মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক, গুনতে হয় অনেক অর্থ

0-74

মাছুম বিল্লাহ :  ‘মেয়েদের সুযোগ সূচক’ বা ‘গার্লস অপরচুনিটি ইনডেক্স’ অনুযায়ী বিশ্বের ১৪৪ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১১তম। মেয়েদের বেড়ে ওঠার, বিকশিত হওয়ার সুযোগ বিচার করে সেভ দ্য চিলড্রেন গত ১০ অক্টোবর এ সূচক প্রকাশ করেছে। এই তালিকায় সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান ছাড়া সবাই বাংলাদেশের ওপরে। বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক, এটি গ্র্যাজুয়েশন লেভেল পর্যন্ত। মাধ্যমিক পর্যায়ে ইতিমধ্যে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা প্রতিটি শ্রেণিতেই সংখ্যায় বেশি। এ চিত্র কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে। আমাদের দেশের মেয়েরা সার্কভুক্ত দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে থাকবে কেন? জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের সংগ্রহ করা এক বছরের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে সেভ দ্য চিলড্রেন। কোন দেশের কী অবস্থা তা যাচাইয়ে পাঁচটি সূচক ব্যবহার করা হয়েছে। ১. বাল্যবিবাহ, ২. কিশোরী বয়সে মাতৃত্ব, ৩. প্রসূতি মৃত্যুর হার, ৪. সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ও ৫. নিম্ন মাধ্যমিক স্কুলে ছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার।

আমি এক অভিভাবককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাঁর দুই মেয়েই কলেজে পড়ে, তাদের কোনো পয়সা লাগে কি না। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, কয়েক দিন পর পর বিভিন্ন অজুহাতে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয় কলেজকে। এখানে বলা প্রয়োজন, সরকার স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেছে, যেটি চমত্কার পদক্ষেপ। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে তথাকথিত কমিটি, তারা বিষয়টিকে কিভাবে ব্যবহার করছে, সে সম্পর্কে কেন্দ্র থেকে বোধ হয় খুব একটা খোঁজখবর রাখা হয় না, যার কারণে মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক হয়েও অভিভাবকদের অনেক অর্থ গুনতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তথাকথিত কমিটিগুলো গঠিত হয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারা, যাঁরা শিক্ষার চেয়ে অর্থ উপায়কেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের যে রায়, ‘সংসদ সদস্যগণ নির্বাচিত না হয়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির প্রধান হতে পারবেন না’ অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিবেদনে কন্যাশিশুদের সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহকে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিশ্বে প্রতি সাত সেকেন্ডে ১৫ বছরের নিচে একটি মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।

বাল্যবিবাহ আসলে কেন হয়? শুধুই অশিক্ষা আর অভাবের কারণে? বর্তমানে বাল্যবিবাহের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে মেয়েদের নিরাপত্তার অভাব। গ্রামের কোনো মেয়ে যখন স্কুলে যায়, পথের ধারে বখাটে ছেলেরা, এমনকি নিজ স্কুলেরও কিছু ছেলে একা কিংবা সংখ্যায় এক-দুজন মেয়ে হলে সর্বদাই তাদের উত্ত্যক্ত করে। মাঝেমধ্যে দু-একটি নিষ্ঠুর ছবি ফেসবুকে দেখি। দুটি মেয়ের মধ্যে একজন হয়তো বখাটে ছেলেদের সাহস করে প্রতিবাদ করেছে, বিনিময়ে অকথ্য নির্যাতন, মেয়েটিকে শারীরিকভাবে কোথাও লাঠি দিয়ে, কোথাও জুতা দিয়ে পেটানো হচ্ছে। মনে হচ্ছে বর্বর এলাকা। কোন বিচার, কোন শাসন, কোন মানবতা সেখানে?

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সব মিডিয়ায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে হবে যে কোনো মেয়েকে (স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরিজীবী) একা কিংবা দু-তিনজন একসঙ্গে গেলেও তাদের কোনোভাবে উত্ত্যক্ত করা যাবে না। বিষয়টি বিভিন্নভাবে মনিটর করা হবে এবং কোথাও এমন কোনো ঘটনার খবর পাওয়া গেলে তত্ক্ষণাৎ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন—সবাইকে সতর্ক করে দিতে হবে যে তাদের এলাকায় যাতে এ ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে। যদি ঘটে এবং কোনো সূত্র থেকে যদি খবর পাওয়া যায়, তাহলে তারা এ জন্য দায়ী থাকবে।

আমরা শিক্ষার্থীদের যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিচ্ছি, তাতে কিন্তু তাদের মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটছে না। যদি তা-ই হতো, তাহলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও নারী হত্যা করা থেকে বিরত থাকত। সিলেটে কয়েক মাস আগে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তাতে যিনি ঘটিয়েছেন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর যাঁর ওপর ঘটানো হয়েছে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থী। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা করেও এতটুকু মানবতা গড়ে ওঠেনি। এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত আর সেটি হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষার্থী হলে মনে করা হয়—যা কিছুই করা যাক, পার পাওয়া যাবে। ঘটনা ঘটার মূল জায়গাটি কিন্তু এখানে। ‘আইন দুর্বলের জন্য, সবলদের জন্য নয়’—এই বিষয়টি আমরা সমাজের কোথাও যাতে প্রশ্রয় না দিই সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দৃষ্টি দিতে হবে। তাহলে নারী নির্যাতন অনেকাংশে কমে যাবে। আর এটি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে। নারী সমাজে নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারবে।

বাংলাদেশে ১৮ বছর হওয়ার আগেই এক-তৃতীয়াংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। এর কারণ কিন্তু এখন আর অশিক্ষা নয়, শুধু দারিদ্র্য নয়, শুধু অসচেতনতা নয়। এখন প্রধান কারণ মেয়েদের নিরাপত্তা। একজন মেয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে স্কুলে যেতে পারে না অনেক এলাকায়ই। একাধিক মেয়েও একত্রে স্কুলে যাওয়ার পথে ইভ টিজিং, হামলা, শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়। কোনো এলাকায় যখনই এ-জাতীয় কোনো ঘটনা ঘটে, বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির রূপ নেয়। উঠতি বয়সের ছেলেরা বখাটেপনা করে, যুবক বয়সের বেকার কিংবা এলাকায় থাকে এসব ছেলে মেয়েদের বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করে। সবচেয়ে বড় কথা—এলাকায় যাঁরা প্রভাবশালী, তাঁদের ছেলেরাই এসব কাজে বেশি জড়িত। কারণ জানে যে তাদের বিরুদ্ধে সহজে কেউ দাঁড়াতে পারবে না, অভিযোগ গঠন করতে পারবে না। করলেও সেটি কোনো কাজে আসবে না। বরং উল্টো নির্যাতিতাদের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি চলতে থাকে। নিরুপায় অভিভাবকরা মেয়েদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বাদ দিয়ে বিয়ে দিয়ে দেন। যে মেয়েটি ডাক্তার হতে পারত, একজন ভালো শিক্ষিকা হতে পারত, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারত, গবেষক হতে পারত—সে চলে যায় শ্বশুরবাড়ি এবং সন্তান উত্পাদন, স্বামী ও নতুন পরিবারের সবার মন রক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়। তার মেধা ও যোগ্যতা বৃহত্তর সমাজের জন্য কিছু একটা করতে পারে না। আর এভাবেই নারীদের অবস্থান ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে।

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত, সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন