বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপে ২৮ শিশুর মৃত্যু, লাইসেন্স ছিল না রিড ফার্মার

ffff
রাশেদ রাব্বি ও হাসিব বিন শহিদ : প্যারাসিটামল সিরাপ তৈরির কোনো লাইসেন্স ছিল না ‘মেসার্স রিড ফার্মা লিমিটেডের। পাশাপাশি সক্ষমতা না থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক বিবেচনায় ওষুধ প্রস্তুতির লাইসেন্স পেয়েছিল বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। আর এ কোম্পানির তৈরি ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ পান করে ২৮ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হলেও আদালতের রায়ে খালাস পেয়েছেন সব আসামি। মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তার চরম অযোগ্যতা ও ব্যর্থতার কারণেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে এই রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়। সোমবার ঢাকার ড্রাগ আদালতের বিচারক এম আতোয়ার রহমান এই রায় ঘোষণা করেন।
চাঞ্চল্যকর এ মামলায় হেরে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্বয়ং মন্ত্রণালয়। এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বিকালে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের কর্মকর্তাদের উপযুক্ত তথ্য-উপাত্তসহ তলব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি সংগ্রহ করতে না পেরে এদিন দুপুরে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক মো. গোলাম কিবরিয়া এ সংক্রান্ত লিখিত প্রতিবেদন মন্ত্রীর কাছে দাখিল করেন।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মো. নাসিম বলেন, ‘২০০৯ সালে ভেজাল ওষুধের কারণে বেশকিছু শিশুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে আদালতে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি চাওয়া হয়েছে। রায়ের কপি হাতে এলে তা বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসনের কেউ যদি দায়িত্বহীনতার পরিচায় দিয়ে থাকেন তাহলে তাকে উপযুক্ত শাস্তি পেতে হবে। এ ধরনের ঘটনায় কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’ স্বাস্থ্য সচিবকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মেসার্স রিড ফার্মা লিমিটেড ব্রাহ্মণবাড়িয়া কর্তৃক প্রস্তুতকৃত টেমসেট (প্যারাসিটামল সাসপেনশন, ব্যাচ নং-৩) সংক্রান্ত মামলাটি ২০০৯ সালে দায়ের করা হয়। ঔষধ প্রশাসনের পরিচালকের নির্দেশে ঢাকা শিশু হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক এআর খানের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় ওষুধটির নমুনা। ওষুধটির একটি মাত্র বোতল তখন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। যেটা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়। ল্যাব পরীক্ষায় ওষুধটিতে ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশ প্যারাসিটামল শনাক্ত করা হয়, যা সরকার কর্তৃক মানবহির্ভূত বলে ঘোষিত হয়। তবে ওই নমুনায় শিশুমৃত্যুর কারণ হিসেবে বিবেচিত বিষাক্ত ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালের ১০ আগস্ট নাারায়ণগঞ্জের তৎকালীন ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক নায়ার সুলতানা সেখান থেকে একই কোম্পানির প্যারাসিটামল সাসপেনশন, ব্যাচ নং-৫ এ ক্ষতিকারক ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল শনাক্ত হয়েছে। যে মামলাটি বিচারাধীন।’
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধ প্রশাসনের দাবি অযৌক্তিক। কারণ এই কোম্পানির ওষুধ বেসরকারিভাবে পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা বিষাক্ত ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল পেয়েছে। তাছাড়া তারা মাত্র একটি স্যাম্পলের পরীক্ষা করেছে। কিন্তু প্রশাসন চাইলেই বাজার থেকে আরও স্যাম্পল জোগাড় করে পরীক্ষা করতে পারত।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবম ফারুক বলেন, ‘এ প্রতিষ্ঠানটিকে (রিড ফার্মা) ২০০৩ সালে লাইন্সেস দেয়া হয়। তখন তাদের ওষুধ প্রস্তুতের মতো কোনো অবস্থায়ই ছিল না। শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় তারা লাইসেন্স পেয়েছিল। এমনকি প্যারাসিটামল সিরাপ বানানোর কোনো লাইন্সেসও তাদের ছিল না। সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তারা এ সিরাপ তৈরি করত।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঔষধ প্রশাসন ওই সময় মাত্র একটি নমুনা সংগ্রহ করে। অথচ তারা বাজার থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করতে পারত। অথচ একই কোম্পানির ওষুধ প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ড. এমআর খান এবং অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন পরীক্ষা করে তাতে ক্ষতিকারক ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল শনাক্ত করেন। অথচ ঔষধ প্রশাসন সেখানে এ (ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল) বিষাক্ত উপাদান পায়নি। এ থেকে প্রশাসনের ব্যর্থতার পরিচয় পাওয়া যায়।’
জানতে চাইলে ড্রাগ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর নাদিম মিয়া বলেন, ‘এ মামলায় পুরো ব্যর্থতাই ঔষধ প্রশাসনের। মামলার আলামত সঠিক স্থান থেকে জব্দ করা হয়নি। নিয়ম অনুসারে মামলার আলামত চার ভাগে বিভক্ত করতে হবে। জব্দকৃত আদালত যে রিড ফার্মার তার কোনো প্রমাণ ছিল না। আলামত সঠিকভাবে উপস্থাপন না করায় আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে বলেই আদালত আসামিদের খালাস দিয়েছেন।’
বিষয়টি জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘রিড ফার্মা প্যারাসিটামল সাসপেনশন তৈরির জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত হলেও তারা সিরাপ তৈরি করত, যা আইনগতভাবে অবৈধ।’ তবে এ মামলার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি নেই বলে দাবি করেন তিনি। কিবরিয়া বলেন, ‘তখন শিশু হাসপাতাল থেকে মাত্র একটি নমুনাই আমাদের দেয়া হয় এবং তৎকালীন পরিচালকের নির্দেশে ওই একটি মাত্র নমুনা দিয়েই মামলাটি দায়ের করা হয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কোনো দায়িত্বহীনতা ছিল না।’
মামলার বাদী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী চারটি নমুনা সংগ্রহের কথা থাকলেও শিশু হাসপাতাল থেকে তাকে একটি মাত্র নমুনা দেয়া হয়। তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় ওই নমুনা নিয়েই কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মামলাটি দায়ের করা হয়। এক্ষেত্রে আমি কোনো দায়িত্বে অবহেলা করিনি।’
২০০৯ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে রিড ফার্মার বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ পানে কিডনি নষ্ট হয়ে ২৮ শিশু মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। কারখানায় ভেজাল ও নিুমানের প্যারাসিটামল তৈরির অভিযোগ এনে ২০০৯ সালের ১০ আগস্ট ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, রিড ফার্মার টেমসেট সিরাপ (প্যারাসিটামল) এবং নিডাপ্লেক্স সিরাপ (ভিটামিন বি কমপ্লেক্স) খেয়ে কিডনি অকেজো হয়ে শিশু মারা গেছে মর্মে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই কয়েকটি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ঔষধ প্রশাসন পরিদফতর জনস্বার্থে ওই ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। শিশু হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এমআর খান ও বিএসএমএমইউর সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন (সম্প্রতি প্রয়াত) এবং এইচএসকে আলম ওই দুটি সিরাপের নমুনা সংগ্রহ করে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করান। ২৯ জুলাই ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার রিপোর্টে বলা হয়, এগুলোতে ক্ষতিকর ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল মেশানো হয়েছে, যা মূলত প্লাস্টিক বা চামড়ার রঙের থিনার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এগুলো মানুষের দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই প্যারাসিটামল পান করে শিশু মারাও গেছে। মামলা করার পর আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। মিজানুর রহমান ওই বছরের ১২ অক্টোবর আত্মসমর্পণ করলে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত তাকে কারাগারে পাঠান।
ঘটনার পর মামলার এজাহারের সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যে গরমিল পরিলক্ষিত হয়। এজাহারে  বলা হয়েছিল, রিড ফার্মার প্যারাসিটামলে বিষাক্ত উপাদানের কারণে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জমা দেয়া অভিযোগপত্রে বলেন, ওই প্যারাসিটামলে ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল পাওয়া যায়নি। তবে ওই ওষুধ ছিল নিম্নমানের। বিচার চলাকালে আলোচিত এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের উপপরিচালক এইচএসকে আলম, ঔষধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন, একই অধিদফতরের ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবের সহকারী বিশ্লেষক মো. আবু বকর সিদ্দিক। সোমবার ঘোষিত রায়ে বলা হয়, ওষুধের নমুনাকে চার ভাগে ভাগ করে এক ভাগ আদালতে, এক ভাগ বিশ্লেষককে (এনালিস্ট), এক ভাগ আসামিকে এবং আরেক ভাগ মামলা দায়েরকারী কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রাখতে হয়। কিন্তু এ মামলায় উদ্ধার করা রিড ফার্মার প্যারাসিটামলে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি এবং উদ্ধার করা এ ওষুধ রিড ফার্মার কিনা, সে সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। এ কারণে আসামিদের খালাস দেয়া ছাড়া উপায় নেই।
প্রসঙ্গত, এর আগে ভেজাল প্যারাসিটামল তৈরির দায়ে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যালসের অন্যতম মালিক, ব্যবস্থাপকসহ তিনজনকে ১০ বছর কারাদণ্ড দিয়েছিলেন এই আদালত। এছাড়া ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে ১৯৯২ সালে ৭৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ওষুধ আইনে করা আরেকটি মামলায় বিসিআই ফার্মার ছয় কর্তাব্যক্তিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত।

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন