সাক্ষাৎকারে শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি সরকার চাইলে পাঁচ মিনিটেই সমাধান

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট : 

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলে পাঁচ মিনিটেই শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার

সমাধান হতে পারে। তিনি বলেন, আমরা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবি করছি না। আমাদের মর্যাদার জায়গাটা নিয়ে আমরা কথা বলছি। গত আট মাস ধরে আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেছি। আমাদের কথাগুলো খুলে বলতে চেয়েছি। কিন্তু আমরা সে সুযোগ পাইনি। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের সম্পর্কে যেসব তথ্য আছে তা খণ্ডিত চিত্র। আমরা তার কাছে পৌঁছাতে পারলে পুরো চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হতো। শিক্ষক নেতা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি করেন। তিনি বলেন, আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রী আমাদের সময় দেবেন।

শিক্ষক নেতা বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের উপাচার্য মহোদয় চেষ্টা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ যেখানে সব উপাচার্য

আছেন তারাও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে এখন পর্যন্ত আমরা তার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। এই ব্যাপার নিয়ে কথাও বলতে পারিনি। এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য তারা অর্থমন্ত্রীকে দায়ী করেন।

বেতন-ভাতাসহ ৫ দফা দাবিতে দেশের ৩৭ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। এদিন থেকে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস হয়নি। ফলে গত তিন দিন ধরে প্রায় সোয়া দুই লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অলস সময় পার করছে। আন্দোলন প্রলম্বিত হলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন সভাপতি অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরের কাছে একান্তে তাদের আন্দোলন নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান চাই। সমাধান না হলে আমরা চলমান কর্মসূচিতেই থাকব। কর্মবিরতি প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই।

এ শিক্ষক নেতা বলেন, আমরা সচিব হতে চাইনি। আমরা সচিব তৈরি করি। তাদের (সচিবদের) বেশিরভাগ আমাদেরই ছাত্র। আমরা সচিব হতে চাইলে বহু আগেই হতে পারতাম। কিন্তু আমরা ওই জায়গায় যেতে চাইনি। আমরা শিক্ষকতাকে ভালোবাসি, সেরা সেরা ছেলেমেয়েরা শিক্ষকতায় আসে। তারা অত্যন্ত মেধাবী। মর্যাদার জন্যই তারা এখানে আসে। ছাত্র-ছাত্রীদের ভালোবাসে, লেখাপড়া ভালোবাসে, গবেষণা ভালোবাসে সেজন্যই তারা এ পেশায় আছে। এ পেশা ছেড়ে কেউ যেতে চায় না। আমরা আমাদের সম্মানের বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানো, গবেষণা করানো এবং শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের দেশকে কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায় সেটাই হল আমাদের ধ্যান, জ্ঞান সবকিছু।

তিনি বলেন, আজকে যারা সচিব পদে আছেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আছেন তারা আমাদেরই ছাত্র। তাদের কাজের ক্ষেত্রও আমাদের চেয়ে আলাদা। তারা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বা নীতিমালা বাস্তবায়ন করেন। আর আমরা শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে থাকি। কেউ কারও কম্পিটিটর (প্রতিযোগী) না। সচিবরা যদি তাদের জায়গা থেকে তাদের কাজ করেন, আমরা আমাদের কাজ করি। কাজেই কারও সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) নিজেও বলেছেন, সচিবদের সঙ্গে আমাদের কোনো তুলনা করার সুযোগ নেই। কারণ যেখানে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আছেন তারা অনেক উপরে অনেক উপরে। সচিবরা তাদের ধারে কাছে আসতে পারবে না। কাজেই আমরা কেন তাদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করব। এটা করার প্রশ্নই উঠে না।

ফেডারেশনের সভাপতি বলেন, আমরা তো বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কথা বলছি না। আমরা আমাদের মর্যাদার জায়গাটা নিয়ে কথা বলছি। সারা দুনিয়াতে শিক্ষকরা মর্যাদার আসনে আসীন। তিনি বলেন, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছি।

কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী- জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাটাই আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অমানুষিক পরিশ্রম করে সেশনজটের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছি। আর কোনোভাবে ওই চক্রে ফিরতে চাই না। এক সেকেন্ডের জন্য ক্লাস বন্ধ হোক, পরীক্ষা বাধাগ্রস্ত হোক আমরা চাই না। সেজন্যই আমরা আটটি মাস অপেক্ষা করেছি। কিন্তু কেউ আমাদের ডেকে কথা বলেনি। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে উপযাজক হয়ে আমরা কথা বলেছিলাম। তিনি কথা দিয়েছিলেন, আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও কথা রাখেননি। তিনি কথা রাখলে আজ এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। আমি মনে করি এই অবস্থার জন্য দায়ী হচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি কথা রাখলে এক ঘণ্টার জন্যও শিক্ষকরা কর্মবিরতিতে যেত না। তিনি অত্যন্ত বয়োজ্যেষ্ঠ ও শ্রদ্ধাভাজন লোক। কিন্তু কথা দিয়ে কথা রাখেননি। এটা দুঃখজনক।

যতদিন পর্যন্ত শিক্ষকদের দাবি মেনে প্রজ্ঞাপন জারি না হয়, ততদিন কর্মবিরতি চলবে- এই বক্তব্যে অটল আছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললে তিনি যদি আমাদের আশ্বস্ত করেন তাহলে কেন শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ থাকবে। তিনি বলেন, ভর্তি পরীক্ষা না নেয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাদের ওপর চাপ এসেছিল। কিন্তু আমরা বলেছি অবশ্যই ভর্তি পরীক্ষা নিতে হবে। ছেলেমেয়েদের জিম্মি করে কিছু করা যাবে না।

পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে এই শিক্ষক নেতা বলেন, আমরা আশা করব, খুব শিগগির আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে আলোচনার টেবিলে বসব। সেখানেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সেই পর্যন্ত লাগাতার কর্মবিরতি কর্মসূচি চলবে। মর্যাদার জায়গায় শিক্ষকরা কোনো আপস করবে না। আমরা আমাদের অবস্থান জাতির সামনে তুলে ধরেছি, ব্যাখ্যা করেছি। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে উপযাজক হয়ে গিয়ে আমরা কথাগুলো বলেছি। কিন্তু আমরা কারও কাছ থেকে সাড়া পাইনি। কেউ ডেকে নিয়ে আমাদের সমস্যার বিষয়ে কথা বলেনি। তারা তাদের জায়াগায় অনড় ছিল। আমরা কিন্তু বারবার প্রত্যেকের অফিসে গেছি, কথা বলেছি। কয়েকজন মন্ত্রীসহ অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছি।

সমস্যার সমাধান কী- এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গতকাল (সোমবার) বলেছেন, যদি কোনো ধরনের সমস্যা থাকে আমরা সমাধান করব। আমরা তার এ বক্তব্যে আশাবাদী যে, বিষয়টিকে তিনি গুরুত্ব দেবেন এবং যাতে আমরা আলোচনায় বসতে পারি সেই ব্যবস্থা করবেন। আমি মনে করি, সবার জন্য শান্তিপূর্ণ একটি সমাধান হতে পারে। এটা কঠিন কোনো ব্যাপার না।

সরকারের পক্ষ থেকে কর্মবিরতির পর কোনো সারা পেয়েছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ। এখন তা করছে। অনেকেই যোগাযোগ করেছেন। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ফোন করেছেন। তার সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা আবার তার সঙ্গে কথা বলব। এছাড়াও কথাবার্তা চলছে। আমরা এর শান্তিপূর্ণ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান চাই।

(টুডে সংবাদ/উদয়া)