গবেষণালব্ধ যে চারটি নিয়মে আপনি আরো ভালো বাবা-মা হবেন

138

লাইফস্টাইল ডেস্ক : সকল বাবা-মা একটা সময়ে এসে বলেন: আমার বাচ্চাদের মাথায় কী ঘটে চলেছে?
আর আপনি যদি আপনার বাচ্চাদেরকে না বুঝতে পারেন তাহলে তাদের যা দরকার তা আপনি তাদেরকে দিতে পারবেন না। সম্প্রতি সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে হেলিকপ্টার বাবা-মা হওয়ার প্রবণতাই বেশি দেখা গেছে। অর্থাৎ সন্তানকে যত দ্রুত সম্ভব ক্রমাগত প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠা দুনিয়ার জন্য প্রস্তুত করার প্রবণতা।

কিন্তু ৩ বছরের একটি বাচ্চার কী তাই দরকার? বা ১০ বছরের বাচ্চার কী দরকার? ১৫ বছরের বাচ্চার কী চাই? এদের সকলেরই বয়সের ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন জিনিস দরকার।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অ্যালিসন গোপনিক। তিনি বাচ্চাদের সঠিকভাবে লালন-পালন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদেরও একজন। তার নতুন বইয়ের নাম ‘দ্য গার্ডেনার অ্যান্ড দ্য কার্পেন্টার : হোয়াট দ্য নিউ সায়েন্স অফ চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট টেলস আস অ্যাবাউট দ্য রিলেশনশিপ বিটুইন প্যারেন্টস অ্যান্ড চিলড্রেন’।

একজন মা এবং দাদি হিসেবে তিনি এ ব্যাপারে সতর্ক যে আমার নিজেরাও শিশু ছিলাম বলেই যে শিশুদের প্রয়োজনীয়তাগুলো আমার বুঝতে পারব তেমনটা ভাবা ঠিক নয়। এমনকি আমাদের শিশুদের হয়ত একেবারে উল্টো কোনো প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

আসুন দেখে নেওয়া যাক বাচ্চাদের মস্তিষ্কে কী ঘটে চলেছে সে সম্পর্কে বিজ্ঞান কী বলছে এবং বেড়ে ওঠার সাথে সাথে আপনার কাছে তাদের চাহিদাগুলোই বা কী?

১. কাঠুরে নয় বরং বাগানের পরিচর্যাকারী মালি হন
ক্ষুদ্র-ব্যবস্থাপনার চলমান প্রবণতাটি হলো একটি শিশুর অস্তিত্বের প্রতিটি কণায় হস্তক্ষেপ করা এবং হেলিকপ্টার বাবা-মা হওয়া। কিন্তু এটি বাচ্চা লালন-পালনের সঠিক পদ্ধতি নয়। কঠোর সুব্যবস্থাপনাপূর্ণ পরিকল্পনা কোনো কাজে আসবে না। আর এতে বাচ্চাদের জন্য সেরাটা নেই। কেন?

বাচ্চাদের যত্ন নেওয়া অনেকটা বাগান পরিচর্যা করার মতো। আর বাবা-মা হওয়ার মানে হলো বাগান পরিচর্যাকারী মালির মতো হওয়া।

অন্যদিকে, বাবা-মা হয়ে ওঠার বিদ্যমান মডেলে বাবা-মা হওয়ার মানে অনেকটা কাঠমিস্ত্রি হওয়ার মতো। বৈচিত্র্যপূর্ণতা এবং এলোমেলো দশা কাঠমিস্ত্রির শত্রু। সুনির্দিষ্টতা এবং নিয়ন্ত্রণ তার বন্ধু। দুইবার পরিমাপ করুন একবার কাটুন।

কিন্তু আমরা যখন বাগান করতে যাই আমরা উদ্ভিদের জন্য একটি সুরক্ষিত ও প্রতিপালন জায়গা সৃষ্টি করি। এতে কঠোর পরিশ্রম দরকার হয়, মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। প্রচুর সংখ্যক শক্তি নিঃশেষকারী খননকার্য এবং পরিচর্যামূলক কাজ করতে হয়।

প্রকৃতি মানুষের মস্তিষ্কের উন্নয়নে বেশ উত্তম একটি পদ্ধতি গড়ে তুলেছে। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে দুনিয়াকে উদঘাটন করার মধ্য দিয়ে সেই জ্ঞানকে শোষণ করে কাজে লাগানোর স্তরে গিয়ে পৌঁছায়।

কচি মস্তিষ্কের কাজ হলো দুনিয়াকে উদঘাটন করার মাধ্যমে জানা। আর বয়স্ক মস্তিষ্কের কাজ হলো সে জ্ঞানকে কাজে লাগানো।

সুতরাং বাচ্চাদের প্রতিটি মুহূর্ত পূর্বপরিকল্পিত কর্মসূচিতে আবদ্ধ করতে যাবেন না। এবং তাদের চোখটি খুলে যাওয়ার মুহূর্ত থেকেই তাদেরকে ডাক্তার বা আইনজীবী বানিয়ে ফেলতে চাইবেন না।

বরং বাচ্চাদেরকে নিজে নিজেই দুনিয়াটাকে উদঘাটন করতে বা বুঝতে দিন। এরপর যখন তাদের মস্তিষ্ক তাদের উদঘাটিত জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর স্তরে প্রবেশ করতে তখন আপনার কাজ হবে তাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করা।

২. বাচ্চার বয়স ৬ বছরের নিচে? তাহলে খেলতে দিন
ছোট শিশুদের এখনই স্যাট পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার দরকার নেই। তারচেয়ে বরং তাদেরকে দুর্গ বানানো, টি পার্টি করা, নকল বাড়ি বানানো এবং বড়দের মতো করে পরিবার ও সংসার পরিচালনার ভানমূলক খেলা খেলতে দেন।

আর হ্যাঁ, খেলা শুধু মজা করা বা নিছকই খেলা। এর মধ্য দিয়ে বাচ্চারা প্রাপ্তবয়স্কদের দক্ষতাগুলোও শিখে নয়।

বাচ্চাদেরকে যদি ধুরি খুদে বিজ্ঞানী তাহলে খেলা হলো তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পদ্ধতি। বাচ্চারা প্রতিষ্ঠিত রীতি-নীতি রপ্ত করার বদলে বরং তাদের অনুমানগুলো কীসে লঙ্ঘিত হয় তা পর্যবেক্ষণ করে। এবং এর মধ্য দিয়েই দুনিয়াটা কীভাবে চলে সে সম্পর্কে তারা ধারণা লাভ করে। এবং জীবন সম্পর্কে নিজেদের ধারণাগুলোর উন্নয়ন ঘটায়।

বাচ্চারা তাদের অনুমানগুলোর বিপরীত কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চায়। আর খেলাই হলো তাদের সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পদ্ধতি।

অন্যদিকে, আমরা প্রাপ্তবয়স্করা আমাদের ধ্যান-ধারণাগুলোর অনুকুল সাক্ষ্য-প্রমাণ সন্ধান করি, বিপরীত কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ এড়িয়ে চলি। কিন্তু শিশুরা নিজেদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে চায় বলেই হয়তো তারা এতো দ্রুত নতুন নতুন জিনিসি শিখতে পারে।

সুতরাং বাচ্চাদেরকে খেলার সময় স্বাধীনভাবে চলতে দিন। কারণ আপনি যদি তাকে নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি শিখিয়ে দেন তাহলে সে হয়ত নিজে থেকে কিছু আবিষ্কার করতে পারবে না। বাচ্চাদেরকে শিখতে বাধ্য না করে বরং তাদের জন্য শেখার একটি সুরক্ষিত, স্থিতিশীল ও ভালোবাসাপূর্ণ জায়গা তৈরি করে দিন।

শিশুদের মনকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে গড়ার চেষ্টা না করে বরং দুনিয়ার সম্ভাবনাগুলো তাদেরকে নিজে নিজেই উদঘাটন করার সুযোগ তৈরি করে দিন। বাচ্চাদেরকে কীভাবে খেলতে হবে তা না শিখিয়ে বরং খেলনা ও খেলার পরিবেশ তৈরি করে দিন। আমরা তাদেরকে শিখতে বাধ্য করতে পারি না বরং শেখার সুযোগ করে দিতে পারি।

৩. বাচ্চার বয়স ৬ বছরের বেশি? তাদের শিক্ষা দেন
বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়ার পর তাদের প্রাকৃতিক উদঘাটন এর সঙ্গে দক্ষতার চর্চায় ভারসাম্য স্থাপন করতে হবে। এতে তারা বাস্তব জগতে তৎপর হতে পারবে।

স্কুলশিশুদের জন্য কাজটি হলো নিজে নিজে উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হয়ে ওঠা। নিজেদের সংস্কৃতির বিশেষ দক্ষতাগুলোর চর্চা এবং রপ্ত করা। বিশেষ করে সামাজিক দক্ষতাগুলো রপ্ত করা।

এখনই সময় কোনো কিছু কীভাবে করতে হয় তাদেরকে তা দেখিয়ে শেখানো। আপনি তাদের কিছু শেখালেন আর তারা আপনার অনুকরণ করলো। অনেক শিক্ষানবীশ কর্মীর মতো।

৬ বছরের কম বয়সী বাচ্চারা কোনো কিছুতে মনোযোগ নিবদ্ধ করতে পারে না। পারার কথাও না। তাদের কাজ হলো তাদের দেখা নতুন দনিয়াটাকে উদঘাটন ও আবিষ্কার করা।

কিন্তু ৬ বছরের পর তাদের মস্তিষ্ক কিছুটা নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে শুরু করে। আর এ সময় তাদেরকে সহজ দক্ষতাগুলো রপ্ত করতে সহায়তা করার মাধ্যমে বড় হওয়ার পর সাফল্য অর্জনে সহায়তা করা হয়।

৪. কিশোর বয়সীদের দরকার শিক্ষানবীশি
স্নায়ুবিজ্ঞানীদের বিশ্বাস কিশোর মস্তিষ্কে দুটি পদ্ধতি সক্রিয় থাকে : ১) অনুপ্রেরণা, ২) নিয়ন্ত্রণ

হরমোনগুলো যখন বাচ্চাদেরকে বয়ঃসন্ধিক্ষণের দিকে নিয়ে যায় তখন অনুপ্রেরণার অংশটির দ্রুত উন্নয়ন ঘটতে থাকে। কিশোর বয়সীদের কাছ ভালো জিনিস আরো অনেক বেশি ভালো মনে হতে থাকে।

সাধারণত ১০ বছর বয়স থেকেই এই পদ্ধতিটি দুর্বার গতিতে সামনে এগিয়ে চলতে থাকে। বিরামহীনতা, উৎসাহ-উদ্দীপনা, আবেগগত তীব্রতা আর প্রতিটি লক্ষ্য অর্জনের ব্যাপারে উদ্যম, প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং প্রতিটি সংবেদনার অভিজ্ঞতা অর্জন এগুলো হলো এই বয়সের বৈশিষ্ট্য।

আর দ্বিতীয় পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রণ, তাদেরকে ওই শক্তির সদ্ব্যবহারে সক্ষম করে তোলে। কিন্তু দুঃখজনক হলো এই পদ্ধতি গড়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগে। আর এ কারণেই হয়তো কিশোর বয়সীরা অনেক সময় বখে যায়।

তবে কিশোর বয়সীরা সবসময়ই এমন মুর্তিমান আতঙ্ক ছিল না। জীবনের একটি স্বতন্ত্র কালপর্ব হিসেবে বয়ঃসন্ধিক্ষণ স্বীকৃতি পায় এই মাত্র ২০ শতকে। এর আগে একজন মানুষ হয় শিশু আর নয়ত প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। রূপান্তরকালীন কোনো সময় ছিল না।

২০ শতকের আগে শিশুরা কিশোর বয়সীদের দ্বারা ঘেরা থাকত না। প্রাপ্তবয়স্করা তাদের দিকনির্দেশনা এবং প্রশিক্ষণ দিতেন আর তার কাজ করত। এখন কিশোর বয়সী হওয়ার মানে হলো বাবা-মা ছাড়াই কীভাবে লক্ষ্য অর্জন করতে হবে তা শেখা।

খুবই সহজ এবং সরল। এই সকল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং শক্তি নিয়ে তাদের কিছু একটা কাজ দরকার করার জন্য। যাতে তারা গাড়ি দুর্ঘটনা, গর্ভধারণ বা বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার মতো অনিষ্টকর কিছু করে না বসে।

এক শ বছর আগেও প্রাপ্ত বয়স্কদের তত্ত্বাবধানেই শিশু-কিশোররা জীবন-যাপনের দক্ষতাগুলো রপ্ত করত। কিন্তু দুনিয়া বদলে গেছে। সুতরাং কিশোর বয়সীদেরকে সহায়তা করার সেরা উপায়টি কী? বেশি বেশি বাড়ির কাজ এবং নিয়মিত পাঠক্রমবহির্ভুত তৎপরতাই এর সঠিক উত্তরটি নয়। তাদের দরকার আধুনিক দিনের উপযোগী শিক্ষানবীশি: ইন্টার্নশিপ।

এমন কিছু যা বাস্তব কাজের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। যেখানে তারা দক্ষতাগুলো গড়ে তুলতে পারবে, লক্ষ্য অর্জন করবে এবং ওই শক্তির উৎপাদনশীল ব্যবহার করতে পারবে। যাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি তাদের বিরামহীন অনুপ্রেরণার ওপর একটি নিয়ন্ত্রণমূলক হ্যান্ডেল অর্জন করতে পারে এর সদ্ব্যাবহার করার মাধ্যমে প্রতিদান অর্জনের জন্য।

সুতরাং কিশোর বয়স থেকেই বাচ্চারেদকে নানা দক্ষতা অর্জন এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। কিশোর বয়সী বাচ্চাদেরকে নিয়মিতভাবে কাজে নিয়ে যাওয়াকে একটি রুটিন কর্মসূচিতে পরিণত করুন। কলেজ শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানী এবং পণ্ডিতদের কর্ম আরো বেশি সময় ধরে দেখতে এবং তাদেরকে সহায়তা করতে পারে। শুধু লেকচার শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এ ছাড়া কিশোর বয়সীদের জন্য ক্যাম্পিং এবং ভ্রমণ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে।

(টুডে সংবাদ/মেহেদী)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com