সিলেটে ‘নুনের চেয়ে খুন সস্তা’!

94

মনোয়ার হোসেন তালুকদার, সিলেট : গত এক মাসে সিলেট অঞ্চলে বহু লোক নিহত হয়েছেন প্রতিপক্ষের হাতে। এদের মধ্যে পিতা কর্তৃক সন্তান খুনের মতো অভাবনীয় ঘটনা থেকে শুরু করে প্রেম প্রস্তাবে প্রত্যাখ্যাত তরুণ যুবক কর্তৃক তরুণী নারী হত্যার ঘটনা রয়েছে। রয়েছে সম্পত্তি ও অন্যান্য বিষয়ে বিরোধ থেকে সৃষ্ট হত্যাকান্ড এবং প্রতিহিংসা ও পূর্ব শত্রুতার জের ধরে পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সিলেট অঞ্চলে যেনো ‘নুনের চেয়ে খুন সস্তা’ হয়ে গেছে। সত্যি বলতে কি, গোটা দেশেই কম বেশী এ অবস্থা বিরাজ করছে।
অতীতে দেশের কোন স্থানে এমনকি কোন অঞ্চলে খুন বা হত্যাকান্ড সংঘটিত হলে গোটা দেশে এ নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হতো। মানুষকে সতর্ক হতে দেখা যেতো। কিন্তু এখন একটি হত্যাকান্ডের আলোচনা থামতে না থামতেই আরেক নৃশংস ঘটনা এসে সেটাকে চাপা দিচ্ছে। পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যাচ্ছে হত্যা ও খুনের খবর। টিভির নব ঘুরালেই শোনা যাচ্ছে নিহতের স্বজনদের আর্তনাদ আহাজারি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট হচ্ছে প্রতিদিন এ ধরনের একাধিক নির্মম ও নিষ্ঠুর ঘটনার খবর।
অতি সম্প্রতি কলেজছাত্রী খাদিজাকে কুপিয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা এবং পিতা কর্তৃক দু’টি পুত্রকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার ঘটনা শুধু সিলেট অঞ্চল নয়, বরং গোটা দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। হতভম্ব করেছে সকল সচেতন ও বিবেকবান মানুষকে।
অক্টোবরের গোড়ার দিকে দিরাই উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ছবি চৌধুরী সহোদর যুক্তরাজ্য প্রবাসী আফরোজ চৌধুরী গ্রামের বাড়িতে প্রতিপক্ষের অতর্কিত হামলায় নিহত হন। গত ৬ অক্টোবর বড়লেখায় ভাতিজার হাতে খুন হন কাকী মায়া দাস।
গত ১৪ অক্টোবর বিশ্বনাথে আজদর আলী নামক জনৈক নৈশ প্রহরী খুন হন। দুর্বৃত্তরা রাতে তাকে ছুরিকাঘাত করলে তিনি মারা যান। গত ১৮ অক্টোবর দৈনিক পত্রিকা গুলোতে  ‘বড়লেখায় এক মাসে ৫ খুন’ শীর্ষক এক সংবাদ প্রকাশিত হয়। এছাড়া একই দিনে উক্ত পত্রিকায় ছাতকের জাউয়াবাজার কলেজ ক্যাম্পাসে দু’ছাত্রের হাতাহাতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে এক ছাত্র নিহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়।
একই দিন ‘ফিরাযাত্রা’য় শ্বশুরবাড়ীতে জামাই খুনের খবরও ছাপা হয়। গত ১৮ অক্টোবর ছাতকে এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। গত ২১ অক্টোবর বড়লেখায় হাকালুকি হাওরের চৌচালা বিলের পাহারাদার আহসান আলীকে খুন করা হয়। গত ২৪ অক্টোবর ছাতকে সুরমা নদী থেকে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ২১ অক্টোবর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মঈদুর মিয়া নামক এক যুবক প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়।
গত ৩১ অক্টোবর মৌলভীবাজার শহরের সৈয়ারপুর এলাকায় রিনা ভৌমিক নামক এক মহিলাকে কুপিয়ে হত্যা করে তারই ছেলে উৎপল ভৌমিক। এভাবে গত এক মাসে শুধু সিলেট অঞ্চলে আরো অনেক হত্যাকান্ড ও খুনের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি।
ইদানিং যে হারে হত্যাকান্ড ও খুনের ঘটনা ঘটছে এতে এ অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় সাধারণ লোকজন ছাড়াও সচেতন মহল গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও উৎকন্ঠিত।
অনেকের মতে, সামাজিক অস্থিরতা, অশান্তি এবং অপরাধীদের উপযুক্ত ও ত্বরিৎ শাস্তি না হওয়ায় এ ধরনের হত্যাকান্ডের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ দমনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনসহ অন্যবিধ কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে অধিক ব্যস্ত ও যত্নবান থাকতে দেখা যায়। এটাও দেশব্যাপী হত্যাকান্ড ও খুনের মতো নিষ্ঠুর ও নৃশংস ঘটনার বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে।
একটি দেশের উন্নতি অগ্রগতির অন্যতম পূর্ব শর্ত হচ্ছে জনগণের শান্তিপূর্ণ বসবাস ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপন। এটা না থাকলেও কোন বিচারেই একটি দেশকে উন্নত দূরে থাক উন্নয়নমুখী বা উন্নয়নশীল দেশ বলা যায় না। শুধু জিডিপির হার বৃদ্ধি কিংবা গড় আয় বা গড় আয়ূ বৃদ্ধি দিয়ে একটি দেশকে সুখী দেশের কাতারে ফেলা যাবে না।
এদেশের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ আশা করেন সিলেট অঞ্চলসহ গোটা দেশে নৃশংস ও নির্মম হত্যাকান্ড ও খুনের ঘটনা অচিরেই বন্ধ হবে। আর এটা করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সকল বাহিনী তথা সরকারের উর্ধ্বতন ও ক্ষমতাসীন মহল এ ব্যাপারে যত্নবান হবেন।