আইভীর বক্তব্য, আ’লীগে ক্ষোভের আগুন, গণপদত্যাগের আশংকা

iv1_32403_1480457051

বিশেষ প্রতিবেদন : অনৈক্যের ছাইচাপা আগুন শেষ পর্যন্ত ক্ষোভের দাবানলে পরিণত হতে চলেছে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের তৃণমূলে। প্রয়াত ভাষাসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য একেএম সামসুজ্জোহা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরূপ মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে নেতাকর্মীরা শেষ পর্যন্ত ‘গণপদত্যাগ’র সিদ্ধান্তে যেতে পারেন বলেও শোনা যাচ্ছে।

সূত্র বলছে, শুধু সিটি কর্পোরেশন এলাকাধীন ২৭টি ওয়ার্ড নয়, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর, সোনারগাঁসহ অন্যান্য সাংগঠনিক থানা এবং জেলা আওয়ামী লীগের নেতারাও বিষয়টি নিয়ে চরমভাবে ক্ষুব্ধ। তারা জানিয়েছেন, দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশনায় বিভেদ ভুলে সবাই যখন নৌকার জন্য মাঠে নামতে শুরু করেছেন ঠিক তখন বিভেদের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন আইভী নিজেই।

প্রসঙ্গত, ২৭ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে নাসিক নির্বাচন নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কৌশল নির্ধারণী এক বৈঠকে আইভী নতুন রূপে আবির্ভূত হন। নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করা নিয়ে তিনি বলেন, ‘শামীম ওসমান থাকলে ভালো, না থাকলে আরও ভালো’। এ সময় তিনি শামীম ওসমানের বাবা প্রয়াত একেএম সামসুজ্জোহাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তার (শামীম ওসমান) বাবার অবদানের চেয়ে আমার বাবার অবদান কম কী ছিল? তার বাবা দল করে টাকা কামাই করেছেন। আর আমার বাবা দল করে অর্থ-সম্পদ খুইয়েছেন।’

প্রয়াত সামসুজ্জোহাকে নিয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভীর এমন বক্তব্য শুনে হতবাক হয়ে যান নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রবীণ ও ত্যাগী নেতারা। এ নিয়ে দলের তৃণমূল পর্যায় থেকে শীর্ষপর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে চরম ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত (মরণোত্তর) ভাষাসৈনিককে নিয়ে কটাক্ষ করায় সাধারণ মানুষের মাঝেও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, শুধু দলীয়ভাবেই নয়, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সংগঠককে নিয়ে আইভীর এমন বক্তব্য মেনে নিতে পারছেন না দলমত নির্বিশেষে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ।

নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অনেকে বলেন, সেলিনা হায়াৎ আইভীর এমন দম্ভোক্তি মন্তেব্যের কারণে মেয়র নির্বাচনে নৌকাডুবি হলে তার দায়ভার আইভীকেই বহন করতে হবে। তারা আইভীর আচরণকে ‘হীন মনসিকতা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘নৌকা’ প্রতীক পেয়ে আইভীর দাম্ভিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ছেলের ওপর রাগের কারণে তিনি সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের মরহুম বাবাকে চরমভাবে অসম্মান করেছেন। এজন্য আইভীর প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রয়াত সামসুজ্জোহার রাজনৈতিক শিষ্য আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়েছেন, আমি অসুস্থ। তাই পত্রিকা বা টিভি কোনো কিছুই দেখতে পারিনি। তবে বিষয়টি আমি শুনেছি। আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জোহা ভাই ছিলেন আমার রাজনৈতিক গুরু, তার হাত ধরে আমি রাজনীতিতে এসেছি। যদি আইভী এমন বক্তব্য দিয়ে থাকে তবে সেটা খুবই নিন্দনীয় এবং এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। কারণ, সামসুজ্জোহা একজন কর্মীবান্ধব ও প্রকৃত বঙ্গবন্ধুর সৈনিক ছিলেন। যিনি কোরবানির জন্য কেনা গরু বিক্রি করে দিয়ে কর্মীদের ঈদ করতে টাকা দিয়েছিলেন। আর আজ তার বিরুদ্ধে এহেন মন্তব্য শুনে আমি নিজেই লজ্জিত।’

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সামিউল্লাহ মিলন জানান, মুক্তিযুদ্ধে জোহা ভাইয়ের অবদান অনস্বীকার্য। ভারতের ত্রাণ শিবিরে তিনি ‘ত্রাণবন্ধু’নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তিনি বলেন, এর আগেও আইভী আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের শহীদ মিনার থেকে বের করে দিয়েছিলেন। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন কেঁদেছিলাম। আজও আমাদের বুকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কারণ জোহা ভাই আমাদের গুরুই ছিলেন না, ছিলেন পথপ্রদর্শক। তাই আইভীর এই ঔদ্ধেত্যের বিচার বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছেই দিলাম।

বন্দর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশীদ বলেন, সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে শামীম ওসমানের ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই, তাদের মধ্যে বিরোধটা নীতিগত। কারণ শামীম ওসমান দল ও নেত্রীর প্রশ্নে আপস করেন না। এছাড়া আইভীর বাবা প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আলী আহাম্মদ চুনকাকে নিয়ে শামীম ওসমান কখনোই বিরূপ মন্তব্য করেননি। সেখানে জোহা ভাইয়ের মতো একজন কর্মীবান্ধব নিলোর্ভ মানুষকে নিয়ে এমন বক্তব্য দিয়ে আইভী প্রমাণ করেছেন তিনি কখনোই ঐক্যের পথে ছিলেন না। ঐক্য তিনি চানও না।

এ ব্যাপারে সোনারগাঁ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিক অ্যাডভোকেট সামসুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, প্রয়াত একেএম সামসুজ্জোহা একজন নির্লোভ নেতা ছিলেন। তার পরিবার বাংলাদেশের কয়েকটি ধনী পরিবারের একটি। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দল ও কর্মীদের জন্য এতটাই করেছিলেন যে, নিজের বাড়িটি পর্যন্ত নিলামে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৩২ নম্বরের বাড়িতে বঙ্গবন্ধু পরিবারকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করতে গিয়ে তিনি গুলি খেয়েছিলেন। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনি মোশতাকের মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবকে পায়ে ঠেলে দিয়েছিলেন তিনি। জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যার সময় তিনি ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী একই সেলে বন্দি ছিলেন। এমন একজন নেতাকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্যকারীর নাম মুখে আনতেও ঘৃণা হচ্ছে আমার। তিনি বলেন, বিষয়টি আর এখন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত না হলে আমরা গণপদত্যাগ করব। কারণ অনেক হয়েছে, আর না, পানি মাথার উপরে উঠে গেছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গোপীনাথ দাস জানান, আইভী কেন্দ্রে গিয়ে নারায়ণগঞ্জে সংখ্যালঘু নেতাদের প্রতিনিধি দল পাঠাতে বলেছেন। তারাও মনে করেন, প্রতিনিধি দলের আসা উচিত এবং আইভীর পরিবার দেওভোগে হিন্দুদের যে সম্পত্তি ‘জিউস পুকুর’ দখল করে রেখেছে সেটি আগে উদ্ধার করতে হবে।

রণাঙ্গনের এ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জানান, সামসুজ্জোহার বাবা খানসাহেব ওসমান আলী ১৯৪৬ সালে ঢাকার নবাব হাবিবুল্লাহর জামানত বাজেয়াপ্ত করে এমএনএ নির্বাচিত হয়েছিলেন। সামসুজ্জোহা নিজেও এমএলএ এবং জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাদের বাড়ি বায়তুল আমানে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ’৭৫-পরবর্তী সময়ে তাদের চাষাড়ার বাড়ি হীরামহল নিলামে উঠেছিল, যা আদমজীর হাজার হাজার শ্রমিক চাঁদা দিয়ে রক্ষা করেছিলেন। সেই নেতাকে নিয়ে এমন অশালীন মন্তব্য করে আইভী নিজের পারিবারিক পরিচয়টি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এর বিচার আওয়ামী লীগ সভানেত্রীই করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

এ ব্যাপারে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, সহসভাপতি চন্দন শীল, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফ উল্লাহ বাদল, সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিনসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতারা। তারা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত সামসুজ্জোহা ওসমানকে নিয়ে আইভীর বিরূপ মন্তব্য চরম দুঃসাহস। এর আগে নেত্রী ও দলের বিরুদ্ধেও আইভী কথা বলেছেন। মনে হয়, তিনি নৌকা মার্কাকে মেনে নিতে পারছেন না। তারা বলেন, সঠিক বিচার না পেলে আমরা গণপদত্যাগ করব। নেত্রী বিদেশ থেকে ফিরে এলেই আমরা সিদ্ধান্ত নেব।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দীপু জানিয়েছেন, একেএম সামসুজ্জোহা এমন একজন নেতা ছিলেন, যাকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের কেউই মন্তব্য করেননি। তাই তাকে নিয়ে এভাবে মন্তব্য করে সেলিনা হায়াৎ আইভী তার প্রয়াত বাবা আলী আহাম্মদ চুনকার সম্মানকেই ভূলুণ্ঠিত করেছেন।

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন