কুরআনের আলো : হজরত ইউসুফ (আ) এর চারিত্রিক সৌন্দর্য

000000000

২৪. ওই নারী (মিসরের অর্থমন্ত্রীর স্ত্রী) তার [ইউসুফ (আ.)] প্রতি পুরোপুরি আসক্ত হয়েছিল। সেও ওই নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত, যদি সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন না দেখত। আমি তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত রাখার জন্যই এভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। অবশ্যই সে ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। [সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২৪ (প্রথম পর্ব)]

তাফসির : মিসরে গিয়ে যৌবনের মহাপরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন হজরত ইউসুফ (আ.)। এ বিষয়ে বর্ণনা ছিল আগের আয়াতে। আলোচ্য আয়াতেও একই বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। মিসরের অর্থমন্ত্রীর স্ত্রী ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে উঠেপড়ে লেগেছিল। ওই নারীর বিষয়ে ইউসুফ (আ.)-এর মনেও সামান্য চিন্তা জেগেছিল; কিন্তু প্রবল কোনো আকর্ষণ তৈরি হয়নি। ইউসুফ (আ.) ছিলেন ইমান ও নবুয়তের আলোয় আলোকিত। তাঁর বিবেক ছিল স্বচ্ছ। অন্তর ছিল পবিত্র। আল্লাহর নিদর্শন ও নির্দেশনা তাঁর সামনে ছিল। ফলে তিনি অপকর্মে লিপ্ত হননি। আল্লাহ তাঁকে অশ্লীল কাজ থেকে মুক্ত রেখেছেন। তিনি ছিলেন বিশুদ্ধচিত্ত আল্লাহর পূতপবিত্র বান্দা।

ইউসুফ (আ.) কী আলামত দেখেছিলেন, এ বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ইউসুফ (আ.) সে সময় নিজের পিতার ছবি দেখতে পেয়েছিলেন। পিতা ইয়াকুব (আ.) তাঁর মুখের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে দাঁড়ানো ছিলেন। অন্য বর্ণনায় আছে, এরপর তিনি ইউসুফ (আ.)-এর বুকে ও হাতে চাপ দিলেন।

আউফি (রহ.) বলেন, ওই সময় ইউসুফ (আ.)-এর মনিব আজিজের ছবি তাঁর চোখে ভেসে ওঠে। তিনি দেখলেন, মনিব তাঁর সামনে হাজির। ইবনে জারির (রহ.) বলেন, ইউসুফ (আ.) সেই কঠিন সময়ে ঘরের ছাদের দিকে তাকালেন। সেখানে তিনি দেখলেন, লেখা আছে, ‘তোমরা কখনো অপকর্মের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও মন্দ পথ।’ অন্য বর্ণনায় আছে, ইউসুফ (আ.) তিনটি উক্তি লেখা দেখলেন—এক. তোমাদের ওপর ফেরেশতা নিয়োজিত আছেন। তাঁরা তোমাদের সব কর্মকাণ্ড দেখাশোনা করেন। দুই. তুমি যে অবস্থায় থাকো না কেন, আল্লাহ তোমার সঙ্গেই আছেন। তিন. আল্লাহ সবার কাজকর্ম বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন।

ইবনে জারির (রহ.) বলেন, ইউসুফ (আ.) একটি আলামত দেখেছিলেন, যা তাঁকে ওই খারাপ কাজ থেকে বিরত রেখেছিল। সম্ভবত সেই আলামতটি ছিল এই—পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর ছবি তাঁর চোখে ভেসে উঠেছিল। সেটি কোনো ফেরেশতার আকৃতিও হতে পারে। আসলে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অভিমত সমর্থন করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণাদি নেই। তা ছাড়া কোরআন শরিফেও নির্দিষ্টভাবে কোনো আলামতের বিষয় উল্লেখ করা হয়নি।

হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) এ বিষয়ে একটি চমত্কার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রোজাদার ব্যক্তির মধ্যে প্রচণ্ড পিপাসা কাজ করে। ঠাণ্ডা পানি দেখলে তার অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই তৃষ্ণা মেটানোর আকর্ষণ তৈরি হয়। তাই বলে সে রোজা ভেঙে ফেলে না। এমনকি রোজা ভাঙার ইচ্ছাও প্রকাশ করে না। ইউসুফ (আ.)-এর অন্তরে এমন অনিচ্ছাজনিত সামান্য ঝোঁক দেখা দিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর নিদর্শন দেখে তিনি নিজেকে সংযত রাখেন। চিন্তা করলে বোঝা যায়, ইউসুফ (আ.) কত উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন!

এটা সত্য যে ইউসুফ (আ.) নবী হলেও অবশ্যই মানুষ ছিলেন। মানবীয় অন্তরে এই অনিচ্ছাকৃত সামান্য ঝোঁক সৃষ্টি হতে পারে। তবে আল্লাহর নবীরা সর্বাবস্থায় গুনাহ থেকে মুক্ত ছিলেন।

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ