গ্রামীণ নারীর কাজের মূল্যায়ন ও উন্নয়ন

000000000

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক :  উন্নয়ন ধারণাটি ব্যাপক, বহুমাত্রিক ও আপেক্ষিক বিষয়। সাধারণ অর্থে উন্নয়ন বলতে অগ্রগতি, প্রগতি, সমৃদ্ধি, বিকাশ, বিস্মৃতি, উন্মেষ, সংযোজন, বিবর্তন, পরিবর্তন ইত্যাদি পদ্ধতিকে বোঝায়। জাতিসংঘের মতে, উন্নয়নের ধারণাটি ব্যাপক অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার সমন্বিত ইতিবাচক ধারাকে বোঝায়। অমর্ত্য সেনের মতে, সব ধরনের পরাধীনতা থেকে মুক্তির প্রয়াসকেও উন্নয়ন বলা হয়। মানবাধিকারসহ সব ধরনের অধিকার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাকে অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন বলেও আখ্যায়িত করা হয়। আর যে উন্নয়ন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত প্রসারিত, তাকে বলে টেকসই উন্নয়ন। যেকোনো উন্নয়নের পরিসরে নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী এখনো প্রান্তে অবস্থান করছে; এখানকার উন্নয়নপ্রক্রিয়াটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার গহ্বরে নিমজ্জিত। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। নারী উন্নয়ন তাই জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। সব ক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। বর্তমানে ধীরে ধীরে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা উন্নয়নপ্রক্রিয়ার সঙ্গে নারীদের সম্পৃক্ত করছে; কিন্তু তা খুব একটা চোখে পড়ার মতো নয়। এখনো নারীসমাজে উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় পিছিয়ে পড়া অন্যান্য শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। আশার কথা হলো, তাদের বাদ দিয়ে যে টেকসই কিংবা অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন সম্ভব নয়, সে কথা এখন অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে নারীরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার শিক্ষা অর্জন করে। শিক্ষা গ্রহণ ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় নারীসমাজের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগে। গ্রামের নিরক্ষর নারীসমাজের মধ্যেও কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার আগ্রহ জাগে। জাতীয় উত্পাদনে নারীর অংশগ্রহণ আবশ্যক হয়ে ওঠে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয় উন্নয়ন পরিকল্পনা। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারী সংগঠনগুলোও অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলোও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নারী সংগঠনগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। ফলে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা সচেতন হয়ে ওঠে। এতে দেশে নারী উন্নয়নে এক বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। সরকার জাতীয়ভাবে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ ঘোষণা করেছে। দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রে নারী উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১০-১৫) নারী উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে গ্রামের মানুষ আরো অধিকসংখ্যক দরিদ্র। তবে সবচেয়ে অধিকসংখ্যক ও অধিক মাত্রায় দরিদ্র গ্রামীণ নারীসমাজ। তারা দরিদ্রদের মধ্যে দরিদ্রতম অংশ। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু হওয়ায় গ্রামীণ অবহেলিত নারী-পুরুষের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিস পল্লীর জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সুবিধাবঞ্চিত মহিলাসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সমবায় ও আনুষ্ঠানিক দলে সংগঠিত করে চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও ঋণ জোগানের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসে কাজ করে। উপজেলা সমাজসেবা অফিস, মহিলাবিষয়ক অফিস, পল্লী উন্নয়ন অফিস গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালনে ঋণ প্রদান করে থাকে। দেশের মোট কর্মশক্তির শতকরা ২৫ ভাগ জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গবাদি প্রাণী ও হাঁস-মুরগি পালনে জড়িত। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগির টিকাদান ও হাঁস-মুরগি পালনবিষয়ক প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা কার্যক্রম, খামার স্থাপনে পরামর্শ ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ ও ঋণ প্রদানের মাধ্যমে নারীর ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বিকাশ, গ্রামীণ শিল্পের উন্নয়নে কাজ করছে। এসব সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলার গ্রামীণ নারীসমাজ প্রতিনিয়ত লড়াই করছে এগিয়ে যাওয়ার।

সাম্প্রতিক সময় গ্রামপর্যায়ে পুঁজিবাদের অনুপ্রবেশ, আধুনিকীকরণ ও সনাতনী অর্থনীতির পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও অনেক ক্ষেত্রে নারীর কর্মসংস্থানে অসুবিধার সৃষ্টি করছে। কারণ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ফলে নারীর সনাতনী ভূমিকার পরিবর্তন ঘটছে এবং নারীর অনেক কাজ পুরুষের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। কুটিরশিল্পে গ্রামীণ নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে মজুরিপ্রাপ্তিতে নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। অনগ্রসর তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামীণ নারীর মজুরিবৈষম্যের হার আরো বেশি। গৃহকর্মের বাইরে যেসব নারী কাজকর্ম করতে যায় তারা সামাজিক প্রতিকূল পরিবেশ ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিভিন্ন সমস্যার শিকার হয়। একদিকে শ্রমবাজারে মজুরিবৈষম্য ও দ্বৈতনীতি, অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রবল প্রভাব বাংলাদেশের নারীকে অর্থনৈতিকভাবে বিপন্ন করে রাখছে। বিভিন্ন এনজিও ও সামাজিক সংগঠন এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করেও তেমন প্রতিকার করতে পারছে না।

বাংলাদেশের একজন নারী প্রতিনিয়ত সংসারে ঘর-গৃহস্থালির দায়দায়িত্ব ছাড়াও অনেক কাজ করে থাকে, যার কোনো বাজারমূল্য নেই। তাই এগুলো কোনো উৎপাদনশীল বা উন্নয়নমূলক কাজ হিসেবে গণ্য হয় না এবং এসব কাজের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই।

অন্যভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের গ্রাম এলাকার পরিবারগুলোতে পুরুষ ও মহিলা উভয়েই আয় করে। পুরুষ প্রত্যক্ষভাবে নগদ অর্থ আয় করে; কিন্তু মহিলা নগদ অর্থ আয় করে না, বরং নগদ অর্থ আয় করতে পুরুষকে সহায়তা করে। গ্রাম এলাকার মহিলারা কৃষিকাজের বিশেষ বিশেষ অংশ সম্পাদন করে। ফসলের বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে চাষাবাদের সব সামগ্রী দেখাশোনা, কৃষিকাজের সব আয়োজন সম্পন্ন, ফসলের প্রক্রিয়াজাত করা যেন নারীর আবশ্যিক কাজ। কোনো কোনো এলাকায় নারীরা প্রত্যক্ষভাবে মাঠে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত থাকলেও সিংহভাগ এলাকার নারীর কাজ গৃহের অভ্যন্তরে গৃহস্থালি কাজের মধ্যে সীমিত। তারা রান্নাবান্না, কাপড়চোপড় পরিষ্কার, ঘর গোছানো, ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা, গৃহস্থালির অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করে। নারীর এসব কাজকে পুনরুত্পাদনমূলক কাজ বলে। এসব কাজে তারা পুরুষের চেয়ে অধিক সময় ব্যস্ত থাকে।

বাংলাদেশের নারীদের এগিয়ে যাওয়ার গতিকে আরো বৃদ্ধি করার জন্য প্রয়োজন গ্রামীণ নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং নারীর পুনরুত্পাদনমূলক কাজের যথাযথ মূল্যায়ন।

লেখক : স্থানীয় সরকার ও নারী উন্নয়ন গবেষক

dr.mmh.ju@gmail.com

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন