দেশবাসীর প্রত্যাশা, নারায়ণগঞ্জে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন

000000000

মুনিরা খান : নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন সব সময়ই উত্তেজনাপূর্ণ। এটা কেবল নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য নয়, পুরো দেশবাসীরই একটা আগ্রহ, উত্তেজনা এ নির্বাচন ঘিরে বিরাজ করে। এখানে ভোটারদের মধ্যেও নানা সমীকরণ কাজ করে। বিশেষ করে শ্রমিক এলাকা হওয়ায় এটি নির্বাচনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। জাতীয় নির্বাচন, স্থানীয় নির্বাচন, এমনকি এবারের মেয়র নির্বাচন ঘিরেও একটি উত্তেজনা, মুখরোচক ভাব, উৎসবপূর্ণ আমেজ বিরাজ করছে। জাতীয় নির্বাচনে মানুষের একধরনের প্রত্যাশা থাকে, আর স্থানীয় নির্বাচনে আরেক ধরনের আকাঙ্ক্ষা থাকে। স্থানীয় নির্বাচনে মানুষের মূল নজর থাকে উন্নয়নের দিকে। সাধারণত মানুষ মেয়র হিসেবে তাঁকেই নির্বাচন করতে চায়, যিনি জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। কারণ প্রশাসনের সুনজরে থাকা ব্যক্তিরাই এলাকার উন্নয়নে ভালো ভূমিকা রাখতে পারেন।

গতবারের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর কোনো দলীয় মনোনয়ন ছিল না। পরে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে অভিনন্দন জানান। এবার আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে সেলিনা হায়াত আইভীকে মনোনয়ন দিয়েছে। গতবার বিএনপির পক্ষ থেকেও কোনো প্রার্থী ছিলেন না। ফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই প্রধান দলের সমর্থকদেরই আইভীর প্রতি সমর্থন ছিল। কিন্তু এবার বিএনপি ও ২০ দল আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেনকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। তাই সাধারণভাবে এবার সব সমর্থন সেলিনা হায়াত আইভীর ওপর নাও পড়তে পারে। গতবার আওয়ামী লীগ বা বিএনপি হিসেবে মনোনীত কোনো প্রার্থী মানুষের সামনে হাজির হননি। তাই রাজনৈতিক প্রভাব বা দলীয় টানাপড়েন অনেকটা কম ছিল। কিন্তু এবার প্রধান দুই দলই প্রার্থী দেওয়ায় প্রার্থীরা দলীয় হিসেবে নারায়ণগঞ্জবাসীর সামনে হাজির হবেন। স্বাভাবিকভাবেই একটা রাজনৈতিক আবহ বিরাজ করবে। তাই এবার দেখার বিষয়, এলাকার উন্নয়নে আগ্রহী ভোটাররা ভোট দেবেন, নাকি দলীয় মনোনয়ন দেখে ভোট দেবেন। আগেই যেটা বলেছি, স্থানীয় নির্বাচনে জনগণ উন্নয়নকে বেশি প্রাধান্য দেয়। কে কাজ করবেন বা কার প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ ভালো তাঁকেই প্রাধান্য দেন। এই ফলাফল পাওয়ার জন্য অবশ্য আমাদের নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আরেকটি বিষয়, আইভী ও সাখাওয়াত হোসেন দুজনই দলীয় লোকজনের কাছে নতুন। তাঁদের দলীয় ব্যক্তি হিসেবে স্থানীয় রাজনীতিবিদরা একটু কমই চেনেন। তাই তাঁদের সামনে এটা একটা চ্যালেঞ্জ যে তাঁদের নিজেদের দলের মধ্যেই প্রথমে পরিচিত হতে হচ্ছে। দলের লোকজনের তাঁদের গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। মেয়র নির্বাচনে ভোটাররা নিজেদের স্বার্থ দেখেন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, মেয়র নির্বাচনে দলীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বেশি প্রাধান্য বিস্তার করে।

নির্বাচনের আচরণবিধি নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ নানা অভিযোগ, সমালোচনা থাকবেই—এটা স্বাভাবিক। এবার যেহেতু দুই প্রধান দলই মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। সুতরাং এবার সমালোচনাও বেশি হবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই কঠোরভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেবে। কমিশন নিজেরা প্রার্থীদের আচরণবিধি পর্যবেক্ষণ করবে, দোষী ব্যক্তিদের বিচারিক শাস্তি দেবে। আচরণবিধি নিয়ে যেন দলগুলো পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সুযোগ না পায়, নিজেদের নির্বাচনী আচরণ সম্পর্কে নিজেরা যেন সচেতন থাকে, সেটাই নির্বাচন কমিশনের দেখার দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন প্রার্থীদের পক্ষপাত না করে সেদিকে কমিশন লক্ষ রাখবে। গণমাধ্যমে আমরা এরই মধ্যে দেখতে পাচ্ছি প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। তাঁদের খোঁজখবর নিচ্ছেন, উঠান বৈঠক করছেন। প্রচারণায় নানা সমস্যা, প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে আনছেন। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী দেওয়ার কারণে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অপর দুই শরিক এলডিপি ও কল্যাণ পার্টি মেয়র প্রার্থী প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলের মনোনীত প্রার্থীর মধ্যেই প্রধানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

নারায়ণগঞ্জে মেয়র নির্বাচন কেমন হবে, বরাবরের মতো এটাও নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ফেব্রুয়ারিতে শেষ হতে যাচ্ছে। সুতরাং অনেকে প্রত্যাশা করছে, এবারের কমিশন যাওয়ার আগে অন্তত একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেবে। কিন্তু আমরা জানি এ নির্বাচন কমিশনের অতীতের রেকর্ড কেমন? আবার পাশাপাশি এটাও ঠিক যে তারা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে—তার প্রমাণও আছে। সুতরাং তারা যেমন ভালো নির্বাচন করতে পারে তার একটা প্রমাণ যেহেতু গাজীপুরের নির্বাচনে দেখিয়েছিল, এবার সেই ভালো নির্বাচন করার একটা সুযোগ তাদের সামনে আছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে সেই সুযোগ তারা কাজে লাগাবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন তারা জাতিকে উপহার দেবে।

সরকারের পক্ষ থেকেও এবার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। তারা সর্বতোভাবে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। কারণ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতারই প্রতিফলন। সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে, তবেই কেবল একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব যে ক্ষমতা অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন এবং অন্য সব বিষয়কে তারা কাজে লাগাতে পারে যদি সরকারের সহযোগিতা থাকে। তাই সব কিছুর পরে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সরকারের আন্তরিকতাই মূল বলে আমরা মনে করি। এবার সরকার যেহেতু প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। ফলে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ মেয়র নির্বাচন নারায়ণগঞ্জে অনুষ্ঠিত হবে। দেশবাসীর প্রত্যাশাও তাই।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, ফেমা

অনুলিখন : শারমিনুর নাহার

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন