হচ্ছে না, বাল্যবিবাহ বন্ধ করার ক্ষেত্রেও তেমনটিই হওয়ার কথা। কিন্তু উল্লিখিত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধগুলো থেকে বাল্যবিবাহের প্রকৃতি খুবই আলাদা। আমাদের সমাজে এটাকে এখনো অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। কিন্তু এখন অধিকাংশ মানুষই জানে যে বাল্যবিবাহ অবৈধ; থানা-পুলিশ জানতে পেলে সমস্যা করতে পারে। তাই যেসব পরিবার কম বয়সে মেয়ের বিয়ে দেয়, তারা চুপিসারে কাজটা সেরে ফেলতে চায়। কিন্তু যদি কোনোভাবে একটু জানাজানি হয়, তবে তা একটা চাঞ্চল্যকর খবর হিসেবে আশপাশের অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি, এনজিও, বিভিন্ন ক্লাব-সংগঠন তৎপর হলে বিয়েটা ঠেকাতে পারে। সাহিদা আক্তারের দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা দরকার। পুলিশ বিয়েবাড়িতে গিয়ে বর-কনেসহ তাদের মা-বাবাদের কোমরে দড়ি বেঁধে টেনেহিঁচড়ে থানায় নিয়ে যাক—সাহিদা এ রকম চাননি। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রবল ও ব্যাপক জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেটা খুব ভালো পদ্ধতি হবে না। তার চেয়ে ভালো হবে মা-বাবাদের বোঝানো: বাল্যবিবাহ কেন বন্ধ করতে হবে।
সন্তানের জন্য মা-বাবার বাৎসল্য আছে, কিন্তু ডাক্তার বা বিজ্ঞানীর মতো তাঁদের বিদ্যা নেই। বিদ্যা ধার করা চলে, কিন্তু স্নেহ-বাৎসল্য ধারে মেলে না। মা-বাবা যে সন্তানের মঙ্গলের জন্য দিনরাত্রি পরিশ্রম করেন, যে সন্তানের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গলসাধনের মধ্যে তাঁরা নিজেদের জীবনের অর্থময়তা ও সার্থকতা খুঁজে পান, তাকে অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে দিলে যে তার মঙ্গলের পরিবর্তে স্থায়ী ক্ষতি করা হয়—এই সচেতনতা সৃষ্টির কাজ সবচেয়ে বেশি জরুরি।
মশিউল আলম: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।
mashiul.alam@gmail.com

(টুডে সংবাদ/তমাল)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন