কুরআনের আলো : পূর্ণ যৌবনে ইউসুফ (আ) এর নবুয়ত লাভ

0-74

২২. যখন সে [ইউসুফ (আ.)] পূর্ণ যৌবনে উপনীত হলো তখন আমি তাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম। এভাবেই আমি সৎ কর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করি। (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২২)

তাফসির : হজরত ইউসুফ (আ.) অত্যন্ত সত্কর্মশীল ও ন্যায়বান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর বয়স যখন পূর্ণতা পেল তখন মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন। তাঁকে নবুয়ত দান করেছেন। আল্লাহ এভাবেই সত্কর্মশীলদের পুরস্কৃত করেন। আল্লাহ সমাজেরই একজনকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করেন। এরপর নানা ঘটনার মাধ্যমে তাঁকে পরীক্ষা করেন এবং মানবসমাজে সত্যের আহ্বানকারী হওয়ার যোগ্য রূপে গড়ে তোলেন।

আল্লামা ওহাবা জুহাইলি (রহ.) লিখেছেন : পূর্ণ যৌবন থাকে ৩০ থেকে ৪০ বছরের মাঝামাঝি সময়ে। তাই ইউসুফ (আ.)-এর নবী হওয়ার সময়ের বয়স নিয়ে মতভেদ দেখা যায়। ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদ (রহ.) বলেছেন, ৩৩ বছর বয়সে ইউসুফ (আ.) নবী হয়েছেন। হাসান বসরি (রহ.)-এর মতে, তিনি ৪০ বছর বয়সে নবী হয়েছেন। (ইবনে কাসির ও তাফসিরে মুনির)

আদম, ইয়াহইয়া ও ঈসা (আ.) ছাড়া প্রায় সব নবীই ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেছিলেন। কোনো কোনো তাফসিরবিদের মতে, মুসা (আ.) ৫০ বছর বয়সে নবী হয়েছেন। এরপর ফেরাউনের দরবারে পৌঁছেছেন। ২৩ বছর দ্বন্দ্ব-সংগ্রামের পর ফেরাউন ডুবে মরে। আর বনি ইসরাইল মিসর থেকে বেরিয়ে যায়। এ সময় মুসা (আ.)-এর বয়স ছিল সম্ভবত ৮০ বছর। তবে মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর মতে, জাদুকরদের সঙ্গে মোকাবিলার ঘটনার পর মুসা (আ.) ২০ বছর মিসরে অবস্থান করেন। কিন্তু মুসা (আ.)ও ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেছিলেন বলে বেশির ভাগ ইতিহাসবিদ অভিমত দিয়েছেন।

৪০ বছর বয়সে নবুয়ত দান করা হলেও প্রাপ্তবয়স হলেই মানুষের ওপর শরিয়তের বিধান অর্পিত হয়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ছাড়া ইসলামের বিধিবিধান পালন কারো জন্য বাধ্যতামূলক নয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের সন্তানসন্ততি বয়ঃপ্রাপ্ত হলে তারা যেন (বিশেষ সময়ে ঘরে প্রবেশের আগে) অনুমতি প্রার্থনা করে, যেমন অনুমতি প্রার্থনা করে থাকে তাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৫৯)

প্রাপ্তবয়সের সীমারেখা কী—এ বিষয়ে অবশ্য কিছুটা মতপার্থক্য আছে। হানাফি মাজহাব অনুসারে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর শরীরে বয়ঃপ্রাপ্তির লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও বালক-বালিকা শরিয়তের দৃষ্টিতে বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক বলে গণ্য হবে। (তাফসিরে মা’আরেফুল কোরআন, ই. ফা. খণ্ড-২, পৃষ্ঠা ২৮৭)

এ বিষয়ে হাদিস শরিফে এসেছে : নাফে (রহ.) হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, উহুদ যুদ্ধের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে (সবার সামনে) হাজির করলেন, তখন তিনি ১৪ বছরের বালক। (ইবনে ওমর বলেন) তিনি [মহানবী (সা.)] আমাকে (যুদ্ধে গমনের) অনুমতি দেননি। পরে খন্দকের যুদ্ধে তিনি আমাকে হাজির করলেন এবং অনুমতি দিলেন। তখন আমি ১৫ বছরের যুবক। নাফে (রহ.) বলেন, আমি খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে এ হাদিস শুনলাম। তিনি বললেন, এটাই হচ্ছে প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্তবয়সের সীমারেখা। এরপর তিনি তাঁর গভর্নরদের লিখিত নির্দেশ পাঠালেন যে (সেনাবাহিনীতে) যাদের বয়স ১৫ হয়েছে তাদের জন্য যেন ভাতা নির্দিষ্ট করা হয়। (বুখারি, হাদিস নম্বর : ২৬৬৪, ৪০৯৭; মুসলিম, হাদিস নম্বর : ১৮৬৮)

ইমাম আহমদ ও ইসহাক (রহ.) বলেছেন, বালেগ (পূর্ণবয়স্ক) হওয়ার জন্য তিনটি বিকল্প নিদর্শন আছে। এক. ১৫ বছর বয়স হওয়া। দুই. ইহতিলাম (স্বপ্নদোষ ও বীর্যপাত) হওয়া। তিন. যদি এমন হয় যে বয়সও অনুমান করা যাচ্ছে না, আবার স্বপ্নদোষও হয় না, এ ক্ষেত্রে লজ্জাস্থানের ওপরে পশম ওঠাকে বালেগ হওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নিতে হবে। (তিরমিজি শরিফ, হাদিস : ১৩৬১)

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ