বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা

0-74

ফরিদুর রহমান : সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিভিশনের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক প্রীতি সম্মিলনে মাননীয় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। প্রথমত, একটি প্রতিষ্ঠানে মানুষের কর্মজীবন অনেকটা রিলে রেসের মতো। নিজ নিজ দৌড়ের পালা শেষ করে দৌড়বিদের মতোই একজন কর্মজীবী তাঁর হাতের কাঠি পরবর্তীজনের হাতে তুলে দিয়ে অবসরে চলে যান। বাংলাদেশ টেলিভিশনেও একদল সফল দৌড়বিদ তাঁদের পালা শেষ করে নতুন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মতো একটি জনকল্যাণমুখী সম্প্রচার মাধ্যম আর্থিকভাবে লাভজনক কি না তা কোনো বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। তৃতীয়ত, কোনো একটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আমাদের স্বপ্ন দেখতে ও দেখাতে হবে। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ভিশন ২০২১’-এর স্বপ্ন দেখেছেন এবং দেখাতে পেরেছেন বলেই বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে একটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।

আমরা যদি বাংলাদেশ টেলিভিশনের বর্তমান অবস্থার আলোকে মন্ত্রী মহোদয়ের কথাগুলো বিশ্লেষণ করি, তাহলে যে ছবি ফুটে ওঠে তা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। আবদুল্লাহ আল মামুন, আতিকুল হক চৌধুরী, নওয়াজীশ আলী খান, মুস্তাফিজুর রহমান ও মোস্তফা কামাল সৈয়দের মতো স্বনামধন্য মানুষদের হাত থেকে রিলে রেসের কাঠি হাতে নেওয়ার পর আমরা যারা দৌড়াতে শুরু করেছিলাম, মাঠের শেষ প্রান্তে এসে ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে দেখেছি আমাদের হাতের কাঠি নেওয়ার জন্য কেউ অপেক্ষা করে নেই। দীর্ঘ ২৬ বছর যে প্রতিষ্ঠানে কোনো নতুন নিয়োগ হয়নি সেখানে যারা ভালো মতো হাঁটতেই শেখেনি সেই নবাগত অথবা যারা কখনো টেলিভিশনের মাঠে পা রাখেনি বাইরে থেকে ধার করে নিয়ে আসা ‘হায়ারের প্লেয়ার’দের হাতে কাঠি গুঁজে দিয়ে অবসরে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী অর্থাৎ মহাপরিচালক পদটি প্রধানত প্রশাসনিক। তাঁর কাজের পরিধি সম্প্রচার সম্পর্কিত সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, নীতিনির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সংকট নিরসনসহ সার্বিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দর্শকের জন্য ইতিবাচক সম্প্রচার নিশ্চিত করা। অতীতে টেলিভিশনের বাইরে থেকে আসা মহাপরিচালকদের কেউ কেউ যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গেই এ কাজগুলো সম্পন্ন করেছেন। বিশেষ করে প্রয়াত এম এ সাঈদ তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও আন্তরিকতা দিয়ে আশির দশকের শুরুতেই বিটিভিকে জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের যে উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, তা অতিক্রম করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। কাজেই প্রফেশনাল ব্রডকাস্টার না হয়েও একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রশাসনিক কর্মকর্তা টেলিভিশনকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। কিন্তু সম্প্রচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত অনুষ্ঠান এবং বার্তা বিভাগ ও প্রকৌশল, ডিজাইন ও চিত্রগ্রহণ শাখার পদগুলোয় পেশাদার সম্প্রচার কর্মীর কোনো বিকল্প হতে পারে না।

প্রচারিত সব অনুষ্ঠান সবার কাছে সমান প্রিয় হবে কিংবা অনুষ্ঠানসূচিতে শুধু ব্যাপক বিনোদন, লাগাতার ধারাবাহিক নাটক অথবা ক্রিকেট-ফুটবল চলতে থাকবে, তা কেউ আশা করে না। কিন্তু সম্প্রচার সম্পর্কিত কর্তাদের অবশ্যই সব বয়সের, সব শ্রেণির দর্শকের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূল সুরটি অনুধাবন করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি বিটিভির সম্প্রচার ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দুতে যাঁরা অবস্থান করছেন, সেই জেনারেল ম্যানেজার ও উপমহাপরিচালক মহোদয়ের উপলব্ধিতে এই বিষয়টি আছে বলে মনে হয় না। বিটিভি ভবনের উচ্চতা ও চাকচিক্য বেড়েছে, বেড়েছে যানবাহন ও যন্ত্রপাতির সংখ্যা। চূড়ান্ত বিচারে এর কোনোটাই দর্শকের কাছে পৌঁছায় না। টেলিভিশন দর্শকের কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয় তার পর্দা। পেশাদারির অভাবের পাশাপাশি প্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্তাদের বুদ্ধি-বিবেচনার ঘাটতিও এখন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যেন সম্প্রচারের জন্য প্রতিষ্ঠান নয়, প্রতিষ্ঠানের জন্যই অনুষ্ঠান ও বার্তা! ফলে প্রশাসনিক কড়াকড়ির বজ্র আঁটুনি যত বাড়ছে, বিটিভির দর্শকসংখ্যা তত কমছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, অনুষ্ঠান বিভাগের কিছু কর্মকর্তা, তাদের সহযোগী ও বহিরাগত তালিকাভুক্ত সহকারীদের অনৈতিক-অবৈধ উপার্জন সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

তথ্যমন্ত্রী মহোদয়ের বক্তব্যের সূত্র ধরে বলা যায়, বিজ্ঞাপনের আয় বাড়িয়ে অথবা অনুষ্ঠানের ব্যয় কমিয়ে বিটিভিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কোনো দায় সরকারের নেই। বরং সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের বার্তা পৌঁছাচ্ছে কি না এবং প্রতিষ্ঠানটি পারিবারিক বিনোদনের জোগান দিতে পারছে কি না সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের এনএইচকে বা জার্মানির জেডডিএফ ছাড়াও তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করে না। কাজেই আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং সিস্টেমকে বিচার করা যায় না।

সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ টেলিভিশনে এখন স্বপ্ন দেখার ও স্বপ্ন দেখানোর মতো মানুষ নেই। উপমহাপরিচালক মুস্তাফা মনোয়ার অথবা প্রয়াত অনুষ্ঠান পরিচালক খালেদা ফাহমীর দেখানো স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমাদের প্রজন্মের প্রযোজকরা সীমিত সুযোগ ও সামান্য অর্থ ব্যয় করে যে অসাধ্য সাধন করেছেন, তা এখন ভাবাও যায় না। আশির দশকের শুরু থেকে পরবর্তী ৮-১০ বছরে ফরম্যাট ও কন্টেট নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বৈচিত্র্যসমৃদ্ধ যেসব নতুন অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল, সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বিটিভি এখন পর্যন্ত বিভিন্ন নামে সেসব অনুষ্ঠানেরই চর্বিত চর্বণ প্রচার করে চলেছে। বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়ে না। ‘নথিতে পেশ করুন’ জাতীয় আমলাতান্ত্রিক নির্দেশনা দিয়ে আর যাই হোক বাংলাদেশ টেলিভিশনের মতো একটি সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা ও সেখানে দর্শকের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব নয়।

 লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) বাংলাদেশ টেলিভিশন

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন