প্রধানমন্ত্রীর আলাদা বিমানই কি সমাধান?

pm

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশ বিমানের যাত্রীসেবার মান নিয়ে রয়েছে শত প্রশ্ন। সন্দেহাতীতভাবেই এটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যাত্রীসেবা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নতির দিকে না গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জন্য আলাদা বিমান কেনার সিদ্ধান্ত কেন?

গত বছরের ১১ মার্চ সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের এক প্রশ্নের জবাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন জানিয়েছিলেন, পাঁচ বছরে বিমানের এক লাখ ৩৪ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

তিনি আরো জানিয়েছিলেন, ‘‘বাংলাদেশ বিমান ২০০৭ সালে কোম্পানিতে রূপান্তরিত হওয়ার পর ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মুনাফা অর্জন করেছিল। পরবর্তী আর্থিক বছরগুলোয় বিমান লোকসানের সম্মুখীন হয়।’’

সংসদ সদস্য মো: ইসরাফিল আলমের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ‘‘২০০৯-১০ অর্থবছরে চার হাজার ৬০২ কোটি, ২০১০-১১ অর্থবছরে ২২ হাজার ৪১৬ কোটি, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৫৯ হাজার ৪২১ কোটি, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৫৬৩ কোটি ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা লোকসান হয় বিমানের।’’

বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান করার উদ্যোগ তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, ‘‘দু’টি পুরাতন বিমান বাতিল করা হয়েছে। চারটি নতুন প্রজন্মের বোয়িং যুক্ত করা হয়েছে।”

এই হলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চিত্র। কোনো অনুসন্ধানে নয় বিমানমন্ত্রীর দেয়া তথ্যেই উঠে এসেছে এই করুন চিত্র।

যুক্তরাজ্যের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএ) হিথ্রো বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এয়ারলাইনসগুলোর সময়ানুবর্তিতার তথ্য প্রকাশ করে নিয়মিতভাবে। তাতে দেখা যায়, ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত হিথ্রো বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে সময়ানুবর্তীতায় সবচেয়ে খারাপের তালিকায় রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ওই সময় বিমান মোট ফ্লাইট পরিচালনা করেছে ৩১৪টি। এসব ফ্লাইটে গড় বিলম্ব ৪৫ দশমিক ৬ মিনিট।

বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের যাত্রী সেবা, সময়ানুবর্তিতাসহ নানা দিক বিচেনা করে রেটিং নির্ধারণ করে অনলাইন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্কাইট্রাকস। গত বছরের অগাস্টে তাদের প্রতিবেদনে বিমান বাংলাদেশ এয়াললাইন্সকে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ এয়ারলাইন্স হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটির ফাইভ স্টার রেটিং পদ্ধতিতে বিমান পায় টু স্টার। যাত্রী সেবায় বিমান পায় ১০ এর মধ্যে মাত্র ৫। তার মানে হলো বিমানের যাত্রীসেবা পুরোপুরি অব্যবস্থাপনায় ভরা।

বিমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২২টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করে। চারটি নতুন বোয়িং- ৭৭৭ এয়ারক্রাফটসহ মোট ১২টি এয়ারক্রাফট দিয়ে বিমান তার এই সেবা দেয়। এই বিমান নিম্নমানের যাত্রীসেবা ও ধারাবাহিক লোকসানের পর এখন নতুন বিতর্কের মুখে পড়েছে।

রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট যাওয়ার সময় তুর্কমেনিস্তানে জরুরি অবতরণে বাধ্য হয়। পরে অবশ্য ক্রটি সারিয়ে বিমানটি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বুদাপেস্টে যায়। এবং প্রধানমন্ত্রীর হাঙ্গেরি সফর শেষে তাকে নিয়ে বিমানটি এরই মধ্যে ঢাকায়ও ফিরে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীসহ ৯৯ জন যাত্রী, চার জন ককপিট ক্রু, ২০ জন কেবিন ক্রু এবং চার জন এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন বিমানটিতে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-১০১১ ‘রাঙ্গা প্রভাত’ নামের ওই বিমানটির ফুয়েল ট্যাংকারের নাট বোল্ট নাকি ঢিলা ছিল।

এ নিয়ে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিমানের তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সোমবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, ‘‘রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভ্রমণের জন্য এক্সিকিউটিভ এয়ারক্রাফট কেনা হবে। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ হয়েছে। শিগগিরই এই বিমান কেনা হবে।’’

বিমানের যাত্রী সেবার মান না বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির জন্য আলাদা বিমান কেনার যৌক্তিকতা কতটুকু? জানতে চাইলে বিমানের পরিচালক (মিডিয়া) শাকিল মেরাজ বলেন, ‘‘এটা খুবই যৌক্তিক, কারণ, বাংলাদেশ বিমানের এয়ারক্রাফট তারা ব্যবহার করায় চাপ পড়ে। তাদের ভ্রমনের আগে নিরাপত্তা চেকিংয়ের জন্য একদিন এয়ারক্রাফট বসিয়ে রাখা হয়। আর সারাবিশ্বেই ভিভিআইপিদের জন্য আলাদা এয়ারক্রাফট থাকে। সেটা বড় বা ছোট যা-ই হোক না কেন।’’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘বিমান এখন লোকসানের ধকল কাটিয়ে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে। গত অর্থবছরে বিমান ২৭২ কোটি টাকা লাভ করেছে। এই অর্থবছরেও লাভ করবে বলে আশা করি। আর যাত্রী সেবারও উন্নয়ন ঘটছে। আমি বিমানের যাত্রী সেবা খারাপ না বলে বলব ভালোর দিকে যাচ্ছে।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘বিমানের ফুয়েল কিনতে হয় বেশি দামে। তারপরও টিকেটের দাম আমরা বাড়াচ্ছি না। এছাড়া বিমানের অনলাইন সেবা বাড়ছে। ভিতরেও যাত্রীদের সেবার মান উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ইনশাল্লাহ আমরা ভালো কিছু করতে চাই।’’

আর বিমানের সাবেক এমডি মূয়ীদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী এয়ারক্রাফটের যান্ত্রিক ক্রটি ও তাদের জন্য আলাদা বিমান কেনার ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি না হলেও বিমানের লোকসান এবং যাত্রীসেবা নিয়ে কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘‘এখানে প্রধান সমস্যা হলো, যারা কাজ করেন তারা এটাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে সরকারি চাকরি হিসেবে দেখেন। তারা মনে করেন, লাভ- লোকসানে আমার কী? আর যাত্রীসেবার জন্য আন্তরিকতা নেই। আসলে প্রয়োজন মনিটরিং এবং আন্তরিকতার।’’

মূয়ীদ চৌধুরী ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বিমানের এমডি ছিলেন। তখন প্রথমবারের মতো বিমান লাভের মুখ দেখে।

মূয়ীদ চৌধুরী বলেন, ‘‘আমি সরাসরি মনিটর করতাম, যাত্রীদের অভিযোগ সরাসরি গ্রহণ করে ব্যবস্থা নিতাম। আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও কমিয়ে এনেছিলাম।’’ (ডয়চে ভেলে)