বীরের রক্তস্রোত, মাতার অশ্রুধারা’ কখনো কি ব্যর্থ হতে পারে?

000000000

রামেন্দু মজুমদার : মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৪৫তম বার্ষিকী আমরা উদ্‌যাপন করতে চলেছি। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মুক্তিসংগ্রামে বিজয় যেমন সহজ ছিল না, তেমনি কুসমাস্তীর্ণ ছিল না স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের এই ৪৫ বছরের পথচলা। রাজনৈতিক হত্যা, ষড়যন্ত্র, সামরিক শাসন, জঙ্গি-মৌলবাদ, রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার, নানা সমাবেশে শক্তিশালী বোমা হামলা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা আমাদের দেশের শান্তিকামী মানুষের জীবন ক্ষতবিক্ষত করেছে বারবার। জাতি হিসেবে এগিয়ে চলার পথকে নিরন্তর বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। তবু বাংলাদেশের মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি ও একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেশকে আজকের জায়গায় নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।

১৯৭১ সালের বিজয় দিবস এসেছিল আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। আনন্দ—৯ মাসের নির্যাতন, শঙ্কা ও বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য। বেদনার অশ্রু—স্বজন হারানোর জন্য। বিশেষ করে তখনই সবাই জেনে যান বুদ্ধিজীবী হত্যার নির্মম সংবাদ। রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে আবিষ্কৃত হয় অনেক বুদ্ধিজীবীর ক্ষতবিক্ষত লাশ। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার লক্ষ্যে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদরদের দ্বারা ঘটিয়েছিল এ ঘৃণ্য ও বর্বর হত্যাযজ্ঞ।

সেদিন বিজয় দিবসকে অসম্পূর্ণ মনে হয়েছিল জাতির জনকের অনুপস্থিতিতে। বঙ্গবন্ধু তখনো পাকিস্তানের কারাগারে। তাঁর ভাগ্যে কী ঘটবে তা নিয়ে নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারে না। অনেক নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশের মাটিতে পা রাখলে পরিপূর্ণ হয় বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের সত্যিকার বিজয়।

আমরা কি শুধু রাজনৈতিক মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছিলাম? আমাদের জাতির জনক আমাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পর্বে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা শুধু রাজনৈতিক মুক্তির জন্য ছিল না, ছিল সব ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, অশিক্ষা ও কুসংস্কার থেকে মুক্তি, ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তি। সার্বিক মুক্তির মধ্য দিয়ে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য।

আজ ৪৫ বছর পর যদি আমরা আমাদের প্রশ্ন করি আমরা কি সেদিনের সেসব লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছি? সবাই স্বীকার করবেন, না, এখনো আমরা পুরোপুরি পারিনি। অনেক রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেলেও অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে; কিন্তু নৈতিক অবক্ষয় হয়েছে প্রচুর।

প্রথমেই চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অন্যতম ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই। সেক্যুলারিজমের অনুবাদ ধর্মনিরপেক্ষতা বোধ হয় সঠিক হয়নি। কারণ অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতার সমার্থক মনে করেছেন। কিন্তু বাস্তবে তা মোটেই নয়। প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পরে যখন স্বাধীনতাবিরোধীরা আবার ক্ষমতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেল, তখন একে একে সব মূলনীতি বর্জন করা শুরু হলো।

জিয়াউর রহমান ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেন। এরশাদ তো রাষ্ট্রধর্মই প্রবর্তন করলেন। ফলে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার আবার পুরোদমে শুরু হলো। অথচ পাকিস্তান আমলে রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহারের জন্য আমাদের কত মূল্য দিতে হয়েছে। রাজনৈতিক হীনস্বার্থে আমরা সব ভুলে গেলাম।

আমরা ভেবেছিলাম, সাম্প্রদায়িকতাকে চিরদিনের মতো কবর দেওয়া হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তা ছিল সাময়িক। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বন্দুকের সামনে ধর্মের কোনো বাছবিচার ছিল না। বাঙালি মাত্রই ছিল তাদের শত্রু। অবশ্য হিন্দু হলে তার অপরাধ ছিল দ্বিগুণ। শেষ পর্যন্ত ইসলাম রক্ষার নামে পাকিস্তানিরা ও তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর, আলশামস ও জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরই হত্যা করেছে বেশি।

সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশে তার হিংস্র থাবা বিস্তার করল। সাম্প্রদায়িক শক্তি ও একসময় সরকারের মদদে জঙ্গিবাদ বাংলাদেশে বিকাশ লাভ করল। আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদী শক্তিগুলোর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপিত হলো। দীর্ঘদিন ধরে পত্রপত্রিকায় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে মাদ্রাসার আড়ালে জঙ্গি প্রশিক্ষণের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ভোট নষ্ট হওয়ার ভয়ে অতীতের কোনো সরকারই জঙ্গি নির্মূলে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অথচ তখন যদি এখনকার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতো, তাহলে জঙ্গি তত্পরতা এত বৃদ্ধি পেত না।

এ কথা তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে জঙ্গিবাদীরা আমাদের আবার অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিতে চায়। বিশ্বব্যাপী ইসলামিক স্টেট, তালেবান ও আল-কায়েদার মতো জঙ্গিগোষ্ঠী দেশে দেশে চোরাগোপ্তা হামলা করছে। প্রাচীন সভ্যতার পুরাকীর্তি, জাদুঘর, গ্রন্থাগার সব ধ্বংস করছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি—সব ধ্বংস করে ওরা বিশ্বকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়? এ সহজ কথাটা কি আমরা বুঝতে পারি না? বাংলাদেশেও আজ আমাদের সব শুভ অর্জন ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য নস্যাৎ করে আমাদের আবারও সেই তমসাচ্ছন্ন যুগে ফিরিয়ে নিতে মৌলবাদী গোষ্ঠী তত্পর।

পরমতসহিষ্ণুতা আমাদের রাজনীতি ও সমাজ থেকে আজ নির্বাসিত। ভিন্নমত যদি আমরা সহ্য করতে না পারি, তবে কিভাবে আমরা নিজেদের গণতন্ত্রী ও সভ্য সমাজের মানুষ বলে পরিচয় দেব? আজ সবাই মিলে অন্ধকারের অপশক্তিকে আমাদের শুভবুদ্ধি ও মানবিক চেতনার শক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে হবে।

বিজয়ের ৪৫তম বার্ষিকীতে আমরা পেতে চাই আমাদের স্বপ্নের সেই বাংলাদেশকে, যার জন্য আমাদের ৩০ লাখ স্বজন প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। আমাদের একটাই ভরসা, বাংলাদেশ আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে তার আর পেছনে যাওয়ার সুযোগ নেই, সুবর্ণ জয়ন্তীর দিকে দৃপ্তপদে সমৃদ্ধির সোপান ধরে এগিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় স্বদেশ।

বিজয়ের স্মৃতিজাগানিয়া এ মাসে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার সব শহীদকে। সংগ্রামী সালাম জানাই আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাঁদের কারণে আজ আমরা স্বাধীন দেশে মাথা উঁচু করে হাঁটতে পারছি।

‘বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা’ কখনো কি ব্যর্থ হতে পারে?

লেখক : নাট্যজন

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন