মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মীমাংসিত নয়!

mahfuj-ullah
মাহফুজ উল্লাহ : আজ ১ ডিসেম্বর। ছেচল্লিশ বছর আগে এ দিনটিতে বাংলাদেশের মানুষের দিন কাটছিল দোলাচলের মধ্যে। তখনও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের রণদামামা বেজে ওঠেনি। একদিকে মুক্তিবাহিনীর অগ্রযাত্রা, মুক্তাঞ্চলের আয়তন বৃদ্ধি, অন্যদিকে প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজির আস্ফালন পরিস্থিতিকে কিছুটা জটিল করে তুলেছিল। ঢাকায় যারা ছিলেন তারা তখনও বুঝে উঠতে পারেননি এর শেষ কোথায়? বিভিন্নভাবে বলা হচ্ছিল, পাকিস্তানিরা ঢাকাকে রক্ষার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে সে অবস্থা বদলে যায়। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, পরাজয় অপেক্ষা করছে পাকিস্তানিদের জন্য। একটি জনপদের সব মানুষ যখন সক্রিয়ভাবে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায়, তখন বিজয় বিলম্বিত হতে পারে; কিন্তু ঠেকানো যায় না। পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের মুক্তি বা স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষেত্রে একই পরিণতি ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষ ভাগ্যবান- কেননা মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়েছে, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটেছে বাংলাদেশের।

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে রাজনৈতিকভাবে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের জন্ম হলেও দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর কারণে ভৌগোলিক বিজয় অর্জিত হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ আবেগ আপ্লুত করে দেয় গোটা দেশের মানুষকে। মুক্তির আনন্দে দিশেহারা হয়ে পড়ে মানুষ। কিন্তু সেদিনের অব্যবহিত পর কার্যকর সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কারণে কিছুটা শংকাও কাজ করছিল মনে মনে। মুক্তি ও কার্যকর সরকার প্রতিষ্ঠার মাঝে সময়ের ব্যবধান অন্যত্রও ঘটেছে।

কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরের অব্যবহিত পর এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা বিজয়ের আনন্দকে অনেকাংশে ম্লান করে দেয়। এর একটি ছিল নকল মুক্তিযোদ্ধা সেজে সিক্সটিন ডিভিশনের আবির্ভাব এবং লুটপাট, বিজয়ী ভারতীয় বাহিনীর আচরণ ইত্যাদি। স্বল্প সময়ে সিক্সটিন ডিভিশন অদৃশ্য হয়ে গেলেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর কিছু আচরণ মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণকে আহত করে।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এলেই পুরো জাতি স্মরণ করার চেষ্টা করে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা, মানুষের দুঃখ-কষ্ট, বেদনা ও আত্মত্যাগের কথা। প্রতি বছরই দেখা যায় নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। আসছে মানুষের আত্মত্যাগের কাহিনী। যদিও অনেকে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মীমাংসিত বিষয়। ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞদের পক্ষেই এমন মন্তব্য করা সম্ভব।

স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের অনেকেই এখনও জীবিত আছেন এবং প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব কাহিনী আছে বলার। কিন্তু সেসবের পুরোটা এখনও প্রকাশিত হয়নি। এর বাইরে রয়েছে ব্যাপক নিরস্ত্র মানুষের কাহিনী- যারা সবকিছু দিয়ে সাহায্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের- যাদের কারণে এ যুদ্ধ শুধু সনাতনী যুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছিল জনযুদ্ধ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দুটি দিক এখনও অনাবিষ্কৃত। এর একটি হচ্ছে, দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ছড়ানো-ছিটানো অসংখ্য উপাদান। এসব উপাদান সংগ্রহের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ খুব সীমিত। বেসরকারি উদ্যোগে এসব উপাদান সংগ্রহ করা সব সময় সম্ভব হয় না। সরকারি উদ্যোগেই সম্ভব এসব উপাদান সংগ্রহ করা। সেই উদ্যোগ নেই বলেই অসংখ্য প্রশ্নের জবাব এখনও পাওয়া যায় না। যদি মার্চ মাসে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আলোচনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণের কথা বলি তাহলে তারও কোনো পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নেই। ভারতীয় মহাফেজখানা থেকেও কোনো তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেই। অনেকেই বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানিরা যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছিল তারও কোনো হদিস নেই। এ কথাও চালু আছে, মুজিবনগর সরকারের অনেক দলিলপত্র, মন্ত্রিসভার কার্যবিবরণী অনেক কিছুই নেই। জিয়ার আমলে মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র সংকলিত করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সেখানেও অসম্পূর্ণতা থেকে গেছে। পনের খণ্ডে অনেক দলিল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু যে হাজার হাজার পৃষ্ঠা দলিল সংগৃহীত হয়েছিল অথচ ছাপা হয়নি, সেসব দলিল এখন কোথায় কী অবস্থায় আছে কেউ জানে না। ইতিহাসের উপকরণের প্রতি এ অশ্রদ্ধা যে প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে তা হচ্ছে, ইতিহাসের পছন্দমাফিক পাঠ তৈরি করার জন্যই কি এ চেষ্টা? যারা ইতিহাসের পছন্দমাফিক পাঠ তৈরি করতে চান তাদের জন্য শেষ পর্যন্ত তা সুফল বয়ে আনবে না।

মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি দিক বর্তমানে উপেক্ষিত। ১৯৭০ সালের ভোটের ফলাফল অগ্রাহ্য করার কারণেই বাংলাদেশীদের কাছে ভিন্ন কোনো পথ ছিল না। স্বাধীনতার পর দেশের সংবিধানে যে চার মূলনীতি সংযোজিত হয়েছে সেসবের জন্য মানুষ যুদ্ধ করেছিল কিনা সংশয় আছে বরং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণায় যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল সেটা ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের যে চারটি মূলনীতি সংযোজিত হয়েছে তা থেকে দেশ এখন বেশ দূরে। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতায় বলেছিলেন, প্রয়োজনে চিলির আন্দোলনের মতো জীবন দিয়ে হলেও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবেন। অথচ আজ আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের কথা উচ্চারণও করে না।

স্বাধীনতার ঘোষণায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের জনগণের জন্য সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের এ স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার সময় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এসব স্বপ্নই লালন করেছিলেন। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের চব্বিশ বছরে বাংলাদেশের মানুষ ক্রমাগত বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, তাদের মানবিক মর্যাদা হয়েছে ভূলুণ্ঠিত এবং তাদের জন্য ন্যায়বিচার ছিল অনুপস্থিত। এসব কারণেই স্বাধীন পাকিস্তানের যে স্বপ্ন এ দেশের মানুষ দেখেছিলেন তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষের কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে সমাজে বৈষম্য বেড়েছে অস্বাভাবিক গতিতে। প্রতি বছর বাড়ছে কোটিপতির সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে অসহায় মানুষের সংখ্যা। পরিসংখ্যান দিয়ে এ লেখা ভারি করার প্রয়োজন নেই। দেশের মানুষ মাত্রই জানেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন খুব একটা কার্যকর নয়। দলনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিও তারা হারাতে বসেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে হিংস্রতার সংখ্যা। সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় এখন কেউ প্রত্যাশা করেন না। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ বলেছেন, দ্রুত প্রবৃদ্ধি হলেই অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয় না। বৈষম্য বাড়ে নীতি ও রাজনীতির কারণে।

অনেকে বলেন, যেহেতু বিশ্বব্যাপী বৈষম্য বাড়ছে তাতে এর বিরুদ্ধে কথা বলে লাভ কী? কিন্তু এই বৈষম্যের বিস্তৃতি কুৎসিত বিষয়। এর ফলে জনগণের সৃজনীশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ব্যাহত হয় কর্মের উদ্যম। তাই প্রয়োজন বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি শিক্ষা, জনকল্যাণের চেষ্টা করা। এখানে আত্মসন্তুষ্টির সুযোগ নেই।

প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন এ স্বপ্ন ভঙ্গ? মানুষ যেমন স্বপ্ন দেখে, একটি জাতিও তেমনি স্বপ্ন দেখে। কিন্তু স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা ব্যক্তি, সমাজ ও জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল তাদের নির্ধারিত প্রতিনিধিরাই দেশ শাসন করবে। যেদিন ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন প্রবর্তিত হল সেদিন মানুষ অনুভব করল তার প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। গত কয়েক বছরে আবার তার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এখন রাষ্ট্র পরিচালনা করে না। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের মতামত প্রকাশের সুষ্ঠু অধিকার এখন নেই। উপরন্তু, অংশগ্রহণহীন নির্বাচনের ভিত্তিতে গঠিত একটি সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে বঞ্চিত করে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা কারও জন্যই সুখকর হবে না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা যখন উচ্চারিত হয় তখন গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির কথা, ভিন্নমত সহ্য করার ব্যাপারে বিরাজমান অসহনশীলতার কথা কেউ বলে না। সমাজের বিভিন্ন সনাতন গোষ্ঠী এমনভাবে আচরণ করে, যাতে মনে হতে পারে এ সমাজে সুশাসনের অভাব নেই। গণতন্ত্রের যে মৌলিক বাণী রয়েছে, জীবনের অধিকার, তাও আজ প্রায় অপস্রিয়মাণ।

ডিসেম্বর এ দেশের মানুষের জন্য বেদনা ও আনন্দের মাস। এ মাসেই জাতি হারিয়েছে তার প্রিয় সন্তানদের, যারা বুদ্ধিবৃত্তিক মেধা দিয়ে স্বাধীন দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। ভৌগোলিক স্বাধীনতা যে আনন্দ বয়ে এনেছিল সে আনন্দ আজ আর নেই। যারা প্রবীণ তারা সেই আনন্দ, সেই বিজয়ের কথা স্মরণ করতে পারেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কাছে অতীতের সেই আনন্দ আদৌ কোনো অর্থ বহন করে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে যেসব গণতান্ত্রিক আন্দোলন বাংলাদেশের জন্মকে গতি দিয়েছে তার ইতিহাসও জানা নেই।

বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল, স্বাধীনতা অর্জন করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্ন এখনও স্বপ্নই থেকে গেছে।

মাহফুজ উল্লাহ : শিক্ষক ও সাংবাদিক