এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির, তবু ইসি গঠনে রূপরেখা দেবে বিএনপি

রিয়াদুল করিম : নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো দরকার দেখছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে বিভিন্ন সভা-সেমিনার, সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নেতারা তা জানিয়েও দিয়েছেন। ইসি গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। তাই এ নিয়ে সরকারের কিছু করার নেই বলছেন দলটির নেতারা। এরপরও পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে একটি রূপরেখা তৈরি করছে বিএনপি। বিএনপি কেমন নির্বাচন কমিশন চায়, এই রূপরেখার মাধ্যমে তা তুলে ধরা হবে।

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলেছেন, তাঁদের এই রূপরেখা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরা হতে পারে এবং রূপরেখার একটি কপি রাষ্ট্রপতির কাছেও দেওয়া হতে পারে। সরকার আমলে নেবে না, এমনটা ধরে নিয়ে দলটি রূপরেখা দিতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে বিএনপির ব্যাপারে সরকারের মনোভাব বোঝা দলটির উদ্দেশ্য।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুজন নেতা বলেন, নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করা এবং এটি নিয়ে সরকারের মনোভাব বোঝার জন্যই মূলত তাঁরা এই প্রস্তাব তৈরি করছেন। চলতি মাসের মাঝামাঝি তাঁদের এই প্রস্তাব প্রকাশ করা হতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে একটি রূপরেখা দেওয়ারও চিন্তা আছে তাঁদের। তবে কমিশন নিয়ে প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে—তার ওপর বিএনপির পরবর্তী করণীয় নির্ভর করবে।

সূত্র জানায়, গত রোববার রাতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে একটি রূপরেখা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং সরাসরি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত নন এমন তিনজন ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে কাজ করছেন।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে বিএনপি একটি প্রস্তাব দেবে। নির্বাচন কমিশনের রূপরেখা নিয়ে তাঁদের দল কাজ করছে। দলের ভেতরের ও বাইরের কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। এই প্রস্তাব দেওয়ার পর বোঝা যাবে সরকারের সদিচ্ছা কতটুকু আছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। সংবিধানে যেভাবে আছে, সেভাবেই হবে। রাষ্ট্রপতি কীভাবে সেটি করবেন, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচন কমিশন কেমন হওয়া উচিত, তার একটি রূপরেখা তৈরি করার কাজ করছে বিএনপি। কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে বা এই প্রস্তাব প্রকাশ করা হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে এখনো কোনো আইন নেই। সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান নিজ উদ্যোগে একটি ‘সার্চ কমিটি’র মাধ্যমে বর্তমান কমিশন গঠন করেছিলেন। বর্তমান কমিশনের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এখন আবার নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপি বারবার সবার সঙ্গে আলোচনা করে ‘গ্রহণযোগ্য’ একটি কমিশন গঠনের আহ্বান জানাচ্ছে। তবে সরকার এ বিষয়ে এখনো নেতিবাচক।

নির্বাচন কমিশন গঠনে বিএনপি সহায়তা করতে চাইলে নেবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে গত ৩০ অক্টোবর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে, সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। ভবিষ্যতে এভাবেই হবে। এখানে সংলাপের কোনো প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে জাতির প্রয়োজনে যদি কোনো সংলাপ প্রয়োজন হয়, তাহলে সংলাপ করব।’

গতকাল বুধবারও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘ওই খুনিদের সঙ্গে কোনো বৈঠক হবে না, আলোচনাও হবে না। যারা আমার পিতাকে হত্যা করেছে, জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, তাদের সঙ্গে আর যাই হোক আলোচনা হবে না। আলোচনা হবে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে, অন্য কারও সঙ্গে হবে না।’

বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপিও মনে করছে, সরকার শেষ পর্যন্ত বিএনপির প্রস্তাব আমলে নেবে না। এটি ধরে নিয়েই তারা রূপরেখা তৈরি করছে। এর কারণ বিএনপি কী চায়—তা সবার কাছে পরিষ্কার করা। যাতে পরবর্তী সময়ে আন্দোলনে গেলে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে যে বিএনপি কী চায়? বিএনপি বর্তমান কমিশনকে ‘অথর্ব’ আখ্যা দিয়ে একাধিকবার বলেছে, এ ধরনের কমিশন দিয়ে কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাহলে কেমন কমিশন বিএনপি প্রত্যাশা করে, সে প্রশ্নও সামনে আসে। এ জন্য একটি রূপরেখা দলটি প্রস্তাব করতে যাচ্ছে।

তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের শেষ দিন বলেছিলেন, তিনি কখনোই চাইবেন না আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠুক। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, কমিশন নিয়ে রূপরেখা দেওয়ার চিন্তার এটিও একটি কারণ। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য আসলে তাঁর মনের কথা কি না, আওয়ামী লীগ আসলেই সুষ্ঠু নির্বাচন চাই কি না—তা বোঝা যাবে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে।

আওয়ামী লীগ বলছে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই। তারপরও কেন বিএনপি এ ধরনের একটি রূপরেখা প্রস্তাব করার চিন্তা করছে—এমন প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু বলেন, প্রশ্নহীন একটি নির্বাচন করতে হলে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে সব স্তরের জনগণের সঙ্গে কথা বলতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই সব রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, মতামত নিতে হবে। আর মূল রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন করতে চাইলে তার দায় সরকারকে নিতে হবে।

(টুডে সংবাদ/উদয়া)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.todaysangbad.com ভিজিট করুন, লাইক দিন এবং  শেয়ার করুন