‘হ্যামিলনের জাদুকরি বাঁশির’ মতো কোচিং সেন্টারের প্রচারপত্র

0-74

মানসুরা হোসাইন : রাজধানীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কোচিং সেন্টার কম নয়। বিভিন্ন এলাকায় অলিগলিতে রয়েছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আলাদা করে তালিম দেওয়ার এসব প্রতিষ্ঠান। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে তাদের মূল অবলম্বন হচ্ছে বিজ্ঞাপন ও প্রচারপত্র। এসব বিজ্ঞাপন ও প্রচারপত্রে ভাষার যেমন চমৎকারত্ব থাকে, তেমনি থাকে একাধারে অনেক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার।

এসব প্রচারপত্র অনেকটা ‘হ্যামিলনের সেই জাদুকরি বাঁশির’ মতো কাজ করে অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে। তারা হন্যে হয়ে ছোটে এসব কোচিং সেন্টারের দিকে। কখনোবা তাদের মধ্যে এমন ব্যাকুলতা কাজ করে, যেন জিপিএ-৫ হাতের কাছেই রয়েছে। শুধু ধরাটা বাকি। আর সেটা খুব সহজেই কবজা হবে প্রচারপত্র বিলানো ওই কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলে। আর ছুটবেই-বা না কেন? কোচিং সেন্টার এই শত সাধনার ধনটি পাওয়ার গ্যারান্টি দিচ্ছে যে!

সম্প্রতি মোহাম্মদপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, এখানে রাজধানীর ২৪টি স্কুলের বাচ্চারা পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছে। ২০ নভেম্বর থেকে এখানে পরীক্ষা শুরু হয়েছে, শেষ হয়েছে গত রোববার। একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কম করে হলেও দুজন করে অভিভাবক পরীক্ষা শুরু ও শেষ হলে সন্তানকে নিতে এসেছেন। অনেক অভিভাবক, বিশেষ করে মায়েরা নূরজাহান রোডে স্কুলের সামনে ফুটপাতে পত্রিকা বিছিয়ে অপেক্ষা করেছেন। স্কুলটির সামনে অভিভাবকদের পাশাপাশি বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের প্রতিনিধিদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কারও কারও গায়ে ছিল কোচিং সেন্টারের নাম লেখা জ্যাকেট। কোচিং সেন্টারের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের কলম উপহার দেওয়া, পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র থেকে বের করে আনার দায়িত্বও পালন করেন অনেক কোচিং সেন্টারের প্রতিনিধিরা। আর এর সঙ্গে চলে কোচিং সেন্টারের লিফলেট বিতরণ। পরীক্ষার সময় মেয়ের সঙ্গে যাতায়াতের সুবাদে অভিভাবক হিসেবে আমার হাতেও এসেছে মূলত ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত ৩০ থেকে ৪০টি কোচিং সেন্টারের লিফলেট। আর কানে এসেছে সন্তানের জন্য অপেক্ষমাণ অন্য মায়েদের কথা। একদিন এক মা খুব গম্ভীরভরে আরেক মাকে বলছিলেন, ‘ভাবি, বাচ্চাকে কোচিংয়ে ভর্তি করান নাই? কোচিংয়ে না দিলে তো বাচ্চার বেস তৈরি হবে না।’ আর লিফলেট বিতরণের সময় অনেক অভিভাবকদের উৎসাহ দেখে মনে হচ্ছিল সন্তানের সমাপনী পরীক্ষা শেষ হলে এক দিনও সময় নষ্ট করা যাবে না। পারলে এখনই যদি ভর্তি করা যায়!

কোচিং সেন্টারগুলোর লিফলেটের ভাষা
পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীরা বের হবে। তাদের হাতে দিতে হবে কোচিং সেন্টারের লিফলেট ও উপহার। তাই গেটের সামনে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের কর্মীদের ভিড়। প্রথম আলোপ্রচেষ্টা ক্যাডেট একাডেমি রাজধানীর বিভিন্ন নামীদামি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলভিত্তিক ক্যাডেট প্রোগ্রাম চালু করেছে। এ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানের লিফলেট বলছে: ‘রথ দেখা কলা বেচা’ বা ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’-জাতীয় প্রবচনের সঙ্গে সবাই পরিচিত। ক্যাডেট কোচিং হচ্ছে এক ঢিলে অনেক পাখি মারার সুবর্ণ সুযোগ। এতে করে স্কুলের সিলেবাস তো শেষ হবেই, পাশাপাশি কোচিংয়ের ফলে ইংরেজি, গণিত ও বাংলায় ‘বেসিক’ অনেক মজবুত হবে। এখানে ‘আফলাতুন স্যার’ সম্পাদিত ‘অভিযাত্রা ক্যাডেট গাইড’ পড়ানো হয়।

আর প্রচেষ্টা ক্যাডেট একাডেমির লিফলেটে ‘দৃষ্টি আকর্ষণ’-এ বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজিতে ফেল করেন ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। অথচ প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ১২ বছরে একজন শিক্ষার্থীকে প্রথম ও দ্বিতীয় সাময়িক এবং বার্ষিক পরীক্ষায় শুধু ইংরেজি বিষয়ে ৫০০০ নম্বরের পরীক্ষায় পাস করতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী এ প্লাস পেলেও ইংরেজিতে কথা বলতে ও লিখতে পারে না। বিদ্যালয়ের গতানুগতিক পড়াশোনা দারুণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই এ প্রতিষ্ঠান অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেছে, আপনার সন্তানকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করান বা নাই-ই করান, ক্যাডেট কোচিং করাতে ভুলবেন না। ক্যাডেট কলেজের ভর্তি প্রস্তুতি হবে আপনার সন্তানের শিক্ষাজীবনের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। সন্তানের জন্য এর চেয়ে ভালো বিনিয়োগ আর হয় না। আফলাতুন স্যার প্রণীত ‘সংক্ষিপ্ত সাজেশন, সর্বাধিক কমন’-ভিত্তিক মডেল টেস্ট ও প্যাকেজ প্রোগ্রামে আসন সংরক্ষণের জন্যও আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য মোহাম্মদপুরে আফলাতুন ল্যাবরেটরি স্কুল ও পরিচালিত হচ্ছে।

সরকারি ক্যাডেট কলেজ বা ভালো কোনো স্কুলে ভর্তির জন্য গুরুগৃহ ক্যাডেট একাডেমি কোর্স শেষ করার পর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ১১টি চূড়ান্ত মডেল টেস্ট নেয়। আর এখানে ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই মেধা যাচাই করে শিক্ষার্থীর মেধার স্তর নির্ণয় করে তার শিখন-পদ্ধতি নির্ধারণ করে।

ব্যতিক্রম কোচিং সেন্টার তাদের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের আলাদা ব্যাচ করে পড়াচ্ছে। পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সচেতন অভিভাবকদের কাছে এ সেন্টার অঙ্গীকার করে বলেছে, বদলে দেব আপনার সন্তানটিকে। আগামী বছর পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি ১ হাজার ৫০০ টাকা। আর অষ্টম শ্রেণির জন্য তিন হাজার টাকা। তবে চলতি বছরের ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে ভর্তি হলে ৫০০ টাকা ছাড় সবার জন্য। কোনো কারণে কার্যক্রম পছন্দ না হলে জানুয়ারি মাসের প্রথম ১৫ দিনের বেতন পরিশোধ করতে হবে না। এ কোচিং সেন্টারের একটি হটলাইন নম্বরও আছে।

তৃতীয় থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ‘অন্তত এক মাস ম্যাক কোচিং-এ পড়েই দেখো, ইনশা আল্লাহ, ফল পাবেই’ বলে গ্যারান্টি দিয়েছে ম্যাক কোচিং সেন্টার। এতে আরও বলা হয়েছে, এখানকার শিক্ষার্থীদের আর আলাদা প্রাইভেট পড়ার দরকার হয় না।

একজন অভিভাবককে লিফলেট দেওয়া হচ্ছে। ছবি: প্রথম আলোঢাকা ক্যাডেট কোচিং ফ্রি যাচাই ক্লাস ও পড়ানোর কৌশল জানার জন্য অভিভাবকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এটি ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের সাবেক ইংরেজি শিক্ষক ‘রাসেল রায়হান স্যার’ পরিচালিত বলে লিফলেটে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণির একাডেমিক কোচিংয়ের পাশাপাশি এ কোচিংয়ে স্কুলের পড়া তৈরি করে দেওয়া হয় এবং ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করার জন্য ‘শর্ট টেকনিক’ শেখানো হয়। এতে যে সফল হওয়া যায়, তার প্রমাণ হিসেবে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে বিভিন্ন শ্রেণিতে সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ছবিও লিফলেটে ছাপানো হয়েছে। আর এখানে এমনভাবে পড়ানো হয় যে শিক্ষার্থীরা পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পাবেই।

তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিষয়ে এ প্লাস পাওয়ার ৯৯ শতাংশ গ্যারান্টি দিয়েছে উজ্জীবন একাডেমিক কেয়ার। এ কোচিংয়ের পরিচালক হলে ‘সৈকত স্যার’।

ঢাকা, বগুড়াসহ কয়েকটি জায়গায় বাংলাদেশ ক্যাডেট একাডেমির শাখা রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা’ থেকে প্রতিবছর অলাভজনক উদ্যোগ ‘বিএসি বৃত্তি পরীক্ষা’র আয়োজন করে বলে লিফলেটে উল্লেখ আছে। এ ধরনের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিলে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের যথেষ্ট সুযোগ আছে বলেই এ সংগঠনের ধারণা। তাই একজন প্রতিযোগীকে বিরত না রেখে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। যেকোনো স্কুলের তৃতীয় থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফি ২০০ টাকা। কোনো পরীক্ষার্থী ১০০ নম্বরের মধ্যে ৮০ ও ৯০ নম্বর পেলে সাধারণ গ্রেড ও ট্যালেন্টপুলে এককালীন বৃত্তি পাবে ৬০০ টাকা ও ৮০০ টাকা। এ সংগঠন পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় সব ধরনের দুর্বলতা কাটিয়ে এ প্লাস পাইয়ে দেওয়ার গ্যারান্টি দিয়েছে।

স্কুলের সামনে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের বাংলাদেশ ক্যাডেট একাডেমির প্রতিনিধিরা যখন লিফলেট বিলি করছিলেন, তখন অরণি বিদ্যালয়ের অভিভাবক শিমু ইসলাম বললেন, ‘আপনাদের কি মাথা খারাপ? বাচ্চা সমাপনী পরীক্ষা দিচ্ছে। এই পরীক্ষা শেষ করার পর যদি আবার বলি বৃত্তি পরীক্ষা দিতে, বুঝতে পারছেন ছেলে তখন কী করবে? আমাকে আর আস্ত রাখবে না ছেলে।’

পাঠশালা নিজেদের ‘একটি বিষয়ভিত্তিক অনুশীলন কেন্দ্র’ বলে দাবি করেছে। এ কেন্দ্র ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে শুরু করে ঢাকার নামীদামি স্কুলে ভর্তির জন্য কোচিং করাচ্ছে।

সময়ের তালে, সঠিক সিদ্ধান্তে, জীবনের সফলতা—এ স্লোগানকে সামনে রেখে কর্মসূচি পরিচালনা করছে ব্রিলিয়ান্ট’স একাডেমিক ও ক্যাডেট কেয়ার। প্রথম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ছাত্রছাত্রী ও স্বনামধন্য স্কুল ও কলেজের শিক্ষকেরা ক্লাস নেন। অভিভাবকদের অভয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, আপনার সন্তানকে সৃজনশীল করতে আমরা আছি আপনাদের পাশে। আপনার সন্তানের দায়িত্ব আমাদের। এ প্রতিষ্ঠানের একমাত্র উদ্দেশ্য ছাত্রছাত্রীকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়া।

আলোকিত কোচিং সেন্টারে কী নেই? এখানে রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল, সেন্ট যোসেফ স্কুলে ভর্তির জন্য বিশেষ কোচিং করানো হয়। স্কুল কোচিংয়ে প্লে গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রতিটি বিষয়ে কোচিং করানো হয়। ইংরেজিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য কোচিং, চাকরিজীবীদের জন্য সন্ধ্যাকালীন কোচিং, গৃহিণীদের জন্যও বৈকালিক কোচিংয়ের ব্যবস্থা আছে। এই কোচিং সেন্টারে ‌‘মেইক আপ’ ক্লাসেরও ব্যবস্থা আছে।

সেন্ট যোসেফ স্কুলের সাবেক শিক্ষক মণ্ডল স্যার। তাঁর নামেই কোচিং সেন্টারের নাম। এখানে ‘মণ্ডল স্যার’ নিজেই ক্লাস নেন বলে লিফলেটে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৮৫ সাল থেকে এ কোচিং সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকার নামীদামি স্কুলে ভর্তির জন্য এ কোচিং পরিচালিত হচ্ছে। এখানে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দিতে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা হয়।

আবার অনেক কোচিং সেন্টার স্কুলও পরিচালনা করছে। নিউ মেধা সিঁড়ি স্কুল ভর্তি কোচিং সেন্টারের একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গ্রিন হ্যাভেন স্কুল।

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন