বুদ্ধ ধর্মের মূল কথা, ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’

t

আহমদ রফিক : ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিপরীতে গৌতম বুদ্ধ প্রচার করেছিলেন অহিংসা, শান্তি, সহিষ্ণুতার মতো অমৃতবাণী। তাঁর প্রচারিত ধর্মের একটি মূল কথা—‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’ এবং তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে। ব্রাহ্মণ্য সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মহাপ্রাণ বুদ্ধের এ আহ্বানে সাড়া পড়ে শুধু ভারতে নয়, গোটা এশিয়ায়। প্রমাণ বিশ্বময় ছড়ানো বুদ্ধবিশ্বাসীদের সামাজিক উপস্থিতিতে।

রবীন্দ্রনাথের মুগ্ধতা ছিল এই মানবতাবাদী, শান্তিবাদী, অহিংসাবাদী ধর্ম ও এর প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের প্রতি। দূর জার্মানিতে স্বনামধন্য সাহিত্যিক হেরমেন হেম লেখেন ‘সিদ্ধার্থ’। ইউরোপের একাধিক ধীমানের অনুরাগ বুদ্ধের প্রতি। আর আবেগতাড়িত রবীন্দ্রনাথের বহুবৌদ্ধিক রচনার মধ্যে অসাধারণ একটি গানের পঙিক্ত :

‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব;

ঘোর কুটিল পন্থ তার, লোভ জটিল বন্ধ

নতুন তব জন্ম লাগি কাতর যত প্রাণী—

কর প্রাণ মহাপ্রাণ, আন অমৃত বাণী,…

করুণাঘন ধরণীতল কর কলংক শূন্য।’

প্রাচীন বঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম, বৌদ্ধ সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে একাধিক বৌদ্ধ ধীমানের হাত ধরে। অসামান্য তাঁদের প্রতিভা। আর একালে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের আচার-আচরণ ও পরমতসহিষ্ণুতা ও শান্তশ্রী মানসিকতা দেখে মনে হয়েছে এরা যথার্থ মানবতাবাদী, কারো সঙ্গে বিবাদ-বিসংবাদে এদের মতি নেই।

কিন্তু অবাক হয়েছি বৌদ্ধপ্রধান প্রতিবেশী দেশ বার্মা তথা মিয়ানমারে কিছুকাল থেকে শান্তশ্রী বৌদ্ধদের বুদ্ধবিরোধী সহিংস আচরণ দেখে, তাও আবার স্বদেশি ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী রোহিঙ্গাদের ওপর হামলায়—তাদের বাড়িঘরে আগুনই শুধু নয়, ভিনধর্মী মানুষ হত্যায় তাদের উল্লাস দেখে। বুদ্ধের শান্তিবাদী বাণী ভেসে গেছে ইরাবতী থেকে একাধিক নদীর জলে। প্যাগোডার ঘণ্টাধ্বনি সে হিংসার, উন্মত্ততার ওপর শান্তির আবহ তৈরি করতে পারেনি।

সবচেয়ে বড় কথা নিঃস্বার্থ বুদ্ধের ধর্মীয় বাণীতে বিশ্বাসী মিয়ানমারবাসী বৌদ্ধ, বিশেষ করে আরাকান (রাখাইন) অঞ্চলের বৌদ্ধজনতা এতটা দাঙ্গাবাজ হয়ে গেল কেন, কী কারণে যে আরাকানি রোহিঙ্গা মুসলমানদের তাদের স্বদেশ থেকে তাড়াতে তাদের উন্মত্ত প্রয়াস, এমনকি হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। শাসন-প্রশাসন তা বন্ধ করা দূরে থাক, পাল্টা উসকানি দিয়ে চলেছে। ফলে সীমান্ত পথে ব্যাপক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে, মূলত চট্টগ্রাম-আরাকান সীমান্ত এলাকায়।

দুই.

বাংলাদেশ এতটাই ঘনবসতির জনসংখ্যা সংকটে যে তার পক্ষে স্থায়ী শরণার্থী গ্রহণ সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় আগে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনস্রোত চট্টগ্রাম-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী  বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আশ্রয় নেয় শরণার্থী হিসেবে। তারা এখন এ দেশে প্রায় স্থায়ী বাসিন্দা। রক্ষণশীল এসব রোহিঙ্গা নিয়ে চলছে এনজিও এবং সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত, যা শুধু দূষিত রাজনীতিই নয়, সাম্প্রদায়িকতার আগুনেও  জ্বালানি যোগ করতে তত্পর।

রামুর হিন্দু-বৌদ্ধপল্লীতে বহু পরিচিত সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামায় রোহিঙ্গাদের জড়িত থাকা নিয়ে একাধিক সূত্রে অভিযোগ রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর অরণ্যে আবিষ্কৃত বাংলাদেশবিরোধীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ শিবিরের সঙ্গে এদের সংশ্লিষ্টতার মতো প্রতিক্রিয়াশীল ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের রোহিঙ্গা শিবির বাংলাদেশের সুস্থিতি ও সার্বভৌমত্ব বিষয়ে বিষফোড়া হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের স্থায়ী শিবির থেকে স্বদেশে ফেরত পাঠাতে তত্কালীন বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখায়নি।

হয়তো তখন মানবিক চেতনাই বড় বিবেচিত হয়েছিল। রোহিঙ্গা শিবিরের রাজনৈতিক-সামাজিক তাত্পর্য বিচার ভাবনায় আসেনি। আসেনি কিছুসংখ্যক অবাঞ্ছিত ঘটনার পরও। তবে কিছুদিন আগে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বর্তমান সরকার দৃঢ় নীতিই নিয়েছিল। এখনো নিচ্ছে। যেমন—গত ২০ নভেম্বরের একটি দৈনিকের সংবাদে প্রকাশ, ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে পালিয়ে আসা শতাধিক রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত অতিক্রমকালে সে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।’

পৃথিবীর সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের পক্ষে এ অবস্থায় এ ছাড়া আর কী-ইবা করার আছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ বড় সমস্যায়। কারণ কেউ কেউ মনে করেন,  মানবিক কারণে তাদের এ দেশের মাটিতে আশ্রয় দেওয়া উচিত। অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির মতামত সম্পূর্ণ বিপরীত। আরো  সমস্যা জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে ‘রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খোলা রাখতে।’

কিন্তু আমাদের যুক্তিনিষ্ঠ প্রশ্ন, জাতিসংঘ রোহিঙ্গা বিতাড়নের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না কেন? কেন চুপ করে আছে বিশ্বের পরাশক্তি, মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো। এটা যেন আরেক একাত্তরের মতো খেলা, যা ঘটে ছিল বাংলাদেশে, তারই ক্ষুদ্র সংস্করণ। সামরিক জান্তার গণহত্যা। বিশেষ করে মিয়ানমারের সরকারপ্রধান যখন তাদের ভাষায় গণতন্ত্রের মানসপুত্রী অং সান সু চি, যাকে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দীর্ঘদিনের চেষ্টায় মিয়ানমারের সিংহাসনে বসাতে পেরেছে। তার জন্য ‘শান্তির নোবেল পুরস্কার’ বরাদ্দের ব্যবস্থাও করেছে।

গোঁয়ার বর্মি সামরিক জান্তার দীর্ঘস্থায়ী শাসন অবরোধে, চাপে শেষ পর্যন্ত ভণ্ডুল করে মিয়ানমারে কথিত গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব নিশ্চিত করার পরও সু চি শাসনে রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা লাগাতার চলছে কেন? সু চির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে না কেন। মিয়ানমারের সামরিক শাসনের ওপর যে লাগাতার চাপ, তা অবশ্য ছিল সেখানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পুতুল সরকার বসানোর তাগিদে, সত্যিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। ঘটনা তা-ই প্রমাণ করেছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী এক জনগোষ্ঠী। বর্তমানে মিয়ানমার তথা একদা ব্রহ্মদেশ (ইংরেজের ভাষায় বার্মা) বহু জাতিসত্তা, বহু ধর্মবিশ্বাসী মানুষের দেশ হলেও এর বেশির ভাগ মানুষ বৌদ্ধ। ধর্মীয় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমান সম্প্রদায় জনসংখ্যা বিচারে গৌণ, রাজনৈতিক শক্তিতে দুর্বল। তারা রক্ষণশীল। তাদের স্বাতন্ত্র্যবাদী সংগ্রাম চালানোর ক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনোটাই নেই। পূর্বোক্ত একাধিক কারণে বার্মিজ রাজনীতি, মিয়ানমার রাজনীতি সংঘাতে অস্থির, সংক্ষুব্ধ।

প্রতিবাদী জাতিসত্তাগুলোর মুক্তিসংগ্রামের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের বর্তমান শাসক ও সামরিক শাসকদের লাগাতার প্রতিরোধ লড়াইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে অস্থির শাসকশ্রেণির মাত্র ২০ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশ ছাড়া করার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে, তা আমাদের জানা নেই। রোহিঙ্গাদের পরিত্যক্ত জায়গাজমি, বাস্তুভিটা ও কিছু সম্পদ রাখাইন বৌদ্ধরা দখলে নিতে পারবে ঠিকই, তাতে শাসকশ্রেণির কতটা ফায়দা হতে পারে।

আরো বিবেচনার বিষয় যে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের ওপর তো বিতাড়নমূলক অত্যাচার বা ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অত্যাচার চালাচ্ছে না বৌদ্ধ শাসকরা। আরাকানে মুসলমান উপস্থিতি তো রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও এক প্রতিষ্ঠিত বিষয়, যা বিশ্বসংস্কৃতি ক্ষেত্রের ইতিহাসেও স্বীকার্য। স্মরণযোগ্য আলাওল, শাহ মুহম্মদ মসীর বা মাগন ঠাকুরের মতো মধ্যযুগের খ্যাতিমান কবি, যাঁরা আরাকান রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতাধন্য। অন্যদিকে বর্মি নিষ্ঠুরতা বঙ্গদেশের সমাজে ও লোককাহিনীতে, এমনকি তত্কালীন ইতিহাসেও স্মরণযোগ্য বিষয় হয়ে আছে। এখন ইতিহাস বিচারেও রোহিঙ্গাদের আরাকান থেকে বিতাড়নের পেছনে কোনো যুক্তি নেই। এ বিতাড়ন ও গণহত্যা অন্যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। এর বিরুদ্ধে বিশ্বশক্তি সোচ্চার হোক।

তিন.

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা সমস্যা, শরণার্থী-রোহিঙ্গা সমস্যার যুক্তিনির্ভর, মানবিক সমাধান জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে কিছুদিন থেকে বাংলাদেশি পত্রপত্রিকায় যথেষ্ট মাত্রায় লেখালেখি চলছে। রাষ্ট্রযন্ত্র কিছুটা হলেও সচেতন হয়েছে। তারা সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর টহল বৃদ্ধি করেছে, অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠাচ্ছে (পুশব্যাক)। যদিও সেখানে তাদের জীবন-জীবিকা-সম্পদ নিরাপদ নয়। তাই বলে বাংলাদেশ তো তাদের আশ্রয় দিয়ে নিজের জন্য সমস্যা তৈরি করবে কেন, সমস্যাটা বৈশ্বিক। জাতিসংঘ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা নেবে এটাই কাঙ্ক্ষিত। বাংলাদেশে তাদের শরণার্থী অবস্থান এ দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক স্বার্থের বিরোধী। যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সামরিক জান্তার শাসনকালে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে এসেছিল, তারা ফেরত যায়নি। তার চেয়েও বড় কথা, জনসংখ্যা চাপের কথা বাদ দিলেও রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামরিক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়েছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ও সামাজিক অপকর্মের কেন্দ্রস্থল। বিশেষ করে মাদকপাচার, নারী পাচার, অস্ত্র চোরাচালানসহ সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তপনার গোপন কর্মকেন্দ্র।

বার্মা তথা মিয়ানমারের রাজনীতিতে বহুদিন থেকে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। ব্রিটিশ শাসন, বিশ্বযুদ্ধকালীন সাময়িক জাপানি শাসন এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন  ব্রহ্মদেশে বিভিন্ন রকম শাসনে জাতীয়তাবাদী চেতনাই ছিল রাজনীতির বড় স্লোগান। তা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর সশস্ত্র সংগ্রামও বাস্তব সত্য। সেখানে নৈরাজ্যিক পরিবেশে আউঙ্গ সান (অং সান)-দের মতো দু-একজন উদারপন্থী, প্রগতিশীল গণতন্ত্রী রাজনীতিক ব্যাপক সাংগঠনিক ভিত তৈরি করতে পারেনি। বরং কেউ অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কখনো প্রাণ হারিয়েছে।

ভাবতে অবাক লাগে, পূর্বোক্ত নেতার সন্তান অং সান সু চি কিনা হয়ে গেলেন ঈঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার রাজনীতিবিদ। এবং গণতন্ত্রের নামে তাদের হাতের পুতুল। সাম্রাজ্যবাদের দূর লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে চীন-প্রভাবিত সামরিক শাসকদের সরিয়ে দিয়ে সু চির রাজ্য প্রতিষ্ঠা। তখন বাংলাদেশের অনেকেরই ধারণা ছিল সু চির মাধ্যমে মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, সমাজে শান্তি আসবে, অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে, উদার মানবিক মূল্যবোধ স্থাপিত হবে।

কিন্তু সু চি যে উগ্র জাতীয়বাদের খপ্পরে পড়বেন এমনটা অনেকে ধারণা করতে পারেননি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমার বিশ্বাস, অং সান সু চি পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রভাব সত্ত্বেও রাজনৈতিক আদর্শ বিচারে উগ্র জাতীয়বাদী চেতনা থেকে মুক্ত নন। এর বড় কারণ বর্মি জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে বিরাজমান প্রবল জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে, ক্ষমতার প্রয়োজনে উপেক্ষা করা তাঁর সম্ভব হয়নি। তাই অনুকূল স্রোতে গা ভাসানো। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চির ভূমিকা সহিষ্ণু গণতন্ত্রের নয়।

সু চির ক্ষমতার আসনে বসার প্রাক্কালে একাধিক নিবন্ধে লিখেছিলাম তাঁর নেতিবাচক প্রবণতার কথা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাঁর পূর্বধারায় ভেসে চলার কথা। কথাগুলো বড় নির্মমতায়, বড় অসহিষ্ণুতায় সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাই কথিত গণতন্ত্রের মানস কন্যার শাসনে রোহিঙ্গা নর-নারীর জীবনমান রক্ষা পেল না। সু চি নিজেকে প্রকৃত গণতন্ত্রী রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে প্রমাণিত করতে পারেননি, না পেরেছেন বর্মি প্রগতিবাদী-জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা, তত্কালে বহু পরিচিত শহীদ আউঙ্গ সানের সুযোগ্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। তবু বিষয়টির নানা মাত্রিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সঙ্গে রাষ্ট্রনৈতিক-কূটনৈতিক সংলাপে বসতে হবে, যাতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো যায় এবং রাখাইন রাজ্যে যাতে সাম্প্রদায়িক সংঘাত বন্ধ হয়। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘকে টেনে আনতে হবে সংলাপে। কিন্তু কিছু হচ্ছে না। সু চির শাসনে অবাধে চলছে রোহিঙ্গা গণহত্যা। নিশ্চুপ জাতিসংঘ এবং পরাশক্তি, মহাশক্তিধর সব রাষ্ট্র।

চার.

গণতন্ত্রী নামে পরিচিত সু চির ভাবমূর্তি পাল্টানোর অপ্রিয় প্রসঙ্গে ভিন্ন একটি কথা না বললেই নয়। আমরা জানি নোবেল শান্তি পুরস্কারের পেছনে রাজনৈতিক খেলা এবং ওয়াশিংটনের নেপথ্য প্রভাবের কথা। সু চিকে নোবেল শান্তি পূরস্কার দানের পেছনে একই খেলা যে কার্যকর, তা ঘটনার বিচারে না বোঝার কথা নয়। এ বিষয়ে এমন একাধিক উদাহরণ তুলে ধরা যায়।

সু চিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার কতটা অপাত্রে দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের এর আগেকার এমন দাবি যে কতটা সঠিক তার প্রমাণ মিলেছে অনলাইনে সু চির নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবি। এ দাবিতে এসেছে লক্ষাধিক মানুষের স্বাক্ষর। মিয়ানমারে সংখ্যালঘু নির্যাতনে, সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সু চির নিষ্ক্রিয় নীরবতার প্রতিবাদে এই আবেদন। এ প্রতিবাদ নোবেল কমিটির চোখে না পড়ার কথা নয়। তবু শান্তি পুরস্কারের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী কায়েমি স্বার্থের যোগসাজশ রয়েছে বলে হয়তো নোবেল কমিটি এ আবেদনে সাড়া নাও দিতে পারেন। তবু বিচিত্র এ প্রতিবাদ ইতিহাসের পাতায় ধরা থাকল। আর এ লেখাটা শেষ করতে করতে কাগজে খবর : ‘মিয়ানমারে সেনাদের গুলিতে ৪ রোহিঙ্গা নিহত’। সিংহাসনে আসীন সু চি নির্বিকারচিত্তে মানবতাবিরোধী এসব অপরাধ চেয়ে চেয়ে দেখছেন। এর পরও কি শান্তির নোবেল পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য?

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন